রূপান্তর

আপডেট : ১১ মার্চ ২০১৪, ১৮:১১
সকাল থেকেই নিতুর প্রতিক্ষা, কখন হবে ঢাকা যাওয়ার সময়? বাবা আজিজ মিয়া কথা দিয়েছেন, আজ নিতুকে ঢাকা নিয়ে যাবে। সকালে উঠে বাপজান গেছে ধানক্ষেতে। প্রত্যেকদিন ক্ষেতে যায় বাপজান। আজকে একটা দিন না গেলে কী হতো? কে শোনে কার কথা? নিজের পাজামা জুতো আর ফ্রকটা ধুয়ে সকালেই রোদে দিয়েছে। শুকিয়ে গেছে কখন, অথচ দ্যাখো বাপজানের আসার কোনো নাম নেই। নিতু বাড়ি থেকে বের হয়ে সামনে যেতেই বাবাকে দেখতে পায়। নিতুকে দেখে আজিজ মিয়া হাসে— সহ্য হচ্ছে বুজি মাধনের? নিতু মিটি মিটি হাসে। আজিজ হাত ধরে— লও আর দেরী করবো না। এখনই রওয়ানা করবো। বাপের হাত ধরে নিতু নাচতে না্চতে বাড়ির ভেতরে ঢোকে। দ্রুত ঘরে ঢুকে জামা কাপড় উঠোনে দাঁড়ায় নিতু। আজিজ ঘরের ভেতরে জামা গায় দিচ্ছে। নিতুর মা আলেয়া বেগম পানের খিলি সামনে ধরে— কী দরকার আছে এক রত্তি মাইয়াডারে লইয়া যাওয়ার? মুখে পান চুিবতে চিবুতে জবাব দেয়— যাউক আমার লগে। থাকবে আমার ঘাড়ের উপর। কতোদিন ধইরা বায়না ধরছে— আইজ যদি সুযোগ অয়। আপনের যেমন কতা— আইজ কতো মানুষ অইবে জানেন? লাখে লাখে— হউক, আমার মাইয়া হেই লাখের একজন অইবে, দেখবে নেতারে। দেইখা ওর ছোট্ মনডা বড় অইবে— যাই। আজিজ ঘর থেকে নেমে দাঁড়ায়। দৌড়ে এসে হাত ধরে নিতু। দুজনে হাঁটতে শুরু করে। দরজায় দাঁড়িয়ে আলেয়া বেগম দেখছে আর হাসছে। মেয়েটা বাবাকে ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না। বাপজান? কী মা? যাইতে কতোক্ষণ লাগবে? মারে, ঢাকা শহরতো আমাগো এই আড়াইহাজার থানা দিয়া তেমন দূর না। কিন্তু রাস্তাঘাট ভালো না। বাস আসে এক ঘন্টা পর। বাস পাইলে এক ঘন্টা লাগবে। আমার লগে কতা কইবে তো? কেডা? শেখ মুজিব। আজিজ মিয়া হাসে— মারে আমি কেমনে কমু? শেখ মুজিবের তোমার আমার লগে কতা কওনের সমায় আছে? হেতো ব্যস্ত ইয়াহিয়া ভুট্টোর লগে টক্কর দিতে। দ্যাশ বিদ্যাশের কতো সাংবাদিক আহে হের কাছে— কতো কতা কইতে অয়। তয় সব কতা হে আমাগো লাইগাই কয়। দ্যাশের নেতা না! তোমারে চেনে? শ্যাক সাব এই বাঙলার সবাইরে চেনে। তোমার নাম জানে? একবার যে হের সামনে গেছে তারে বিশ বছরও দেইখা বলতে পারে— বাবা মেয়ে কথা বলতে বলতে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসে বাসস্ট্রাস্ট। কিছুক্ষণ দাঁড়াবার পর বাস আসে। কিন্তু বাসে তিল ধরনের ঠাঁই নেই। নিতু কাঁদতে শুরু করেছে। উপায় না পেয়ে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে বাসের ছাদে ওঠে আজিজ। বসে নিতুকে কোলে নিয়ে। হেলদে দুরতে বাস আবার ছুটছে। বিকেলে বাস গুলিস্থানে থামে। কিন্তু নেমেই অবাক আজিজ মিয়া। গুলিস্থানে মানুষ আর মানুষ। অনেকের হাতে বাঁশের লাঠি। সব মানুষ ছুটছে রেসকোর্স ময়দানের দিকে। জনতার সঙ্গে মেয়ের হাত ধলে হাঁটে আজিজ মিয়া। কিন্তু ময়দানের কিনারে এসে আর হাঁটতে পারে না। কারণ সামনে লাখো মানুষের বিশাল দেয়াল। বাপজান! মারে— আজিজ মিয়া শক্ত করে হাত ধরে নিতুর। শেখ মুজিব কই? ওইতো মঞ্চে উঠছে। হুনতোছোনা মানুষের শ্লোগান। নিতু লোকের ভিড়ে কিছুই দেখে না। কেবল শোনে শ্লোগান— নানা রকমের শ্লোগান। একটা শ্লোগান নিতু বুঝতে পারে— জয় বাংলা। এতো মানুষ কোত্থেকে এলো? সবাই কি ওর মতো শেখ মুজিবকে দেখতে এসেছে? বাজান? আমিতো কিছুই দেখতে পাই না। আজিজ মিয়া হঠাত্ নিতুকে উঠিয়ে ঘাড়ের উপর