আয়শা খানম
সভাপতি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বলেন, বাংলাদেশে বিগত চুয়াল্লিশ বছরে অর্জন অনেক। আজকে আইলা, সিডোর মোকাবিলা, সেনাবাহিনী-পুলিশ, পাহাড় হিমালয় জয়, প্যারাসুট জাম্পিং, রাষ্ট্র পরিচালনা কোন ক্ষেত্রেই পিছিয়ে নেই নারীরা। বিগত দুই দশকে এই অগ্রগতির পথে যাত্রার গতি বৃদ্ধি পেয়েছে। এ যাত্রা যেন ধারবাহিক থাকে সে লক্ষ্যে নারীদের নিরাপত্তা দেওয়া, তাদের জীবনের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। নারীদের এ অগ্রগতির ভিত কতখানি মজবুত তা দেখার দায়িত্ব রাষ্ট্রেরই। বর্তমানে নারী শ্রমিকরাই অর্থনীতির চাকাকে সচল রেখেছে। নারীরা গার্মেন্টস, কল-কারখানা ও অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত রয়েছে তাদের জীবনের নিরাপত্তা আজকে প্রশ্নবিদ্ধ। তাদের ন্যায্য ও পুরুষের সমান কাজের জন্য সমান মজুরী আজ অনিশ্চিত। জীবনমানের উন্নয়নে সবার সমমজুরী ব্যবস্থা, জীবনের নিশ্চয়তা রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। চাকরিজীবী নারীর সন্তানদের জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ডে- কেয়ার নিশ্চিত করতে হবে। এসব ব্যাবস্থা গ্রহণের মধ্যে দিয়েই নারীর অগ্রযাত্রার এ ধারা অব্যহত রাখা সম্ভব। যা আমাদের সোনার বাংলাদেশ গড়তে সাহায্য করবে।
হামিদা হোসেন
সভাপতি, আইন ও সালিস কেন্দ্র
আইন ও সালিস কেন্দ্রের সভাপতি হামিদা হোসেন বলেন, গত কয়েক বছরের ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাব নারীর প্রতি সহিংসতার হার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত বছর ইলেকশনকে কেন্দ্র করে, পাহাড়ী নারীর প্রতি যে সহিংসতা হয়েছে তা বর্ণনাতীত। নারী শ্রমিকদের জীবনেরও কোন নিরাপত্তা নেই। রানা প্লাজার ভয়াবহ দুর্ঘটনাই তার প্রমাণ। যেসব নারী আহত হয়েছে তাদের চিকিত্সার কোন ব্যবস্থা নেই। পথে ঘাটে সব ক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাব বর্তমানে নারীর অগ্রযাত্রার পথে সর্বোচ্চ প্রতিবন্ধকতা। গৃহকর্মীদের প্রতি নির্যাতনের হার অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। শিশু গৃহকর্মীদের উপর সে অত্যাচারের চিত্র আরও ভয়াবহ। নারী ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের আইনি সহায়তা দেবার লক্ষ্যেই আশির দশকে আইন ও সালিস কেন্দ্রের সূচনা। কিন্তু সমাজের সহনশীল দৃষ্টিভঙ্গির জন্য নারীদের সাথে সংঘটিত সহিংসতার সঠিক বিচারের পথ সহজ হয় না। নারীর অধিকার রক্ষায় নানা আইন থাকলেও তাদের সঠিক প্রয়োগ নেই। শিশু, নারীর অধিকার রক্ষায় প্রতিষ্ঠিত আইনের তেমন প্রচার নেই। সেসব আইন সব পর্যায়ের নারীদের কাছেই অজানা। তাই এসব আইন ও তাদের প্রয়োগের রিপোর্ট প্রতি বছর প্রকাশ করতে হবে। যা নারীদের মনোবল দিবে। তারা যে তাদের প্রতি সংঘটিত এ অন্যায়কে সহ্য না করে এর প্রতিরোধও করতে পারে তার উপলব্ধি হবে। এসবই নারীকে তার অধিকার প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করবে।
খুশি কবির
নির্বাহী পরিচালক, নিজেরা করি
নিজেরা করি সংগঠনের প্রধান খুশি কবির বলেন, আমাদের দেশের নারীরা শিক্ষাক্ষেত্র, চাকরিক্ষেত্রসহ অনেক জায়গায়ই এগিয়ে চলেছেন। গ্রামের নারীরাও এ ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন নন। কৃষিকাজেও পুরুষদের পাশাপাশি নারীরা চারারোপণ থেকে শুরু করে, তার বাজারজাতকরণ সবই করে থাকেন। গার্মেন্টস ও বিভিন্ন কারখানায় নারী শ্রমিকের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এসবই তাদের আয় করার সুযোগ বৃদ্ধিতে, স্বাধীনতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। কিন্তু বর্তমানের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় যে সমস্যা, তা হলো নারীর নিরাপত্তা। এসব গার্মেন্টেস, কারখানায় নারীর মজুরির মূল্যায়ন হয় না। আমাদের দেশে নারী শ্রমিকদের মজুরী খুবই কম। এ ছাড়া মানসিক, শারীরিক নির্যাতনের হারও বেড়ে চলেছে। গত কয়েক বছর বিবেচনা করলে আমরা দেখতে পাব পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা দিন দিন বাড়ছে তাদের নারীর উপর আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে। অগ্রগতির পথে নারীর যাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে। নিজ বাড়িতেও নারীর নিরাপত্তা নেই, তারা অত্যাচারিত হচ্ছে। আইনে যা রয়েছে তা-ও কাগজ ভিত্তিক, তার প্রয়োগ নেই। আমাদের এ চক্র প্রতিরোধে নিজেরদের অগ্রযাত্রার গতিকে ধরে রাখতে সংগঠিত থাকতে হবে। সমাজ আমাদের কী ভাবছে, কীভাবে দেখছে, এসব তোয়াক্কা করা যাবে না। আমারা পূর্ণবয়স্ক ও সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার আমাদের রয়েছে। আমরা মানুষ সে কথাটি উপলব্ধি করতে হবে। কোনো দোহাই দিয়েই আমাদের পিছিয়ে রাখবার চেষ্টাকে রুখতে হবে।
