‘জঙ্গি জীবনে আসা যায় তবে ফেরা যায় না’

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০১৪, ২৩:০৮
‘ইচ্ছা ছিল বাবার মত ব্যাংক কর্মকর্তা হওয়ার। সে লক্ষ্যে এইচএসসি পাস করার পর রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ-তে ভর্তি হয়েছিলাম। দিনগুলো ভালই কাটছিল। সেখানে পড়াকালেই পরিচয় হয় জেএমবির সূরা সদস্য আতাউর রহমান সানির সঙ্গে (২০০৮ সালে তার ফাঁসি কার্যকর হয়)। তার কারণেই জেএমবির (জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ) কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া। সেটা ২০০০ সালের দিকের কথা। পরবর্তী সময়ে গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘ কারাবাসে থাকার সময় ব্যাংক কর্মকর্তা (অবসরপ্রাপ্ত) বাবার মৃত্যু। জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর স্বজনরা আমাকে বার বার অনুরোধ জানিয়েছেন জেএমবির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে। কিন্তু বাস্তবতা এই যে—জঙ্গি জীবনে আসা যায়, তবে সেখান থেকে ফেরা যায় না।’—গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এসব কথা বলেছেন মোহাম্মদ জাকারিয়া। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজন ভ্যানে গুলি ও বোমা ফাঁটিয়ে তিন আসামিকে ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত আসামি জাকারিয়াকে ২০ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। টাঙ্গাইলের সখিপুর থানা পুলিশের করা দুটি মামলায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এছাড়া রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে জাকারিয়ার স্ত্রী স্বপ্না, ভাই ইউসুফ, জাকারিয়ার সহযোগী রাসেল ওরফে রায়হান ও জেএমবি জঙ্গি সন্দেহে জামালপুর থেকে গ্রেফতার হওয়া রাজু আহমেদের। জাকারিয়ার গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার জিরানপুর। তার বাবা আজহার উদ্দিন ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা। কয়েক বছর আগে তিনি মারা যান। ঢাকার পূর্ব বাসাবো এলাকায় তাদের নিজস্ব বাড়ি রয়েছে। দুই ভাইয়ের মধ্যে জাকারিয়া বড়। গ্রেফতার হওয়ার পর জাকারিয়া ও তার স্ত্রী শুরুর দিকে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে অনেক কথাই এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেন। পরবর্তী সময়ে তারা মুখ খুলতে শুরু করেন। প্রিজন ভ্যান থেকে আসামি ছিনতাই মিশনে অর্থ যোগানদাতাসহ বিস্তারিত ঘটনার বর্ণনা করেছেন জাকারিয়া। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে গোয়েন্দারা চিহ্নিত করেছেন (আসামি ছিনতাই পরিকল্পনায়) অর্থের যোগানদাতা জেএমবি সদস্য রাহাত ও আজমীর ওরফে অমিতকে। রাজধানীতে তাদের একাধিক গার্মেন্টস রয়েছে। এদের মধ্যে রাহাতের বাড়ি বরগুনা জেলায়। তার বিরুদ্ধে জালটাকা তৈরির অভিযোগে বিভিন্ন থানায় মামলা রয়েছে। ইতিমধ্যে পুলিশ তাকে একাধিকবার গ্রেফতারও করেছিল। আজমীরের বাড়ি নোয়াখালীতে। জাকারিয়া জানান, তিন বন্দীকে ছিনতাইয়ের ঘটনার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকে ভালুকায় একাধিক বাসা ভাড়া নেয়া হয়েছিল। এ ব্যাপারে নিয়মিত মোবাইল ফোনে জঙ্গি (জাকারিয়ার কথায় বন্দী) রাকিব, মিজান ও সালেহীনের সঙ্গে নিয়মিত কথা হতো। ঘটনার কয়েকদিন আগে বাইরে থেকে একটি মোবাইল ফোন পাঠানো হয়েছিল জঙ্গি বোমা মিজানের কাছে। ঘটনার দিন সকাল ৮টা ৪৭ মিনিটে বোমা মিজান (কারাগার থেকে প্রিজন ভ্যানে ওঠার পর) একটি ম্যাসেজ পাঠান। ম্যাসেজে লেখা ছিল, ‘আসসালামু আলাইকুম, আমরা ভালো আছি, আপনারা ভালো আছেন তো’। এ ম্যাসেজ পাওয়ার পরপরই ছিনতাইয়ে অংশগ্রহণকারীরা প্রস্তুত হয়েছিল। কারাগারে মোবাইল ফোন ব্যবহার সম্পর্কে জাকারিয়া জানান, কারাগারে মোবাইল ফোন ব্যবহার ওপেন সিক্রেট। জ্যামারের কথা বলা হলেও বাস্তবে জ্যামার কোন কাজে আসে না। তাছাড়া ২৪ ঘন্টা তো জ্যামার সচল থাকে না। অস্ত্র সংগ্রহের ব্যাপারে জাকারিয়া জানান, কাশিমপুর কারাগারে ভেতরই বেশ কয়েক অস্ত্র ব্যবসায়ী সন্ত্রাসীর সঙ্গে রাকিব, বোমা মিজান ও সালেহীনের পরিচয় হয়। তাদের দেয়া তথ্য মতে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল ৮টি আগ্নেয়াস্ত্র (৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে)। এছাড়া বন্দী ছিনতাইয়ের জন্য মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার, মোটর সাইকেলের পাশাপাশি পাবনা থেকে ২০ লাখ টাকায় কেনা হয়েছিল একটি ট্রাক। ডিবির এডিসি ছানোয়ার হোসেন বলেন, পলাতক জঙ্গি ও তাদের ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনায় জড়িত সবাইকে কমবেশি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তাদেরকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে। পুলিশের এ কর্মকর্তা আশাবাদী, খুব অল্প সময়ের মধ্যে তাদের গ্রেফতার করা সম্ভব হবে। তিনি আর কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।