অবশেষে টনক নড়লো সবার। চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে রুই জাতীয় মাছের সর্ববৃহত্ প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী নানা প্রতিবন্ধকতা এবং মানুষের বৈরী আচরণের কারণে এখন সত্যি সত্যি মরণাপন্ন।
গত বছর এপ্রিলে এ নদীতে ভরা মৌসুমেও মা মাছেরা ডিম ছাড়েনি। যেটুকু ডিম অনিয়মিতভাবে ছেড়েছিল তা ছিল খুবই কম। হালদার ইতিহাসে গত বছর প্রাকৃতিক রুই প্রজননে দেখা গেছে বড় বিপর্যয়। সেইসাথে হালদার ডিম সংগ্রহ করে রেণু পোনা বিক্রির সাথে জড়িত শত শত জেলেদেরও কপাল পুড়েছে। হালদার পরিবেশ রক্ষা ও প্রতিবন্ধকতা দূর করতে মত্স্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয় গত বছর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ১৩ জন বিশেষজ্ঞ নিয়ে যে কমিটি গঠন করেছিল সে কমিটির সদস্যরা গত ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি সরেজমিনে ঘুরে গেছেন হালদার উজান এলাকা। তারা দেখেছেন, কৃষি সেচের জন্য হাটহাজারীর উজানে ফটিকছড়ি উপজেলার ভূজপুরে হালদা নদীর মূল পানি প্রবাহের উপর এবং হারুয়ালছড়ি খালের উপর দু’টি রাবার ড্যাম নির্মাণ করা হয়েছে।
হালদা রক্ষা কমিটি, চট্টগ্রামের সভাপতি, সরকার গঠিত হালদা প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ কমিটির সদস্য এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক মঞ্জুরুল কিবরিয়া ইত্তেফাককে জানান, এখনো হালদা নদীকে রক্ষায় অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা যায়নি। হালদা নদীকে রক্ষার জন্য মত্স্য মন্ত্রণালয় ২০০৭ সালে ‘প্রাকৃতিক মত্স্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ গঠন করলেও এই প্রকল্প যথাযথভাবে কাজ করতে পারেনি। প্রায় ১৪ কোটি টাকা এই প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু কোনো ধরনের সমীক্ষা ছাড়া এই প্রকল্পটি গৃহীত হওয়ায় প্রকল্প হালদা নদীর প্রবাহ ও প্রাকৃতিক মত্স্য প্রজননের নিয়ম রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। তারপরও বিশেষজ্ঞদের সমীক্ষা ছাড়া গঠিত এই প্রকল্পটির মেয়াদ দুই দফা বৃদ্ধি করা হয়েছে। কিন্তু হালদার অনুকূলে যায় এরকম কোনো সহায়ক প্রকল্পে টাকা যথাযথভাবে খরচ না হওয়ায় অনেক টাকা রয়েও গেছে। এই প্রকল্পের সবচেয়ে ক্ষতিকর উদ্যোগ ছিল হালদায় ড্রেজিং। যা করা হলে হালদা আরো আগেই ভয়াবহ ক্ষতির শিকার হতো। কিবরিয়া জানান, হালদার উজানে কৃষি সেচের জন্য ভূজপুরে এবং হারুয়ালছড়ি খালের উপর রাবার ড্যাম নির্মিত হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে উজানে পার্বত্য অঞ্চল খাগড়াছড়ির রামগড় পাহাড় থেকে নেমে আসা প্রাকৃতিক পানির প্রবাহ হালদা নদীতে পৌঁছতে পারছে না। বর্ষা মৌসুমে এই পানি প্রবাহ স্রোতের গতি হারিয়েছে। ফলে ভাটি অভিমুখী সৃষ্ট দুর্বল গতির স্রোতের বিপরীতে মা মাছেরা গত বছর স্বাভাবিক নিয়মে ডিম ছাড়তে পারেনি। রাবার ড্যাম ও দুর্বল স্রোতের কারণে কর্ণফুলী নদী থেকে হালদার মিষ্টি পানি প্রবাহের ভিতর ঢুকে পড়ছে নোনা পানি। যা হালদা নদীতে বিশাল আকৃতির রুই জাতীয় মাছের প্রজনন প্রক্রিয়ার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। কিবরিয়া জানান, প্রতিবন্ধকতা নিরূপণে ২০১৩ সালে সরকার গঠিত কমিটির সদস্যরা গত ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি দু’টি রাবার ড্যাম পরিদর্শন করেছেন, চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্তৃপক্ষের সাথে বৈঠক করেছেন, কাপ্তাই লেক ও জলবিদ্যুত্ প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে বৈঠক করেছেন। তারা জানান, কমিটির সদস্যরা সবাই পৃথক পৃথকভাবে হালদার প্রতিবন্ধকতাগুলো সম্পর্কে রিকমেন্ডেশন দেবেন।
জেলা মত্স্য কর্মকর্তা এবং এবং হালদা পুনরুদ্ধার প্রকল্পের কর্মকর্তা প্রভাতী দে ইত্তেফাককে জানান, কৃষি কাজের জন্য হালদার মূল স্রোতের উপর ভূজপুরে এবং হারুয়ালছড়ি খালের উপর যারা রাবার ড্যাম তৈরি করেছে তারা মত্স্য মন্ত্রণালয় কিংবা হালদা পুনরুদ্ধার প্রকল্পের কাছ থেকে কোনো ধরনের অনুমতি নেয়নি। পুনরুদ্ধার প্রকল্পের আগে কোনো ধরনের সমীক্ষা বা ফিজিবিলিটি স্টাডি হয়নি।
