মহাজন-আড়তদারের কাছে জিম্মি উপকূলের কাঁকড়া শিকারীরা

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০১৪, ২০:৩৪
কলাপাড়াসহ উপকূলীয় কাঁকড়া শিকারি জেলেরা আড়তদার, মহাজন আর দাদনদারদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। দিনরাত পরিশ্রম করে কাঁকড়া শিকার করলেও লাভের সিংহভাগ চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে। ফলে জেলেদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হচ্ছে না। মধ্যস্বত্বভোগীদের শোষণের যাঁতাকলে উপকূলীয় হাজারো কাঁকড়া শিকারী দিন দিন দরিদ্র থেকে আরো দরিদ্র হচ্ছেন। উপকূলীয় এলাকার ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল হলো কাঁকড়ার অভয়াশ্রম। জানুয়ারি-জুন মাস পর্যন্ত এ সব এলাকায় প্রচুর পরিমাণে কাঁকড়া পাওয়া যায়। আর এসময় আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁকড়ার প্রচুর চাহিদা থাকে, দামও থাকে প্রচুর। এ সুযোগ নিয়ে মহাজন, আড়তদাররা জেলেদের দাদন দিয়ে নৌকাসহ কাঁকড়া ধরার সামগ্রী দিয়ে শিকারে পাঠান। শর্ত থাকে যা ধরা পড়বে তার অর্ধেক পাবে জেলে আর বাকি অর্ধেক পাবে মহাজন আড়তদাররা। কিন্তু দাদন নেয়ার কারণে আড়তদাররা জেলেদের বিক্রি করা কাঁকড়ার দাম বাজার মূল্যের চেয়ে কম দেন বলে অভিযোগ জেলেদের। এভাবেই মহাজন আড়তদাররা শোষণ করছেন কাঁকড়া শিকারি জেলেদের। নীলগঞ্জ ইউনিয়নের সলিমপুর গ্রামের কাঁকড়া শিকারি নিজাম উদ্দিন জানান, ‘নৌকা ও কাঁকড়া ধরার সামগ্রী কেনার অর্থ না থাকার কথা তিনি এলাকার এক দাদন ব্যবসায়ীর কাছে বলেন। এরপর তিনি তাকে এক লক্ষ টাকা দিয়ে নৌকা ও কাঁকড়া শিকারের সামগ্রী কিনে দেন। শর্ত থাকে কাঁকড়া যা ধরা পড়বে ধরার খরচ বাদ দিয়ে অর্ধেক তাকে দিতে হবে।’ তার দেয়া তথ্যানুসারে উপকূলীয় এলাকায় এ ধরনের (গাওভোগী) কাঁকড়া শিকারির সংখ্যা ২০ হাজারের উপরে। প্রায় একই কথা বললেন কাউয়ার চরের রফিক মিয়া, দেলোয়ার হোসেন, জাকির মিয়াসহ বহু কাঁকড়া শিকারি। ফাতরার ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের কাঁকড়া শিকারি উলাচি রাখাইন বলেন, ‘কাঁকড়া ধরা নির্ভর করে জোয়ার-ভাটার ওপর। জোয়ারের সময় কাঁকড়াগুলো ম্যানগ্রোভ বনের গাছের মূলে গিয়ে আশ্রয় নেয়। ভাটার সময় পানি কমতে থাকলে স্রোতের সাথে কাঁকড়া বের হয়ে আসে। তখন স্রোতের মুখে বাঁশ দিয়ে তৈরি চাঁই’র মধ্যে কাঁকড়ার জন্য মুরগীর মাংস ও বিভিন্ন মাছ জাতীয় খাবার দেয়া হয়। কাঁকড়া খাবার খেতে ওই ফাঁদের (চাঁই) ভিতর প্রবেশ করে। ভাটা শেষে চাঁই তুলে কাঁকড়া সংগ্রহ করা হয়।’ এভাবেই উপকূলীয় হাজার হাজার কাঁকড়া শিকারি প্রতিদিন কোটি টাকার কাঁকড়া শিকার করে থাকেন। কুয়াকাটা সংলগ্ন খাজুরা এলাকার কাঁকড়া শিকারি রহিম মিয়া বলেন, ‘প্রতি দিন ২-৩ কেজি করে কাঁকড়া পাই। আড়তদারের কাছ থেকে দাদন নেয়ায় অর্ধেক তাকে দিতে হয়। এছাড়া বর্তমানে স্থানীয় বাজারে চারশ’ গ্রামের বেশি ওজনের স্ত্রী (মেদী) কাঁকড়ার কেজি প্রতি দর রয়েছে ৩৫০-৪০০ টাকা। অথচ মহাজন আমাদের কাছে দর কাটে দু’শ’ টাকা করে। এভাবে কাঁকড়া বিক্রি করে যা পাই তা দিয়ে পাঁচ সদস্যের সংসার চালানো কষ্ট সাধ্য হয়ে পড়েছে।’ খুলনা থেকে কাঁকড়া ক্রয় করতে আসা মহাজন জসীম উদ্দিন বলেন, স্থানীয় আড়তদারদের কাছ থেকে বর্তমানে কেজি প্রতি স্ত্রী কাঁকড়া ৪শ’ গ্রামের বেশি ওজনের ৪৫০ টাকা, ২৫০ গ্রামের বেশি ওজনের ৩৪০ টাকা, ১৮০ গ্রামের বেশি ওজনের ২৫০ টাকা কেজি দরে ক্রয় করে থাকি। সরাসরি জেলেদের কাছ থেকে ক্রয় না করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা আড়তদারদের দাদন দেই বলে সরাসরি তাদের কাছ থেকে ক্রয় করি। এছাড়া স্থানীয় কিছু সমস্যা থাকার কারণে জেলেদের কাছ থেকে কেনা সম্ভব হয় না। কলাপাড়া উপজেলা কাঁকড়া আড়তদার সমিতির সভাপতি মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, মহাজনদের কাছ থেকে দাদন এনে এবং নিজেদের টাকা দিয়ে জেলেদের নৌকাসহ কাঁকড়া ধরার সামগ্রী কিনে দিয়েছি। সে কারণে জেলেরা আমাদের অর্ধেক দেয়। দর কম দেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা তো লাভের আশায় ব্যবসা করি, ব্যবসা না করলে খাব কি।’