খুররমের অবিশ্বাস্য যাত্রা

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০১৪, ২২:২৭
৮৮, ৮৮, ৭৮, ১৩৮, ৮৫, ৪৯, ৩৪, ৪৪—এগুলো একজন ব্যাটসম্যানের সর্বশেষ আটটি ইনিংসের স্কোর। বলুন তো তিনি কে? কুমার সাঙ্গাকারা, ডি ভিলিয়ার্স, ডেভিড ওয়ার্নার নন; এই ব্যাটসম্যানের নাম খুররম খান! হ্যা, বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, এখন অ্যাসোসিয়েট পর্যায়ে এরকম অবিশ্বাস্য ফর্মেই আছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই অধিনায়ক। তবে ‘অ্যাসোসিয়েট’ পর্যায়ের রান বলে এগুলোকে খাটো করে দেখার চেষ্টা করবেন না। রানগুলো তিনি করেছেন কেনিয়া, স্কটল্যান্ড, কানাডা, নেদারল্যান্ডসের মতো ক্রিকেটের পুরোনো সব দেশের বিপক্ষে। আর সর্বশেষ স্কোরটা তো বাংলাদেশেরই বিপক্ষে। আমিরাত অধিনায়ক খুররম নিজে অবশ্য নিজের এই ফর্ম নিয়ে খুব উচ্ছ্বাস দেখানোর পক্ষে নন। তিনি বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচশেষে বরং দলকে নিয়েই বেশী ভালো কথা বলতে আগ্রহ দেখালেন, ‘আমরা সবাই ভালো খেলার চেষ্টা করছি। এটা আমাদের জন্য একটা শেখার পর্ব। এই পর্বে সবাই চেষ্টা করছে সেরাটা খেলার। আমিও চেষ্টা করছি।’ খুররমের এই চেষ্টাটা অবশ্য আজকের নয়। প্রায় ১৫ বছর ধরে ক্রিকেট খেলছেন এই পাকিস্তানী বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়। বয়সের হিসেবে এখন হয়তো বিশ্বের সবচেয়ে সিনিয়র ক্রিকেটারদের একজন তিনি—৪৩ স্পর্শ করবেন আর কয়েক মাস পরই। আরব আমিরাতের কোচ আকিব জাভেদ প্রায়ই বলেন, দেশে থাকলে খুররম পাকিস্তানের হয়ে খেলতে পারতেন। ছোটবেলায় স্বপ্নটাও ছিল তাই। মুলতানে বড় হয়ে উঠছিলেন পাকিস্তানী তারকাদের দেখে দেখে। কিন্তু নানা কারণেই পেশাদার ক্রিকেটার হওয়া হয়নি। বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে দুবাইতে চলে গেলেন ভাইয়ের কাছে; চাকরির সন্ধানে। ভালো একটা চাকরিও পেয়ে গেলেন। বিশ্বের অন্যতম নামকরা এয়ারলাইন্স এমিরেটসে চাকরি পেয়ে গেলেন। ভাগ্যের কী খেলা। কিছুদিন পর স্থানীয় এক ক্লাবের হয়ে খেলার সুযোগ পেয়ে গেলেন। আর বিস্ময়করভাবে প্রথম ম্যাচেই সেঞ্চুরি আর ২ উইকেট! এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি খুররমকে। জাতীয় দলে ডাক পেয়ে গেলেন দ্রুতই এবং ক্যারিয়ারের মাত্র দ্বিতীয় ম্যাচ খেলতে নামলেন অধিনায়ক হিসেবেই। নিজেই বিশ্বাস করেন, অধিনায়কত্ব তার সেরা খেলাটা বের করে। বেশ আগে একটা সাক্ষাত্কারে বলছিলেন, ‘অধিনায়কত্ব আমি খুব উপভোগ করি। শুধু তাই না, অধিনায়কত্ব করা অবস্থাতেই আমি আমার সেরা খেলাটা খেলতে পারি বলে মনে হয়।’ নিজের প্রথম টুর্নামেন্ট, সেই ২০০১ সালের আইসিসি ট্রফিতেই নজর কেড়েছিলেন খুররম। ইনজামাম-উল হকের শহর মুলতানে জন্ম। সে বছর আইসিসি ট্রফির বাছাই একাদশেই ডাক পেয়েছিলেন। ১০ ম্যাচে ৬০.৭৫ গড়ে ২৪৩ রান করেছিলেন এবং ১৯টি উইকেটও নিয়েছিলেন। আরব আমিরাত সেই ১৯৯৬ সালের পর থেকে আইসিসির সর্বোচ্চ পর্যায়ে আর খুব বেশী খেলার সুযোগ পায়নি। ফলে খুররমও তরুণ বয়সে দেখানো সেই প্রতিভার বহিঃপ্রকাশটা সর্বোচ্চ পর্যায়ে খুব একটা করতে পারেননি। সাকল্যে এ পর্যন্ত ৫টি মাত্র ওয়ানডে খেলেছেন; তাতে একটি ফিফটিসহ ১২৭ রান করেছেন এবং উইকেট নিয়েছেন ৮টি। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, ক্যারিয়ারের একমাত্র সেই ফিফটিটি করেছিলেন বাংলাদেশের বিপক্ষেই। বাংলাদেশের বিশাল রান পাড়ি দিতে গিয়ে খেলেছিলেন ৭৭ রানের ইনিংস। এই রান, এইসব ফিফটি, কোনো কিছুই সহজে আসে না; খুররমের ক্ষেত্রে তো নয়ই। আমিরাতের আর সব খেলোয়াড়ের মতো তাকেও চাকরির পাশাপাশি সপ্তাহে তিন দিন অনুশীলন করে ক্রিকেট ধরে রাখতে হয়। কিন্তু খুররমের ক্ষেত্রে সমস্যা হল, নির্দিষ্ট দিনগুলোতে দুবাই থাকবেন, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। হয়তো ফ্লাইটের সঙ্গে চলে গেলেন দুনিয়ার অন্য কোনো প্রান্তে। তাতেও দমেন না খুররম। ব্যাগে কিছু অনুশীলনের সরঞ্জাম রেখে দেন। নিজেই বলেন, ‘সুযোগ পেলেই দু-চারটে পুশ আপ করে নেই। সূচী মিলিয়ে কাজ শেষ করে আবার কয়েক ঘণ্টা উড়ে গিয়ে অনুশীলন করার কষ্ট কী, তা আমরাই জানি।’ এই কষ্ট করেই রান মেশিনটা ধরে রেখেছেন খুররম। বয়স হয়েছে। নিজেই বোঝেন, কার্যতঃ গত কয়েক বছর ধরেই বলেন, আর খুব বেশীদিন ক্রিকেট হয়তো খেলতে পারবেন না। তারপরও খুররম ভরসা হয়ে থাকেন আরব আমিরাতের। কে জানে, বয়স ব্যাপারটাই হয়তো বোলারদের মতো মাথা নিচু করে ফেলেছে খুররমের এই পরিশ্রমের সামনে।