বড় উত্থানের পর টানা দরপতন

আপডেট : ২১ মে ২০১৯, ২২:৩৯

শেয়ারবাজারে উত্থান-পতন থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। তবে একদিন অনেক বড় উত্থান, পরের দিনই পতন হওয়া স্বাভাবিক নয়। বর্তমানে বাজারের গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজারে এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত লেনদেন হচ্ছে। একটি বিশেষ শ্রেণি এমন অবস্থা তৈরি করছে। অন্যদিকে ব্যাংকগুলোকে শেয়ারবাজারে বেশি বিনিয়োগের      সুযোগ দিলেও তারল্য সংকটে ব্যাংকগুলো শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে পারছে না। আবার বাজারে ভালো মানের শেয়ারের অভাব থাকায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করছেন না। এমন অবস্থায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও বাজারে বিনিয়োগ করার বিষয়ে উত্সাহ হারিয়ে ফেলেছেন।

শেয়ারবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন জারির পর শেয়ারবাজারে বড় উত্থান হলেও তা স্থায়ী হয়নি। বরং আবারো টানা দরপতন দেখা দিয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সবকটি মূল্যসূচকের পতন হয়েছে। সেই সঙ্গে কমেছে লেনদেনের পরিমাণ। এর মাধ্যমে টানা দুই কার্যদিবস মূল্যসূচক ও লেনদেন কমলো। এর আগের দিন গত রবিবার শেয়াবাজারের সূচকের অনেক বড় উত্থান হয়।

গত বৃহস্পতিবার ব্যাংকের এক্সপোজারে সংশোধনী এনে প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, এখন থেকে পুঁজিবাজারের বাইরে থাকা নির্ধারিত কয়েকটি খাতের প্রাইভেট লিমিটেড ও পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগকে ব্যাংকের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করা হবে না। ফলে সমপরিমাণ টাকা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে পারবে ব্যাংকগুলো।

বাজার সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে!

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ প্রজ্ঞাপন ছাড়াও সম্প্রতি শেয়ারবাজারের জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়। তবে এসব ঘোষণায় কোনো কাজ হচ্ছে না। বর্তমানে বাজারে লেনদেন প্রকৃতি দেখলে বোঝা যাচ্ছে যে এ ধরনের নিয়ন্ত্রিত লেনদেন বা সিন্ডিকেটের দ্বারা বাজার নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এ বিষয়ে শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, শেয়াবাজারের লেনদেন প্রকৃতি স্বাভাবিক নয়। বাজারে এক ধরনের ‘সিন্ডিকেট ম্যানেজড’ লেনদেন হচ্ছে। তিনি বলেন, বাজারে ভালো শেয়ার না থাকা দীর্ঘদিনের সমস্যা। এছাড়া যে সব কোম্পানি ভালো ডিভিডেন্ড দিত তারাও ডিভিডেন্ড কমিয়ে দিয়েছে। এমন অবস্থায় বিনিয়োগকারীরা অনেকাংশেই উত্সাহ হারিয়ে ফেলছেন।

এদিকে শেয়ারবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা না আসায় বাজার টেকসই হচ্ছে না। সম্প্রতি শেয়ারবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য এক্সপোজার লিমিট বাড়ানো হলেও আদতে বিনিয়োগ বাড়ছে না। কারণ হিসাবে সংশ্লিষ্টরা বলছে, ব্যাংকিং খাতে তারল্য (নগদ অর্থ) সংকট চলছে। এতে ব্যাংকগুলো তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার জন্যই যেখানে টাকা পাচ্ছে না সে ক্ষেত্রে কিভাবে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করবে। এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য সুযোগ করে দিলেও ব্যাংকগুলোর কাছে এখন টাকা নেই। একদিকে ব্যাংকের তারল্য সংকট অন্যদিকে শেয়ারবাজারের টালমাটাল অবস্থা— এমন অবস্থায় বিনিয়োগ করে কেউ ঝুঁকি নিতে চায় না।

শেয়ারবাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জানুয়ারি মাসে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের উত্থান হয়। প্রায় এক মাস টানা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় সবকটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ে। কিন্তু জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে এসে ছন্দপতন ঘটে শেয়ারবাজারে। দেখা দেয় টানা দরপতন। এরপর থেকে গত তিনমাস প্রায় একইভাবে চলছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেয়ারবাজারের খারাপ শেয়ারের পাশাপাশি ভাল শেয়ারগুলোরও দরপতন হচ্ছে। ফলে পুরো বাজারে তার প্রভাব পড়ছে। আর বাজারে ভাল শেয়ারের সংখ্যাও কম। এ সংখ্যা বাড়ানোর জন্য বিএসইসির প্রয়োজনীয় উদ্যোগও নিচ্ছে না।

সব সূচক নিম্নগামী

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সোমবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের কার্যদিবসের তুলনায় কমেছিল ৫৯ পয়েন্ট। আর গতকাল মঙ্গলবার এ সূচকটি ৩৯ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ২৩৬ পয়েন্টে নেমে গেছে। অপর দুই সূচকের মধ্যে ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৩ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ১৯৫ পয়েন্টে। আর ডিএসই-৩০ সূচক ১০ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৮২২ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।

এই দিনে ডিএসইতে যে কয়টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে, কমেছে তার দ্বিগুণের বেশি। দিনভর বাজারটিতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ৮৭টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ২১৭টির এবং দাম অপরিবর্তিত রয়েছে ৪৩টির।

মূল্যসূচক ও সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানের দাম কমার পাশাপাশি ডিএসইতে কমেছে লেনদেনের পরিমাণ। দিনভর বাজারটিতে মাত্র ৩৫১ কোটি ৬৯ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ৩৮৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকার শেয়ার। সে হিসাবে আজ লেনদেন কমেছে ৩৬ কোটি ৪ লাখ টাকা।

বাজারটিতে টাকার পরিমাণে সব থেকে বেশি লেনদেন হয়েছে রানার অটোমোবাইলের শেয়ার। কোম্পানিটির ৩৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। ১৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকার লেনদেনে দ্বিতীয় স্থানে ফরচুন সুজ এবং ১২ কোটি ৮১ লাখ টাকা লেনদেনে তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে এসকে ট্রিমস।

এছাড়া লেনদেনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলস, ব্র্যাক ব্যাংক, ডরিন পাওয়ার, ইস্টার্ন কেবলস, ন্যাশনাল টিউবস, এস্কয়ার নিট কম্পোজিট এবং বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন।

অন্যদিকে গতকাল সিএসইর সার্বিক সূচক সিএসসিএক্স ৪৬ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৭০২ পয়েন্টে। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ৩১ কোটি ৫১ লাখ টাকার। লেনদেনে অংশ নেওয়া ২১৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দাম বেড়েছে ৬০টির, কমেছে ১১৬টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৩৯টির।

প্রসঙ্গত, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়াতে সম্প্রতি নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেমন, ব্যাংকের এক্সপোজার সংশোধনী আনা হয়েছে। বিনিয়োগ বাড়াতে ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশকে (আইসিবি) দেওয়া হচ্ছে ৮৫৬ কোটি টাকার তহবিল। শেয়ারবাজার থেকে যাতে টাকা বের হয়ে না যায়, সে জন্য বন্ধ করা হচ্ছে প্লেসমেন্ট। নতুন করে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) আবেদন না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএসইসি।