রহস্যের আবর্তে নিখোঁজ বিমান

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০১৪, ২২:৪৫
কোন বিপদ সংকেত মেলেনি। আকাশও ছিল পরিষ্কার। তবু যাত্রা শুরু করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উধাও হয়ে গেল মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের চীনের বেজিংগামী যাত্রীবাহী বিমান। গতকাল রবিবার রাত পর্যন্ত প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়েও ২৩৯ জন যাত্রীসহ বিমানটির কোন খোঁজ মেলেনি। বরং নানা ধরনের বক্তব্যে রহস্যের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে নিখোঁজ বিমানটি। এর মধ্যে শনিবার রাতে ইতালি এবং অস্ট্রিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের দেশের দুই নাগরিকের নাম নিখোঁজ বিমানের যাত্রী তালিকায় থাকলেও তারা যাননি। তাদের পাসপোর্ট আগেই চুরি হয়েছিল। সন্দেহ করা হচ্ছে ওই চুরি করা পাসপোর্ট নিয়ে কেউ বিমানে চড়ছিলেন। ফলে নাশকতার আশঙ্কায় তদন্তও শুরু করেছে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ। বিমানটি ফিরতে চেয়েছিল বলেও ধারণা করা হচ্ছে। খবর বিবিসি, রয়টার্স ও সিএনএন’র। মালয়েশিয়ার বিমানটি নিখোঁজ হওয়ার সাথে সন্ত্রাসী কোন কর্মকাণ্ডের যোগাযোগ আছে কি না তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হচ্ছে। কারণ বিমানটিতে এমন দু’জন যাত্রী ছিলেন যারা চুরি যাওয়া ইউরোপীয় পাসপোর্ট নিয়ে ভ্রমণ করছিলেন। দক্ষিণ চীন সাগরে তেলের স্তর ভাসতে দেখা ছাড়া নিখোঁজ বিমানটির ধ্বংসাবশেষের কোন সন্ধান এখনো মেলেনি। গতকাল কিছু ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়। কিন্তু পরে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানান, এই ধ্বংসাবশেষ নিখোঁজ বিমানের নয়। মালয়েশিয়ান বিমান সংস্থার পক্ষ থেকে নিখোঁজ যাত্রীদের অপেক্ষমাণ স্বজনদের বলা হচ্ছে, সবচেয়ে খারাপ খবরের জন্য তৈরি থাকতে। ভুয়া পাসপোর্ট নিয়ে ভ্রমণ করছে এমন চারজন যাত্রী ওই বিমানে ছিল। এর মধ্যে দু’জন যাত্রী ছিল যারা চুরি করা ইউরোপিয়ান পাসপোর্ট নিয়ে ভ্রমণ করছিল। এরা দু’জনই একই সময় টিকিট কিনেছিল এবং বেইজিং থেকে অন্য একটি বিমানে করে তাদের আমস্টার্ডম এবং ইউরোপের অন্য কোন গন্তব্যে যাওয়ার কথা ছিল। মালয়েশিয়ার বিমান চলাচল কর্মকর্তা আজহারুদ্দিন আবদুল রহমান বলেছেন, ভুয়া পাসপোর্ট নিয়ে ভ্রমণ করছে এমন দু’জন যাত্রী ওই বিমানে ছিল। আমরা তাদের সব সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে দেখছি তাদের চেক-ইন করা থেকে বিমানে ওঠা পর্যন্ত। যদিও এখন পর্যন্ত এ ঘটনাটি সন্ত্রাসীদের কাজ হতে পারে এমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু মালয়েশিয়ার গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষ এবং সন্ত্রাস-দমন কর্মকর্তারা বিমানটির যাত্রীদের পুরো তালিকাটি পরীক্ষা করে দেখছেন। কর্মকর্তারা জানান, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ থেকে সংগৃহীত ৪০টি জাহাজ ও ৩৪ টি বিমান অনুসন্ধান কার্যক্রম চালাচ্ছে। মালয়েশিয়া বিমান বাহিনীর প্রধান জেনারেল রোদজালি দাউদ রাডার ডাটার বরাত দিয়ে বলেন, বিমানটি তার নির্ধারিত গতিপথ পরিবর্তন করে ফিরে আসছিল এমন সুস্পষ্ট সম্ভাবনা আছে। অন্যদিকে রাডার ডাটা থেকে আভাস পাওয়া যাচ্ছে নিখোঁজ হবার আগে বিমানটি হয়তো দিক পরিবর্তন করে ফিরে আসার চেষ্টা করছিল। তাই এখন অনুসন্ধানের জায়গার আওতা বাড়িয়ে তা মালয়েশিয়ার পশ্চিম উপকূল পর্যন্ত সমপ্রসারিত করা হয়েছে। বিমানটি নিখোঁজ হবার পর এখন ৩৬ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত বিমানটির কোন খবরই পাওয়া যায়নি। যাত্রীদের স্বজনদের খারাপ কিছু শোনার জন্য তৈরি থাকতে বলা হয়েছে। যাত্রীদের কাউকে জীবিত পাওয়া যাবে এমন আশা অনুসন্ধানকারীরাও এখন প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন বলেই মনে হচ্ছে। প্রথমে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ ভেবেছিলেন, হয়তো অন্য কোন বিমানবন্দরে নেমেছে সেটি। কিন্তু দিন যতোই গড়াতে থাকে, ততই সে সম্ভাবনা ক্ষীণ হতে থাকে। একটা সময় স্পষ্ট হয়ে যায়, কোথাও-ই নামেনি বিমানটি। এর মধ্যেই ভিয়েতনামের নৌবাহিনীর কর্তা গো ভ্যান ফত ঘোষণা করেন, তাইল্যান্ডের উপসাগরে ভেঙে পড়েছে সেটি। কিন্তু সে খবর মানতে নারাজ মালয়েশিয়ার পরিবহন মন্ত্রী হিশামুদ্দিন হুসেন বলেন, আমরা সর্বশক্তি দিয়ে বিমানটি খোঁজার চেষ্টা করছি। কিন্তু মালয়েশীয় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, ওড়ার পর অন্তত দু’ঘণ্টা আকাশে ছিল বিমানটি। সেই হিসাব সত্যি হলে দু’ঘণ্টায় ভিয়েতনাম পেরিয়ে যাওয়ার কথা সেটির। তা হলে কীভাবে ভিয়েতনামের দক্ষিণে তাই উপসাগরের একটি অংশে তা ভেঙে পড়তে পারে। অন্য একটি সূত্রে আবার দাবি করা হয়, রাত ১টা ১৯ মিনিটে শেষ বারের মতো এটিসির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল বিমানটি। সেই তথ্য সত্যি হলে তাই উপসাগরে ভেঙে পড়ার তত্ত্বই ঠিক হতেই পারে। কিন্তু মালয়েশীয় এয়ারলাইন্স এ কথা মানতে নারাজ। বিমানটি সত্যিই ভেঙে পড়লে আরোহীদের এক জনেরও বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা প্রায় নেই। ২০০৯ সালের জুনে ঠিক একইভাবে হারিয়ে গিয়েছিল এয়ার ফ্রান্সের একটি বিমান। কয়েক ঘণ্টা নিখোঁজ থাকার পর ধ্বংসাবশেষ মেলে দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে। মারা গিয়েছিলেন ২২৮ জন আরোহী।