বসায়— এখন শেখ সাবরে দেকতে পাইতেছো? নিতু এদিক ওদিক মাথা ঘুরিয়ে তাকায়। চারদিকে মানুষ আর মানুষ। দূরে একটা মঞ্চের মতো জায়গায় কিছু মানুষ দেখতে পায় নিতু। একজন লম্বা মানুষ হাত নেড়ে নেড়ে মাইকে কথা বলছে। নিতু বুঝতে পারে— এই মানুষটাই শেখ মুজিব। কিন্তু এতো দূর থেকে মুখের আদল বুঝতে পারে না নিতু। বাপজান, দেখতেছিতো অনেক দূরে— নিতুর কণ্ঠে হতাশা। কী করমু মা, সামনেতো যাওন যায় না। তুমি এইখান দিয়াই দ্যাখো। বাবা মেয়ের কথার মধ্যে শেখ মুজিব ভাষণ শেষ করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে জমে থাকা মানুষগুলো নানা শ্লোগানে শ্লোগানে বিভক্ত হয়ে চলে যেতে থাকে মৌমাছির মতো। নিতু ও আজিজ মিয়াও চলে আসে। কিন্তু নিতুর মন খুব খারাপ। এতোদূর এসেও শেখ মুজিবকে সামনে থেকে দেখতে পায়নি। বাড়িতে পৌঁছাতে রাত। আলেয়া বেগম চিন্তিতমুখে দরজায় দাঁড়িয়ে হেরিকেন হাতে। মেয়ের মলিন মুখ দেখে ব্যাপারটা বুঝতে পেরে আর কিছু না বলে বাবা মেয়েকে খেতে দেয়। নিতু দু এক লোকমা খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে। সকালে উঠে নিতুকে বলে আজিজ, মা তুমি মন খারাপ কইরো না। দ্যাশ স্বাধীণ অইলে আমি একদিন তোমারে নেতার কাছে লাইয়া যামু। নিতু কিছু না বলে স্কুলে চলে যায়। ঘটনার এক মাসের মধ্যেই যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে গেছে ওরা। সারা দেশে পুড়ছে বারুদে, গুলিতে, আগুনে আর ওদের নির্মম আক্রমনে। আজিজ মিয়া যুদ্ধে চলে যায়। নিতুকে কোলে নিয়ে আলেয়া বেগম পালিয়ে বেড়ায়। রাজাকার আর পাকিস্তানি মিলিটারিরা বাড়িতে আগুন দিয়েছে। সব পুড়ে ছাই। কোনোভাবে বেঁচে আছে মা আর মেয়ে। নয়মাস জলে কাঁদায় করে কোনোভাবে বেঁচে আছে। দেশ স্বাধীন হয়েছে, সবার বাবার ফিরে এসেছে কিন্তু নিতুর বাবা আজিজ মিয়া আসেনি। পোড়া ভিটায় ছোট করে ঘর তোলে আলেয়া বেগম ভাইয়ের সাহায্য নিয়ে। নিতু আবার স্কুলে যায়। এক বছর, দু বছর, তিন বছর। চার বছর নিতু জানতে পারে— স্কুল থেকে অনেকের সঙ্গে সেও যাবে বঙ্গবন্ধুকে দেখতে, তাঁর জন্মদিনে। সকালে একটা বাসে নিতু অনেকের সঙ্গে পৌঁছে বত্রিশ নম্বর বাড়ির সামনে। দলে দলে এসেছে স্কুলের ছাত্ররা। ছোট্ট বাড়ির বাইরেও প্রচুর ছেলেমেয়ে। সবাই জটলা করছে। হঠাত্ ছেলেমেয়েদের মাঝে এসে দাঁড়ালেন বঙ্গবন্ধু। উন্নত শির, চওড়া কপাল, মুখে বাঁধ ভাঙা হাসি, তীক্ষ নাসিকা তাঁর। ছেলেমেয়েদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন—তোমারা কেমন আছো? আমরা ভালো আছি। শোনো, এই দেশ তোমাদের। তোমরা এই দেশটাকে ছবির মতো গড়ে তুলবে। মন দিয়ে লেখাপড়া করবে। আর বড়দের সন্মান করবে। মনে থাকবে আমার কথা? থাকবে— সবাই এক সঙ্গে উত্তর দেয়। কথা বলতে বলতে বঙ্গবন্ধু হাঁটতে থাকেন আর শিশুদের সঙ্গে হাত মেলান। মেলাতে মেলাতে নিতুর কাছেও আসেন। অবাক চোখে নিতু তাকিয়ে আছে। ভাবে— মানুষ এতো সুন্দর হয়? বঙ্গবন্ধু নিতুর মাথায় হাত রাখেন— কী নাম তোমার? নিতু। নিতু? খুব মিষ্টি নাম। তুমি কোন ক্লাসে পড়ো? ক্লাস ফাইভে। মন দিয়ে লেখাপড়া করবে কেমন? আদর করে গাল টিপে চলে যান বঙ্গবন্ধু। বিকেলের বাসে স্কুলের সবার সঙ্গে ফিরে আসে নিতু। কিন্তু নিতু অনুভব করে, ঢাকার বত্রিশ নম্বর বাড়ি থেকে সে একা ফিরে আসে নাই। ওর সঙ্গে আরও একজন এসেছেন, তিনি আজিজ মিয়ার রূপ ধরে শেখ মুজিবুর রহমান।