অলস টাকার পরিমাণ বাড়ছেই। বর্তমানে ব্যাংকিং সেক্টরে অলস টাকার পরিমাণ প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা। আমানত সংগ্রহ করে ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে পারছে না। এদিকে ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয় বাড়ছে। ফলে বেশিরভাগ ব্যাংকেরই মুনাফা কমে গেছে। কমে গেছে তাদের লভ্যাংশ প্রদানের হার। এতে পুঁজিবাজারে ব্যাংকিং খাতের শেয়ারেও বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। লভ্যাংশ ঘোষণা করার পর দরপতন আরও তীব্র হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, গত জুলাইয়ে ব্যাংকিং সেক্টরে অলস টাকার পরিমাণ ছিল ৭০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এরপর রাজনৈতিক অস্থিরতা তীব্র হওয়ায় অলস টাকাও অনেক বেড়ে গেছে। বর্তমানে এর পরিমাণ ৯০ হাজার কোটি টাকার উপরে। এরমধ্যে কিছু টাকা বিল ও বন্ডের মধ্যে রয়েছে। এরপরও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এত বড় অঙ্কের অর্থ অলস পড়ে থাকা মোটেও ইতিবাচক নয়। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আশা করছে, সামনে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সাথে বিনিয়োগ বাড়তে থাকবে। ফলে অলস টাকাও কমতে থাকবে। তাই ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমা নিয়ে শঙ্কা থাকবে না। এদিকে ২০১১ সালে দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত মুনাফা হয়েছিল নয় হাজার ১২১ কোটি টাকা। ২০১২ সালে হয়েছে চার হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা। ২০১৩ সালে তা আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। যা শেয়ারবাজারের জন্য কোনোভাবেই ইতিবাচক নয়। ইতিমধ্যে ব্যাংকের মুনাফা কমে যাওয়ার প্রভাব বাজারে পড়তে শুরু করেছে।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে সাধারণত মূলধন ও লেনদেনের দিক থেকে ব্যাংকের শেয়ারগুলোর প্রাধান্য থাকে সবচেয়ে বেশি। ২০০৯ ও ২০১০ এর শেয়ারবাজার উত্থানের পেছনেও এ শেয়ারগুলোর চাহিদা বৃদ্ধি ছিল অন্যতম কারণ। বর্তমানে এ শেয়ারগুলোর লেনদেন হচ্ছে খুব কম। তাছাড়া মুনাফা কমে যাওয়ায় ব্যাংকের শেয়ারের দামও তলানীতে চলে এসেছে। এরপরও এসব শেয়ারের চাহিদা খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। উপরন্তু লভ্যাংশ ঘোষণার পর শেয়ারগুলোর দাম আরও কমে গেছে। তথ্যে দেখা গেছে, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত ৩০টি কোম্পানির মধ্যে বেশিরভাগ কোম্পানিরই শেয়ারের দাম ফেসভ্যালুর কাছাকাছি অবস্থান করছে। লভ্যাংশ ঘোষণা করার পর এ শেয়ারগুলোর দাম আরও কমে গেছে।
ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক বছর আগেও ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহের জন্য অসম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল। অনেক ব্যাংক আমানত টানতে সুদ গুনেছিল ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ঋণের চাহিদা কমে গেছে। ফলে বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে ৯০ হাজার কোটি টাকার আমানত অলস পড়ে আছে। ইতিমধ্যে ব্যাংকগুলো আমানত নিরুত্সাহিত করতে আমানতে সুদের হার কমিয়ে দিয়েছে। ব্যাংকে টাকা অলস পড়ে থাকার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে বেসরকারি একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জাতীয় নির্বাচনের পর সরকার স্থিতিশীল হলেও উদ্যোক্তারা এখনও ভরসা করতে পারছেন না। ফলে তারা বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছেন। তাছাড়া ব্যাংকগুলোও ঋণ দিতে খুব সতর্ক থাকছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক দুর্নীতির কারণেও ঋণের ক্ষেত্রে সাবধানী হতে হচ্ছে। অনেক যাচাই-বাছাই করে ঋণ দিতে হচ্ছে। তাছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্পে ঋণ দেয়া হচ্ছে না। এসব কারণে ব্যাংকগুলোতে অলস টাকা বাড়ছে। এদিকে নতুন কয়েকটি ব্যাংক কার্যক্রম শুরু করায় ব্যাংকিং সেক্টরের প্রতিযোগিতা বেড়ে গেছে। ফলে ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। বেড়েছে ঋণ প্রদানেরও প্রতিযোগিতা। এসব কারণে ব্যাংকগুলোর অলস টাকা বাড়ছে, বাড়ছে খরচ। আর মুনাফা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে ঋণের চাহিদা খুব কম। ফলে ঋণ বাড়ানোর চেষ্টা করলেও সেটা সম্ভব হচ্ছে না। শাখাগুলোকে ঋণ বিতরণের যে লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হচ্ছে তা পূরণ হচ্ছে না। এতে ব্যাংকের অলস টাকা বেড়ে যাচ্ছে। এসব প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুস্তাহিদুর রহমান বলেন, দেশে গত দেড় বা দুই বছর ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছে। এ অবস্থায় উদ্যোক্তারা খুব কম বিনিয়োগ করেছেন। ফলে ব্যাংকগুলোর ঋণও কমে গেছে। এতে ব্যাংকগুলোর অলস টাকা বেড়ে মুনাফা কমেছে। যা ব্যাংকগুলোর শেয়ারেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে সরকার যদি পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে পারে তবে তা অচিরেই শিথিল হয়ে যাবে।
