আইন বিষয়ে পড়ালেখার ্বইচ্ছা থাকে অনেকেরই। আইন বিষয়টি আসলে সব সময়ের জন্য, সব দেশের জন্যই সমানভাবে উপযোগী। আইন বিষয়ে পড়ালেখার বিভিন্ন দিক নিয়ে এই লেখাটি লিখেছেন সানজিদা সুলতানা
একজন নির্দোষ ব্যক্তি যখন ভুলক্রমে জেলে চলে যায় অপরাধের দায় মাথায় নিয়ে, তাকে জেলের শাস্তির হাত থেকে বাঁচিয়ে আনতে পারে একজনই। আর তিনি হলেন একজন আইনজীবী। মানুষের কাছে তিন পেশায় নিয়োজিত লোক নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত। এদের মধ্যে একজন হলেন ডাক্তার, একজন হলেন শিক্ষক এবং অপরজন হলেন আইনজীবী। অসুস্থ ব্যক্তিকে ডাক্তার সেবা দিয়ে, ঔষধ দিয়ে সুস্থ করে তোলেন। অন্যদিকে শিক্ষা দিয়ে শিক্ষক মানুষকে শিক্ষিত করে তোলেন, আলোকিত করে তোলেন। আর সঠিক আইনের প্রয়োগ করে একজন আইনজীবী মানুষকে ন্যায় বিচার এনে দেয়। সারাবিশ্বে আইনজীবীরা কোথাও স্বাধীনভাবে আবার কোথাও কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হয়ে আইন প্রতিষ্ঠায় এবং বিচার কার্যে অন্যতম ভূমিকা পালন করে চলেছেন।
একটি সমাজের প্রতিটি স্তরেই লিগ্যাল সিস্টেমের প্রভাব রয়েছে। আইনজীবীরা দেশের এই মূল ব্যবস্থায় মেরুদণ্ড হয়ে কাজ করেন। তারা অনেক বড় দায়িত্ব আর কর্তব্য পালন করে ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য।
আইনজীবীরা অ্যাডভোকেট এবং উপদেষ্টা—দুটো দায়িত্বই সমানভাবে পালন করেন। তাদের একজন অ্যাডভোকেট হয়ে ক্লায়েন্টের প্রতিনিধিত্ব করেন, যুক্তি-তর্ক আর প্রমাণ দিয়ে ক্লায়েন্টকে পুরোপুরি সহযোগিতা করেন। আবার অন্যজন উপদেষ্টা হয়ে ক্লায়েন্টকে তার সঠিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলেন।
তবে আইনজীবী যে দায়িত্বেই থাকুন না কেন, তাকে আইনের মধ্য দিয়েই চলতে হবে।
আরও বিস্তৃত করে বলতে চাইলে, একজন ল’ইয়ারের কাজের পরিধি অনেক বিস্তৃত। তার কাজ নির্ভর করে যেকোনো ব্যাপারে বিশেষজ্ঞতার ওপরে। একজন আইনজীবি কোর্টে ক্লায়েন্টের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত। তিনি প্রমাণ, যুক্তি এবং আইনের ধারা প্রদর্শন করে তার ক্লায়েন্টকে ন্যায় বিচার পাইয়ে দিতে সহায়তা করে থাকেন।
আইনজীবিরা বিভিন্ন ফিল্ডে কাজ করতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে ফিসক্যাল, ক্রিমিনাল, জেনারেল রিট ইত্যাদি। আইনজীবি হওয়ার পর কাজ করার জন্য এদের মধ্য থেকেই কোনো একটি ক্ষেত্রকে বেছে নিতে হয়।
আইনজীবীদের অনেকেই প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে পছন্দ করেন। তবে অনেকেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লিগ্যাল অফিসারের কাজ করে থাকেন।
তাছাড়া সরকারের বিভিন্ন স্তরে তাদের কাজ করার সুযোগ থাকে। দেশে বিসিএসের মাধ্যমে অনেকে ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে কাজ করছেন। পার্লামেন্ট চালানোর জন্য সরকারি স্তরের আইনজীবিরাও ভূমিকা রাখেন।
আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আইন বিভাগকে খুবই গুরুত্বের সাথে পরিচালনা করছে। প্রায় প্রতিটি পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েই আইন বিভাগ রয়েছে। তাছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত অনেকগুলো ইনস্টিটিউট আছে যারা শুধুমাত্র আইন বিষয়ই পড়িয়ে থাকে।
আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রির পড়ালেখা মূলত এইচএসসির পরেই শুরু করতে হয়। তবে অনেকেই অন্য কোনো বিষয়ে পড়ালেখা শেষ করেও এরপর আইন বিষয়ে ডিগ্রি নিয়ে থাকেন। তবে যে স্তর থেকেই আইন বিষয়ে পড়ালেখা করুক না কেন, তাদের কাজের ক্ষেত্রের অভাব নেই। আর এসব ক্ষেত্রের মধ্যেও রয়েছে বড় বড় সব প্রতিষ্ঠান এবং সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।
দেশের ৬০টি জেলায় ৬১টি ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট রয়েছে। তাছাড়া জজ কোর্ট, হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট আছে। এখানে কাজ করার সুযোগ অনেক। এ ছাড়াও বর্তমানে বিভিন্ন কর্পোরেট হাউজ মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি, সরকারি, আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বীমা, এনজিও তাদের লিগ্যাল সাপোর্টের জন্য লিগ্যাল অফিসার রাখছে। বর্তমানে অনেক খাতেই আইনজীবিরা ভূমিকা রাখছেন।
আইন বিষয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পড়ে আসলেই আইনজীবী হওয়া যায় না। এর জন্য প্রয়োজন ব্যক্তিগত দক্ষতার উন্নতি, ভালো ইংরেজি জানা, বুদ্ধির চর্চা, যুক্তি করার প্রবণতা এবং নৈতিকভাবে সঠিক অবস্থানে থাকার চেষ্টা।
আর কোর্টে কেস হ্যান্ডেল করতে চাইলে জানতে হবে কিন্তু বেসিক জিনিস। সেগুলো হলো—হিয়ারিং শোনা, প্রসিডিং দেখা, কোর্ট অবজার্ভ করা, জজের জিজ্ঞাসাগুলো বুঝা, উকিলদের সাবমিশন দেখা, জাজমেন্ট দেখা, বিদেশি কেস স্পর্কে পড়ালেখা করা প্রভৃতি।
বিশ্বব্যাপী এ পড়াকে রিকগনাইজ করতে লিংকনস ইন থেকে উচ্চশিক্ষা নিতে হয়। তাছাড়া উচ্চশিক্ষার জন্য ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং আমেরিকায় বেশ কয়েকটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। যেখানে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এ পেশার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যাপক পড়ালেখা করা। যার যত অভিজ্ঞতাই হোক আর বয়স বাড়ুক, প্রতিনিয়ত পড়ার কোনো বিকল্প নেই।
একটা দেশে যত বিপর্যয়ই আসুক না কেন, সে দেশে আইন বলবত্ থাকবে। কোর্ট চলবে, ন্যায় বিচার হবে। তাই আইনজীবীরা সবসময় তাদের কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন। সব দেশে সব জায়গায় এ পেশা সমানতালে উন্নতি করছে। ক্যারিয়ার হিসেবে এ পেশাকে বেছে নিতে পারেন যে কেউ। একটা দেশে আইন প্রণয়ন করে যেমন আইনজীবী, তেমনি আদালতও চালান তারাই। বিচার যেমন করেন আইনজীবি, আবার মানুষকে ন্যায় বিচারও এনে দেন তিনি। তাই এ পেশার গুরুত্ব এবং সম্ভাবনার জায়গা অনেক বড়।
