লোকসভা নির্বাচনে বিভিন্ন দলের শক্তি ও দুর্বলতা

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০১৪, ২৩:১২
ভারতের ১৬তম লোকসভা নির্বাচনের তফসিল সমপ্রতি ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনকে ঘিরে দেশটিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে ঘিরে নানা আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। নির্বাচনে অনেক রাজনৈতিক দল অংশ নিলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সংযুক্ত প্রগতিশীল মোর্চা (ইউপিএ) এবং প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক মোর্চার (এনডিএ) মধ্যে। বর্তমানে দেশটিতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের নেতৃত্বে কে আসছেন। রাহুল গান্ধী না কী মোদী? ভারতের রাজনীতিতে সাড়া জাগিয়েছে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক দল আম আদমি পার্টি ( এএপি)। রাজনীতিতে চলছে ভাঙ্গা-গড়ার খেলা। কংগ্রেস এবং বিজেপিকে ঠেকাতে তৃতীয় একটি ফ্রন্ট গড়ারও চেষ্টা চলছে। দেশটির বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের যেমন শক্তিশালী দিক আছে, তেমনি আছে দুর্বল দিক। কংগ্রেস এবং তার জোট শক্তিশালী দিক: কংগ্রেসের ভাইস প্রেসিডেন্ট রাহুল গান্ধী। তিনি যে দলটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়ে কারো মধ্যে কোনো মতবিরোধ নেই। এমনকি তার দলের মধ্যেও। বিজেপি বিশেষ করে মোদীর সঙ্গে তুলনা করলে রাহুলই গ্রহণযোগ্য হবেন। দলীয় সংহতির বিবেচনায় এটা কংগ্রেসের শক্তিশালী দিক। কংগ্রেস যদি নির্বাচনে ১৫০ টি আসন পায় তাহলে সরকার গঠনের দিক দিয়ে এগিয়ে যাবে। দুর্বল দিক : গত বছর ভারতের চারটি বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের পরাজয় ঘটে এবং বিপুল বিজয় পায় বিজেপি। ওই নির্বাচনে মুদ্রাস্ফীতি এবং দুর্নীতি ছিল প্রধান ইস্যু। কিন্তু এরপরও কংগ্রেস এসব দুর্বল দিক কাটিয়ে উঠতে যথেষ্ট প্রচার-প্রচারণা চালাতে পারেনি। দলটিকে এখন সেই কাজটিই করতে হবে। সুযোগ: বিজেপি সরকার গঠন করতে প্রয়োজনীয় আসন না পেলে এবং তৃতীয় ফ্রন্ট যদি একক নেতা নির্বাচন করতে ব্যর্থ হয় তাহলে সুযোগ আসতে পারে কংগ্রেসের জন্য। দলটি নিজে অথবা অন্য কোনো দলকে সমর্থন দিয়ে সরকার গঠন করতে পারে। হুমকি : কংগ্রেসের জন্য শঙ্কার যে, বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট গত দশ বছরের কংগ্রেস শাসনের নানা দুর্বল দিক প্রচারের সুযোগ পাচ্ছে। এর ফলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, কংগ্রেস বিজেপি এবং আঞ্চলিক দলগুলোর কাছে হেরে যেতে পারে এবং সর্বনিম্ন সংখ্যক আসন পেতে পারে। তৃতীয় বা ফেডারেল ফ্রন্ট শক্তিশালী দিক: তৃতীয় ফ্রন্টের শক্তিশালী দিক হলো তাদের কংগ্রেস এবং বিজেপির মতো শক্তিশালী হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। এই ফ্রন্ট দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আর কংগ্রেস এবং বিজেপিকে যারা পছন্দ করেন না তারা তৃতীয় ফ্রন্টকে পছন্দ করতে পারেন। বিশেষ করে এই ফ্রন্ট স্থানীয়ভাবে শক্তিশালী থাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে। দুর্বলতা: তৃতীয় ফ্রন্টে যারা আছেন তারা একে অপরের প্রতিদ্বন্দী। তাদের রাজনীতির দিকে লক্ষ্য রাখলেই বিষয়টি বোঝা যাবে। তারা যে এক টেবিলে বসে ঐকমত্য হতে পারবেন সেটা কঠিন হবে বৈকি। ফ্রন্টে পশ্চিমবঙ্গের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রকাশ কারাত, তামিলানাডুর এম করুণানিধি ও জে জয়ললিতা, উত্তর প্রদেশের মুলায়েম সিং যদিব ও মায়াবতীর মতো নেতারা আছেন। সুযোগ: বর্তমানে