সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের ১৮ একর জমি বেদখল

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০১৪, ২৩:০৩
মহাখালীতে অবস্থিত সরকারি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের ১৮ একর জমি বহু বছর ধরে বেদখল হয়ে আছে। বস্তিঘরসহ বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা তৈরি করে একটি সিন্ডিকেট বছরে কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নিচ্ছে। অথচ হাসপাতালের পানি, বিদ্যুত্ ও গ্যাস ব্যবহার করছে এখানে বসবাসকারীরা। আর এগুলোর বিল পরিশোধ করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এদিকে রাজধানীর আটটি সরকারি হাসপাতাল এলাকায় নির্মিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। এই হাসপাতালগুলো হল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট, কিডনি ইনস্টিটিউট, মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, পঙ্গু হাসপাতাল, ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও নিউরো সায়েন্স ইনস্টিটিউট। অবৈধ স্থাপনা ও এখানে নিয়মিত সন্ত্রাসীদের আনাগোনার কারণে প্রায়ই রোগী ও স্বজনদের নানা ধরনের ঝামেলা পোহাতে হত। অভিযোগ আছে, প্রায়ই রাতে মাদকের আড্ডা বসে এসব হাসপাতাল এলাকাতে। রোগী, দর্শনার্থীরা, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা প্রায়ই ছিনতাইকারীদের খপ্পরে পড়ত। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করেন, অবৈধ স্থাপনা ও সন্ত্রাসীদের আড্ডাখানা বহুবছর চেষ্টা চালিয়েও উচ্ছেদে ব্যর্থ হতে হয়েছে। অবৈধ স্থাপনার মালিকদের হাত অনেক লম্বা। কেউ কেউ ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী। সন্ত্রারীরা এখানে কোটি কোটি টাকার মাদক ব্যবসা করে। আবার মাদক ব্যবসা ও অবৈধ স্থাপনার ভাড়ার টাকার ভাগ স্থানীয় হাসপাতালের এক শ্রেণীর কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের পকেটেও যায়। এসব কারণে হাসপাতাল চত্বর থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা সম্ভব হয় না। আর ওই সকল অবৈধ স্থাপনা ও মাদক ব্যবসায়ীরা হাসপাতালের ওষুধ পাচারের সঙ্গেও জড়িত বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান। আগে নামকাওয়াস্তে মন্ত্রণালয় থেকে ওই সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হত। পরের দিনই সেখানে আবারো অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠে। বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম হাসপাতালে পরিদর্শনে গিয়ে ওই সকল অবৈধ স্থাপনা ও রোগীদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি স্বচক্ষে দেখেন। রোগী ভাগিয়ে নেয়ার বাণিজ্য সম্পর্কেও মন্ত্রী অবহিত হন। মন্ত্রী সরকারি হাসপাতালে আগত দরিদ্র রোগীদের নিরাপত্তা প্রদান ও হাসপাতালের সুন্দর পরিবেশের জন্য অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেন। এ নির্দেশের পর রাজধানীসহ সারা দেশে সরকারি হাসপাতাল চত্বরে গড়ে উঠা অবৈধ স্থাপনা ও অপরাধীদের আড্ডাখানা উচ্ছেদ শুরু হয়। সরেজমিনে দেখা গেছে, কয়েকটি হাসপাতালের সামনে গড়ে ওঠেছে মানহীন ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এসকল সেন্টারে রোগী ভাগিয়ে আনা হয়। জানা গেছে, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের সঙ্গে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধেও অভিযান চলছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ইত্তেফাককে বলেন, উচ্ছেদের পর সেখানে পুনরায় স্থাপনা নির্মাণ করার সুযোগ কেউ আর পাবে না। সেই ব্যবস্থা নেয়ার জন্যও স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে প্রতিদিন সারা দেশ থেকে শুধু কুকুরের কামড়ে আহত কয়েকশ রোগী চিকিত্সার জন্য আসেন। জলাতঙ্ক কিংবা এইডস রোগীসহ যে কোন ধরণের সংক্রামক ব্যধিতে আক্রান্তরাই এই হাসপাতালে চিকিত্সার জন্য ভর্তি হন। হাসপাতাল ভবনটির চারিদিকে অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠেছে। সেখানে বসে অপরাধীদের আড্ডাখানা। হাসপাতালের প্রবেশ পথে ময়লা-অবর্জনা ফেলায় দুর্গন্ধময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এ জঞ্জালের মধ্য দিয়ে কি যে ঝুঁকিপূর্ণভাবে রোগীরা চিকিত্সার জন্য আসছেন তা চোখে না দেখলে বোঝা যাবে না। প্রতি মাসে হাসপাতাল চত্বরে শতকোটি টাকার মাদক বেচাকেনা হয়। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করে পেশাদার কিলার ও সরকারি দলের নেতাকর্মী পরিচয়দানকারী একশ্রেণীর ব্যক্তি। অস্ত্র বেচাকেনাসহ রাজধানীর অপরাধীদের নিরাপদ স্থান হলো এই এলাকা। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালটি ‘সাততলা বস্তি’ হিসেবে খ্যাত। প্রকাশ্যে রোগীদের টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও চিকিত্সকদের সামনে। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্বাস্থ্য সচিবকে ওই সকল অবৈধ স্থাপনা ও অপরাধীদের আড্ডাখানা সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ করে তা উচ্ছেদের আবেদন জানান। হাসপাতালটির নামে ৩৫ একর জায়গা বরাদ্দ। এর মধ্যে হাসপাতাল ভবন ও কোয়ার্টার মিলে ৭ একর জায়গা রয়েছে। ১০ একর জায়গায় স্বাস্থ্য সেবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মিত হয়েছে। ১৮ একর জায়গা বহুবছর ধরে অবৈধ দখলে। ওই জায়গায় অবৈধ স্থাপনাসহ সন্ত্রাসীদের আড্ডাখানা গড়ে উঠেছে। ৩০ বছর চেষ্টা করেও ওই সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা সম্ভব হয় নি বলে কর্তৃপক্ষ জানান। বস্তির মালিক হাসপাতালের একশ্রেণীর কর্মচারীও রয়েছে বলে জানা যায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. দীন মোহাম্মদ নুরুল হক বলেন, সারা দেশে সরকারি হাসপাতাল চত্বর ও আশেপাশে গড়ে উঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শুরু হয়েছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালসহ অন্যান্য হাসপাতালের অবৈধ স্থাপনাও উচ্ছেদ করা হবে বলে তিনি জানান।