রাজধানীতে অস্ত্র-গুলি-বোমাসহ গ্রেফতার ৫

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০১৪, ২২:১৮
ইত্তেফাক রিপোর্ট রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানী থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও বিস্ফোরকদ্রব্যসহ গাড়ি ছিনতাইয়ের সংঘবদ্ধ একটি চক্রকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গতকাল শনিবার রাত থেকে আজ বিকাল পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। অভিযানকালে ৫টি বিদেশি পিস্তল, ২৭ রাউন্ড গুলি, ৪টি পেট্রোল বোমা, পুলিশের ওয়াকিটকি, হ্যান্ডকাপ, দেশি-বিদেশি বিপুল-সংখ্যক ছোরা ও বাঘ-কুমিরের চামড়া উদ্ধার করা হয়। সন্ধ্যা পর্যন্ত এ ঘটনায় পুলিশ ৫ জনকে গ্রেফতার করেছে। তারা হলেন রোখসান্দা ইয়াসমিন (৫০), তার ছেলে মোশাউর জোনায়েদ মোহাম্মদ সালাম (২৮), জোনায়েদের বান্ধবী আফসারা রশীদ (২৫), মাঈনুদ্দিন এবং তুষার দিপোরা (২৮)। বনানী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ভূঁইয়া মাহবুব হোসেন বলেন, ‘শনিবার রাতে সোহার্দ নামের এক তরুণ মোবাইল বিক্রির জন্য তার বন্ধু হামজা নীলের শরণাপন্ন হন। হামজা কৌশলে সোহার্দকে আফসারার নম্বর দিয়ে যোগাযোগ করতে বলেন। সোহার্দ একটি প্রিমিও (সাদা) গাড়ি নিয়ে ১১ নম্বর রোডের এক চায়েনিজ রেস্তোরাঁর সামনে আসেন। এ সময় পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আফসারা টাকা দেয়ার জন্য সোহার্দকে নিয়ে সামনে এগিয়ে যান। এরপর আফসারার বন্ধু জোনায়েদ ল্যান্ড ক্রুজার গাড়ি নিয়ে সোহার্দের গাড়ি ক্রস করার মুহূর্তে ধাক্কা লাগার অভিনয় করেন। এই সূত্র ধরে জোনায়েদ গাড়ি থেকে নেমে সোহার্দকে গাড়ি থেকে বের করে নিজের গাড়িতে উঠিয়ে নেন। পাশাপাশি জোনায়েদের সহযোগীরা সোহার্দের গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যেতে উদ্যত হন। বিষয়টি থানার পুলিশের একটি টহলরত দলের নজরে পড়ে। পুলিশ গাড়িটির পিছু নিয়ে বিটিসিএল অফিসের কাছে তাদের আটকায়। এ অবস্থায় অন্যরা পালিয়ে গেলেও আটক করা হয় জোনায়েদ, মাঈনুদ্দিন ও আফসারাকে। পুলিশ তাদের গাড়ি তল্লাশ করে লোহার রড ও দুটি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। এরপর তাদের থানায় নিয়ে এসে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে জোনায়েদ স্বীকার করেন তার কাছে আরো অস্ত্র আছে।’ বনানী থানার ওসি বলেন, ‘পুলিশের দলটি রবিবার সকাল ৯টার কিছুক্ষণ পর জোনায়েদের বনানী ১ নম্বর রোডের ‘এফ’ ব্লকের ১০৫ নম্বর বাড়িতে অভিযান চালায়। সেখানে আরো বিপুল পরিমাণ অস্ত্র পাওয়া যায়। বাসায় অভিযানের সময় জুনায়েদের দেখানো একটি ভল্ট থেকে পাওয়া যায় ৩টি পিস্তল। এর মধ্যে একটি পুলিশের ব্যবহূত। আরো পাওয়া যায় ওয়াকিটকি, হ্যান্ডকাপ, একটি বাঘের, দুটি ভল্লুকের, একটি কুমিরের ও একটি একটি হরিণের চামড়া। বিপুল পরিমাণ ইয়াবা বড়িও ওই বাসায় পাওয়া যায়। এ ছাড়া পাওয়া যায় বিয়ার, মদ, ফেনসিডিল ও পেট্রোল বোমা। পরে সেখান থেকে আটক করা হয় জোনায়েদের মা রোখসান্দা ইয়াসমীন ও তুষার দিপোরাকে। গুলশান বিভাগের পুলিশের উপ-কমিশনার লুত্ফুল কবির বলেন, ‘এরা অভিজাত পরিবারের অপরাধী। প্রাথমিকভাবে আমাদের মনে হয়েছে—এরা সংঘবদ্ধ গাড়ি ছিনতাই চক্র। অভিনব পন্থায় এরা গাড়ি ছিনতাই করে থাকে। চক্রটি আফসারাকে ব্যবহার বরে ধনাঢ্য পরিবারের সন্তানদের টার্গেট করে গাড়ি ছিনতাই করে থাকে। এদের কাছ থেকে পাওয়া অস্ত্রে প্রমাণ হয়, এরা বড় ধরনের অপরাধী চক্র। আমরা এদের জিজ্ঞাসাবাদ করে কী কী অপরাধের সঙ্গে তারা যুক্ত, তা বের করতে পারব। আটককৃতদের নিয়ে এখনো অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এই চক্রের সঙ্গে আরো কারা জড়িত তাদের খুঁজে বের করারও চেষ্টা চলছে।’ বনানী থানার অফিসার ইনচার্জ বলেন, ‘উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ৫টি বিদেশি পিস্তল, ৭টি ম্যাগাজিন, ২৭ রাউন্ড গুলি ও গুলির খোসা, ২৭টি বিভিন্ন ধরনের দেশি-বিদেশি ছোরা, ১টি এয়ারগান, ৪টি শক্তিশালী পেট্রোল বোমা, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য। এ ছাড়া একটি বাঘের, দুটি ভল্লুকের, একটি কুমিরের, একটি হরিণের চামড়া জব্ধ করা হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে।’ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে—একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তার ছেলে জোনায়েদ। বনানীর ১ নম্বর রোডের ‘এফ’ ব্লকের ১০৫ নম্বর তাদের নিজেদের বাসা। অভিজাত পরিবারের সন্তান জোনায়েদ কয়েক বছর ধরেই বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। গাড়ি ছিনতাই থেকে শুরু করে বিভিন্ন লোককে ডিবি পরিচয় দিয়ে ধরে এনে নিজেদের বাসায় রাখতেন। নিজেকে কখনো পুলিশ আবার কখনো ডিবি পুলিশ পরিচয় দিতেন। পরে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে আটকৃত ব্যক্তিদের ছেড়ে দিতেন। জোনায়েদের বাসাতেই সন্ত্রাসীদের আড্ডা হতো। জুনায়েদ যাদের ধরে আনতেন, তাদের এই বাসায় লুকিয়ে রাখা হতো। যারা টাকা দিতে দেরি করত তাদের নানা কায়দা-কৌশলে নির্যাতন করা হতো। মূলত আফসারাকে দিয়েই টার্গেট করা ব্যক্তিদের গাড়ি ছিনতাই করা হতো অথবা কাউকে ধরে এনে নির্যাতন করে অর্থ আদায় করা হতো। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে—আফসারার বাড়ি উত্তরায়। তিনি এক সময় মালয়েশিয়ায় থাকতেন। সেখানে গাড়ি চুরির অপরাধে তাকে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এরপর তিনি ঢাকাতে এসেও একই ধরনের অপকর্ম চালিয়ে যেতে থাকেন। তিনি মূলত মাদকাসক্ত। জোনায়েদের সঙ্গে থেকে ইয়াবা, ফেনসিডিল এমনকি হেরোইন সেবনও করতেন আফসারা।