জরিপ আভাস দিচ্ছে, বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জয় পাবে নির্বাচনে। তবে জোটটির সংখ্যাগরিষ্ঠ ১৮০ টি আসনে জয় নিয়ে সংশয় আছে। আর বিজেপি যদি সেটা করতে ব্যর্থ হয় তাহলে সুযোগ আসবে তৃতীয় ফ্রন্ট এবং কংগ্রেসের জন্য। তৃতীয় ফ্রন্ট কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে পারে। হুমকি : ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ধারণা করা হয়েছিল, কংগ্রেসের সমর্থনে তৃতীয় ফ্রন্ট ক্ষমতায় আসতে পারে। কিন্তু নির্বাচনের আগে সরকার গঠন করতে তারা ঐকমত্যে পৌছাতে পারেনি। ফলে ভাসমান ভোট কংগ্রেসের পক্ষে গিয়েছিল। কিন্তু এইবার সেই সুযোগটা বিজেপি পেতে পারে। বিজেপি শক্তিশালী দিক : নির্বাচনী প্রচারণায় এগিয়ে আছেন বিজেপির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী নরেন্দ্র মোদী। তার মতো এক উদ্যমী ও একনিষ্ঠ নেতাকে পাওয়া বিজেপির জন্য সৌভাগ্য বলতে হবে। তিনি ইতোমধ্যে ব্যাপকভাবে জনগনের নজর কাড়তে সমর্থ হয়েছেন। যদিও তার মনোনয়ন নিয়ে দলের মধ্যে টানাপোড়েন চলছিল। অধিকাংশ জনমত জরিপে প্রধানমন্ত্রী পদে রাহুল গান্ধীর চেয়ে মোদীই এগিয়ে আছেন। দুর্বলতা : মোদী যেমন বিজেপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তাকে নিয়ে বিপদও আছে দলের। তার মূল দুর্বলতা ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গা। এখনো সেই ভূত তাকে এবং তার দলকে তাড়িয়ে বেড়ায়। আর এটাই মোদী এবং তার দলের জন্য সবচেয়ে দুর্বল দিক। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলে বিজেপির অবস্থান অনেকটা দুর্বল। পশ্চিমবঙ্গেও দলটির উপিস্থিতি খুব ভাল নয়। সংখ্যালঘু ভোটারদের মন এখনো জোগাতে পারেনি বিজেপি। সুযোগ : ১৯৯৬-৯৮ সালে কংগ্রেসের অবস্থান ছিল সবচেয়ে দুর্বল। কংগ্রেসের অবস্থান এখন সেই পর্যায়ে আছে বলে মনে করা হচ্ছে। আর এর সুযোগ পাবে বিজেপি। এই নির্বাচনে কংগ্রেসকে টেক্কা দিয়ে ক্ষমতায় আসার মোক্ষম সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বিজেপির। হুমকি : মোদীবিরোধী নেতার মনে করছেন, লোকসভা নির্বাচনে খুব বেশি আসন পাবে না বিজেপি। কারণ দলটির কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নেতাদের মধ্যে বিভক্তি আছে। দলটির মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব সহজ নয়। মাঠ পর্যায়ে দলটির সাংগঠনিক অবস্থাও দুর্বল। সেক্ষেত্রে আম আদমি পার্টি দলটির অনেক ভোট কেড়ে নিতে পারে। আম আদমি পার্টি শক্তিশালী দিক : ভারতের শহরগুলোতে জনপ্রিয়তায় এগিয়ে আছে আম আদমি পার্টি। আর এক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করছেন কেজরিওয়াল। দিল্লির মসনদে ৪৯ দিন থেকেই তিনি মানুষের মনের মধ্যে স্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছেন। দুর্বল দিক : দলটি নতুন। এখনো দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে পারেনি। দেশজুড়ে প্রার্থী দেওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্যও নেই দলটির। এমনিক গ্রহনযোগ্য প্রার্থী পাওয়াও দলটির জন্য কঠিন। সুযোগ : অন্যান্য দলের মতো আচরণ করেনি কেজরিওয়ালের পার্টি। একটু ভিন্ন ধাচেই গড়ে উঠেছে দলটি। দলটির মূল শক্তি দুর্নীতিবিরোধী শক্তিশালী ভূমিকা। ফলে কংগ্রেসবিরোধী এবং বিশেষ করে মোদীবিরোধী ভোট দলটির বাক্সে পড়তে পারে। হুমকি : মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে এখনো আকর্ষণ করতে পারেননি কেজরিওয়াল। তার রাজনীতির ধরন অনেকের কাছেই পছন্দ নয়। এছাড়া জাতীয়ভাবে ও তিনি খুব একটা প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি।