শস্য ও মত্স্য ভাণ্ডার বলে খ্যাত পটুয়াখালি জেলার দশমিনা উপজেলা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লুটোপুটি তার চারপাশ। হঠাত্ পরিকল্পনা, পরের দিন সন্ধ্যায় কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে আরামদায়ক পরিবহন জাহাজে করে ছুটে চলা। আকস্মিক সিদ্ধান্ত তাই সঙ্গে শুধু অতি ব্যস্ত এমএ কালাম। সন্ধ্যা ৭টায় সদরঘাট থেকে হুইসেল বাজিয়ে জাহাজ চলল ইট-কাঠের ঢাকা শহরটাকে টাটা দিয়ে। যাত্রীরা বেশির ভাগই যে যার মতো কেবিনে। ডেকের যাত্রীরা আছেন কেউ শুয়ে, কেউ বসে, কেউবা আবার খোশগল্পে মেতেছেস। নানা রঙের মানুষের মিলন মেলা জমেছে এমভি জাহিদ-৩ নামক জাহাজে। আমি আর কালাম ‘দে-ছুট’ বলে কথা, তাই স্টিমারের এক প্রান্ত হতে আরেক প্রান্ত ছুটে বেড়াই নতুন কিছু দেখার আশায়। ভাব করি জাহাজের খালাসি থেকে শুরু করে কেবিনবয় পর্যন্ত। কৈশোরের দুরন্তপনা এখনও লালন করি উড়ন্ত মনে। তাই ভ্রমণে গেলে ভাবে থাকতে পারি না। দীর্ঘ পনের ঘণ্টার জার্নিতে একসময় সবাইকে আপন করে নিই, তারাও আমাদেরকে আপন করে নেয়। এ ছাড়া এমনিতে পুরান ঢাকার লোকেরা যেকোনো নতুন পরিবেশে মিশে যেতে পারে। সকাল দশটার দিকে দশমিনার আগের ঘাট বাঁশবাড়িয়ায় জাহাজ ভিড়ল। সাত-পাঁচ না ভেবেই নেমে পড়লাম পল্টুনে। বাইকে করে ছুটলাম দশমিনা। পথের দু-পাশের মায়াময় প্রাকৃতিক দৃশ্য বারবার কবি মাইকেল মধুসূধন দত্ত ও জীবনান্দ দাশের কথা মনে করিয়ে দেয়। চল্লিশ মিনিটের পথ যেন চল্লিশ সেকেন্ডেই শেষ হয়। বাইক থামল দশমিনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে। আগে থেকেই অপেক্ষমান ডা. আওলাদ আমাদেরকে বরণ করে নিলেন। তার বাড়িতেই আতিথ্য গ্রহণ করলাম। কিছুক্ষণের জন্য তার চেম্বারে বসে অবাক হয়েছি গ্রামের সহজ, সরল মানুষের ভালোবাসার উচ্ছ্বাস দেখে। ডাক্তার সাহেবকে ভালোবেসে অধিকাংশ পুরাতন রোগীরা টাকার বদলে বাজেট হিসেবে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন হাঁস, মুরগি, কোয়েল আর কবুতরের বাচ্চা। ডা. আওলাদও তাদেরকে ভালোবেসে, সুযোগ থাকা সত্ত্বেও রয়ে গেছেন এই অজপাড়াগাঁয়। দুপুরের আহার শেষে ছুটলাম হাজীর হাট, তেঁতুলিয়া নদীর ধারে। তেঁতুলিয়া নদীর আকাশটা যেন একটু অন্য রকম। শুধু অনুভব করা যাবে, লিখে বুঝানো সম্ভব নয়। ঘাট থেকে মাছের ট্রলারে চড়ে ছুটলাম গত বছর ১৯ ফেব্রুয়ারিতে উদ্বোধন হওয়া দশমিনা বীজবর্ধন খামারে। ততক্ষণে প্রায় সন্ধ্যা। ১০৪৪ একর আয়তনের এই রবিশস্য খামার। পাশাপাশি অবকাশের জন্য ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য দারুণ একটি জায়গা। তেঁতুলিয়া নদীর বুকে জেগে উঠা চড়ে, বাতাসে দোল দেওয়া ফসলের মাঠ দৃষ্টির সীমাকে করে প্রসারিত। ট্রলারের পাটাতনে চিত্ হয়ে শুয়ে আকাশের তারা গুনতে গুনতে ফিরে এলাম হাজির হাটে। রাতে ঢুঁ মারলাম খেজুর গাছের বাগানে। সাবাড় করে দিলাম সদ্য গাছ থেকে নামিয়ে আনা কয়েক হাঁড়ি খেজুরের রস। পরের দিন দশমিনার ঐতিহ্যবাহী বিখ্যাত কবিরাজ বাড়ি ঘুরতে গেলাম। বিশাল শান-বাঁধানো দিঘি, চারদিকে পুরোনো বৃক্ষরাজি। স্বর্গীয় নিবারণ কবিরাজের দশম পুত্রের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম বাংলা ১২০০ থেকে ১২১০ সালের মধ্যে এই বাড়িটি নির্মাণ করা হয়েছিল। কাঠ, টিন দিয়ে তৈরি কারুকার্যময় বেশ দৃষ্টিনন্দন বাড়িঘর। দশমিনা খুব ছোট উপজেলা, কিন্তু এর পর্যটন শিল্পের জন্য রয়েছে অপার সম্ভাবনা, স্থানীয়দের আচার-আচারণ পর্যটন বান্ধব, রয়েছে অফুরন্ত প্রাকৃতিক ভাণ্ডার। বেলা তিনটায় দশমিনা হতে ফিরতি লঞ্চে যান্ত্রিক শহর ঢাকা অভিমুখে যাত্রা। সকালে যখন সদরঘাট জাহাজ ভিড়ল, তখন কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে মনের অজান্তেই দশমিনার আঞ্চলিক ভাষায় বলে উঠলাম, ‘ও মোর খোদা, এ কোম্বে আইলাম!’
যোগাযোগ :ঢাকার সদরঘাট টার্মিনাল থেকে পটুয়াখালীর রাঙাবালি পর্যন্ত জাহাজ চলাচল করে, দশমিনা যেতে হলে নামতে হবে হাজির হাট আর সময় বাঁচাতে চাইলে বাঁশবাড়িয়া নৌ-ঘাট, ভাড়া সিঙ্গেল কেবিন ১০০০ টাকা, ডাবল ১৮০০ টাকা এবং ডেকের যাত্রীদের ভাড়া প্রতিজন ৩০০ টাকা মাত্র। আর টিকেট যাত্রার দিন বেলা ২টা থেকে ৩টার মধ্যে নিলেই হবে। জাহাজ ছাড়ে সন্ধ্যে ৭টায়।
দশমিনায় থাকা-খাওয়ার জন্য মধ্যম মানের আবাসিক বোর্ডিং ও রেস্টুরেন্ট আছে। ডাকবাংলোতে রাত কাটাতে চাইলে জেলা পরিষদ হতে পূর্ব অনুমতি নিতে হবে।
