জ্বালানি তেল শোধনের জন্য চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত দেশের একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) উত্পাদন ক্ষমতা এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বছরে মাত্র ১৫ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্পাদনে সক্ষম। কিন্তু দেশে জ্বালানি তেলের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৫৬ লাখ টন। ফলে প্রতিবছর বিদেশ থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করতে গিয়ে সরকারকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এই অর্থের যোগান দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। তেল কেনার জন্য দেশি-বিদেশি ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের বিপরীতে গুণতে হচ্ছে বিপুল অংকের সুদ।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বর্তমান শোধনাগারের চেয়ে দ্বিগুণ উত্পাদন ক্ষমতার নতুন একটি শোধনাগার বসাতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছে বিপিসির কয়েকটি সূত্র। সূত্রমতে, চীনের সহযোগিতায় পতেঙ্গাস্থ ইস্টার্ন রিফাইনারি কমপ্লেক্সে নতুন শোধনাগার স্থাপনের উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে।
প্রায় এক দশক আগে বিপিসি ইস্টার্ন রিফাইনারির উত্পাদন বাড়াতে প্রতিষ্ঠানটির আধুনিকায়নের (বিএমআরই—ব্যালেন্সিং, মডার্নাইজেশন, রিহ্যাবিলিটেশন, এক্সপানশন) উদ্যোগ নিয়েছিল। তখন এ জন্য নিয়োজিত একটি বিদেশি সংস্থা তাদের সমীক্ষায় বিপিসিকে নতুন রিফাইনারি বসানোর পরামর্শ দিয়েছিলো। কোনো দাতা সংস্থা থেকে এ ব্যাপারে অর্থ পাওয়া না যাওয়ায় কাজে কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে জানান সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র। এদিকে গত ৮ মার্চ চট্টগ্রামের এক অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ জানান, চীনের সহযোগিতায় দেশে একটি নতুন জ্বালানি তেলের রিফাইনারি স্থাপন করা হবে।
বিপিসির পরিচালক (অপারেশন) মোসলেহউদ্দিন ইত্তেফাককে জানান, পতেঙ্গার পুরনো রিফাইনারির পাশে নতুন একটি রিফাইনারি স্থাপনে চীন সরকারের পক্ষ থেকে কারিগরি প্রস্তাব এসেছে। এ বিষয়ে উভয় সরকারের মধ্যে কথাবার্তা শুরু হয়েছে। আগামী ১৮ মার্চ এ ব্যাপারে চীন সরকারের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে আসছে। তিনি বলেন, চীন সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া কারিগরি প্রস্তাবটি মূল্যায়নের জন্য একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হবে। এ লক্ষ্যে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রাথমিকভাবে ৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দের জন্য আবেদন করা হয়েছে। বিষয়টির আরো অগ্রগতি হলে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সমীক্ষা ও অন্যান্য কাজ ধাপে ধাপে সম্পাদনে মোট ১৭৮ কোটি টাকা লাগবে। তিনি জানান, ইস্টার্ন রিফাইনারির পুরনো প্ল্যান্টটি বর্তমানে বছরে উত্পাদন করে সর্বমোট ১৫ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি। কিন্তু দেশের জ্বালানি চাহিদা এখন বার্ষিক ৫৬ লাখ মেট্রিক টন। নতুন যে রিফাইনারি স্থাপনের কথা বর্তমান সরকার ভাবছে সেটির উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩০ লাখ মেট্রিক টন। ফলে দুইটি রিফাইনারি মিলে বছরে ৪৫ লাখ টন জ্বালানি উত্পাদন করতে পারলে বিপিসির পরিশোধিত জ্বালানির আমদানির পরিমাণ কমে গিয়ে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থের সাশ্রয় হবে। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে ক্রমবর্ধমান চাহিদার মুখে বছরে কেবল ডিজেলই লাগছে ৩০ লাখ টন। আর চাহিদার সিংহভাগ ডিজেলই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। নতুন রিফাইনারি স্থাপিত হলে পরিশোধিত ডিজেল আমদানিও কমে যাবে উল্লেখযোগ্য হারে।
বিপিসি’র উর্ধ্বতন অপর একটি সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে বিপিসি-কে ৩৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকার জ্বালানি তেল আমদানি করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য স্থিতিশীল থাকাতে এই খরচ হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য অস্থিতিশীল হলে খরচ আরো বেড়ে যেতো। সূত্র জানান, নতুন রিফাইনারি স্থাপিত হলে প্রতি ব্যারেল জ্বালানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাশ্রয় হবে ৪ থেকে ৫ ডলার।
