সূফি শব্দটি ‘সাফা’ শব্দ হতে উদ্ভুত। যার অর্থ পবিত্রতা। যারা কলুষতা ও অপবিত্রতা হতে শুদ্ধ হয়ে ক্বলব আলোকিত করেছেন বা আত্মিক পবিত্রতা অর্জন করেছেন, তাঁরাই সূফি। যে মতবাদ বা বিজ্ঞান চর্চা করলে আত্মশুদ্ধি অর্জন করা যায় এবং আল্লাহর দর্শন দুনিয়ার জমিনে লাভ করা যায় তাকে সূফিবাদ বলে। মুহাম্মদুর রসুলুল্লাহ (স.) মসজিদে নববীর বারান্দায় একদল সাহাবিকে ধ্যান-মোরাকাবা ও তাসাওফের শিক্ষা দিতেন। তাঁদেরকে ‘আসহাবে সুফ্ফা’ বা বারান্দার অধিবাসী বলা হতো। আসহাবে সুফফাদের সেই মেঝেতে বসে হজ ও ওমরায় আসা নবীজির কাশফধারী উম্মত তথা সূফিসাধকগণ মোরাকাবায় আল্লাহপাক ও দয়াল নবীজির দিদার লাভ করে ধন্য হয়ে থাকেন। মোরাকাবা অর্থ ধ্যান, গভীর চিন্তা। জগতের সকল ধর্মের নিগুঢ় ব্যবস্থাপত্র হচ্ছে মোরাকাবা। হযরত মুহাম্মদ (স.) ১৫ বছর হেরা পর্বতের গুহায় মোরাকাবা করেছেন। হেরা গুহায় উঠতে ও ফিরে আসতে সময় লাগে প্রায় ৪ ঘন্টা। অনেক কষ্টে পায়ে হেঁটে হেরাগুহায় উঠতে হয়। তবুও নবীজি নিয়মিত ঐ গুহায় গিয়ে যে আমলটি করেছেন তা হলো মোরাকাবা। আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর শর্ত হল, আত্মিক পরিশুদ্ধতা অর্জন। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে “সেই সফলকাম, যে পবিত্রতা অর্জন করে ও তাঁর প্রভুর নামে যিকির করে এবং সালাত আদায় করে” (সূরা আল আলা : ১৪, ১৫)। তাইতো নবীজি (স.) হেরাগুহায় ধ্যান-সাধনা করে আপন হূদয়কে আলোকিত করেছেন। তিনি কালবের সর্বোচ্চ মাকামে আল্লাহর দর্শন লাভ করেন। রসূল (স.) ফরমান, “আমার প্রভুকে আমি অতি উত্তম সুরতে দেখেছি” (তাফসীরে রুহল বয়ান)। বিশ্বনবী (স.) ‘সিদরাতুল মুনতাহার সন্নিকটে আল্লাহ পাকের দর্শন লাভ করেছিলেন’ (তিরমিজী)। নবীজি (স.) তাঁর উম্মতকে লক্ষ করে ফরমান, “শীঘ্রই তোমরা তোমাদের প্রভুকে পূর্ণিমার চাঁদের মত উজ্জলতর দেখতে পাবে” (বোখারী ১১০৫, তিরমিযী-৮২)। আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর নিকট প্রথম ওহী নাজিল হওয়ার পর তিনি সাহাবাদের ১২ বছর পর্যন্ত মোরাকাবার শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। প্রথমে তাদেরকে এ শিক্ষা দিয়ে অন্তর আলোকিত করার পদ্ধতি শিখিয়েছেন। সে আলোকিত অন্তরে সাহাবাগণও আল্লাহ পাকের দিদার লাভ করে ধন্য হয়েছেন। হযরত আলী (রা.) বলেছেন, “আমি এমন মাওলার ইবাদত করি না, যাকে আমি দেখি না।” হযরত ওমর (রা.) বলেছেন, “আল্লাহর নুর দ্বারা আমার হূদয় আল্লাহর দর্শন লাভ করেছে।” (সিররুল আসরার, পৃষ্ঠা: ৯৮)। সাহাবায়ে কেরামগণ প্রথমে মোরাকাবা করেছেন। পরে আল্লাহর পক্ষ থেকে পর্যায়ক্রমে নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত ইত্যাদি ইবাদত নির্দেশিত হয়েছে। তবে আজ আমাদেরকে সবগুলো একই সঙ্গে আমল করতে হবে। সবচেয়ে উত্তম নেয়ামত হচ্ছে নামাজ। নামাজ পড়লে দিল নরম হয়। নামাজে মু’মেন বান্দা আল্লাহর দর্শন পেয়ে থাকেন। এমন অবস্থায় মহান আল্লাহ মু’মিনের অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেন। মোরাকাবার শিক্ষার বিষয়টি শরিয়তের আলেমদের মধ্যে দেখা যায় না। বিশ্বের কোন স্কুল, মাদ্রাসা, মক্তব কিংবা মসজিদে মোরাকাবার চর্চা নেই। তাহলে কী করে আমরা রসূল (স.)-কে পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ করলাম? আমরা তাঁর উত্কৃষ্ট সাধনার পদ্ধতিটি পরিহার করে বসে আছি। এই শিক্ষা কেবল খাঁটি মোর্শেদ বা আউলিয়ায়ে কেরামগণের দরবারে প্রচলিত আছে। নবীজি সাহাবাদেরকে ৪টি বিদ্যা শিক্ষা দিতেন- শরিয়ত, তরিকত, হাকিকত ও মারেফাত। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন, “শরিয়তের এলেম জাহেরকে দুরস্ত করে, আর মারেফাতের এলেম ভেতরকে পবিত্র করে।” তরিকতে মোরাকাবা ছাড়া সাধনার স্তর অতিক্রম করার কোন বিধান নেই। মোরাকাবা হল নফল ইবাদত। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, “আমার বান্দা নফল ইবাদত দ্বারা আমার এত নিকটবর্তী হয়ে যায় যে, আমি তাকে ভালোবাসতে বাসতে তার কর্ণ হয়ে যাই, যা দ্বারা সে শুনে, আমি তার হাত হয়ে যাই, যা দ্বারা সে ধরে। আমি তার চোখ হয়ে যাই, যা দ্বারা সে দেখে। আমি তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে হাটে। আর সে যদি আমার নিকট কিছু চায় আমি তাকে অবশ্যই দেই” (বুখারি : ৬০৫৮)। আল্লাহ মানুষের ভেতরে বাস করেন। আল্লাহ বলেন, “আমি (আল্লাহ) তোমাদের দিলে অবস্থান করি, তোমরা কি দেখ না?” (সূরা আযযারিয়াত : ২১)। আরও বলেন, “তুমি যেখানে আমি মাওলা সেখানে।” অন্যত্র বলেন, “আমি তোমার ঘাড়ের রগের চেয়েও অতি নিকটে” (সূরা কাফ : ১৬)।
