কৃত্রিম হাঁটু প্রতিস্থাপন

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০১৪, ১৯:৪৩
মানুষের শরীরের প্রতিটি হাড়ের রয়েছে কাজের ভিন্নতা ও প্রয়োজন আছে। ফলে যে কোন একটি হাড়ের সমস্যায় ব্যহত হবে আপনার স্বাভাবিক জীবন। সেই সঙ্গে বিপর্যস্ত করবে আপনার মানসিকতাও। তবে বর্তমানে চিকিত্সা জ্ঞান ও প্রযুক্তির বদৌলতে এ ধারাতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। হাড়ের বিষয়ে যে চিকিত্সা পদ্ধতি ছিল কল্পনাতীত তা এখন বাস্তবে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উন্নত চিকিত্সাসেবা শুরু হয়েছে আমাদের দেশেও। যার ধারাবাহিকতায় কোমর, হাঁটু, কনুই ও কাঁধের হাড়ের সফল প্রতিস্থাপন এখন দেশেই সম্ভব। হাড়ের জয়েন্ট প্রতিস্থাপন কী শরীরের অকেজো বা প্রায় অকেজো হাড় শল্য চিকিত্সার (অপারেশন) মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে সংযুক্ত বা পরিবর্তন করে দেওয়াকে হাড়ের জয়েন্ট প্রতিস্থাপন বা রিপ্লেসমেন্ট বলে। হাড়ের প্রতিস্থাপনের প্রকারভেদ ১. আংশিক জয়েন্ট প্রতিস্থাপন ২. সম্পূর্ণ জয়েন্ট প্রতিস্থাপন উন্নত বিশ্বে শরীরের প্রায় সকল ধরণের জয়েন্ট প্রতিস্থাপন সম্ভব হলেও আমাদের দেশে এখন কোমার, হাঁটু, কনুই ও কাঁধের প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। যাদের জন্য এই চিকিত্সা স্বাভাবিক জীবন বা চলাফেরার জন্য সুস্থ স্বাভাবিক হাড়ের বিকল্প নেই। তাই হাড় জনিত সমস্যা হলে যত দ্রুত সম্ভব বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। অন্যদিকে অনেকে এ সমস্যায় বয়স্ক রোগীদের অপারেশনকে ঝামেলা বা ঝুঁকিপূর্ণ ভেবে চিকিত্সা নিতে অনাগ্রহী থাকেন। তবে দীর্ঘদিন বিছানায় একইভাবে শুয়ে থাকলে অন্যান্য রোগ যেমন বেড সোর, ফুসফুসের সমস্যা দেখা দিতে পারে। পরবর্তীতে এ ধরণের রোগীকে চিকিত্সা সেবা দেওয়া খুবই কঠিন ও সময় সাপেক্ষ হয়ে পড়ে। আবার কর্মব্যস্ত জীবনে তাদেরকে দীর্ঘ সময় ধরে চিকিত্সা দেয়াও পরিবারের পক্ষে কঠিন হয়ে ওঠে। চিকিত্সার ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক যে কোন মানুষের হাড়ের জয়েন্ট প্রতিস্থাপন করা যায়। ফলে এ ধরণের চিকিত্সাকে ঝুঁকিপূর্ণ না ভেবে সময়মতো চিকিত্সা সেবা নেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। যে কারণে হাড়ের জয়েন্ট প্রতিস্থাপন করা হয় অজানা কারণে রক্ত সঞ্চালন কম বা বন্ধ হয়ে জয়েন্ট নষ্ট হওয়া আঘাতজনিত কারণে জয়েন্ট অকেজো হওয়া রিউমাটয়েড আর্থাইটিসজনিত হিপের সমস্যা মেরুদন্ডের হাড়গুলো একীভূত হয়ে কোমরের সমস্যা হাড়ের জয়েন্টের যক্ষ্মা (টিবি) থেকে সমস্যা অস্টিও আথ্রাইটিস আঘাতজনিত কারণে হাঁটু নষ্ট হলে অপারেশনের পূর্বে করণীয় বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী অপারেশনের উপযোগিতা যাচাই করা। অজ্ঞান বা অবশ করার জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা। রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করা। শরীরের কোথাও কোন সংক্রমণ থাকলে প্রতিকার করা। মানসিকভাবে অপারেশনের প্রস্তুতি নেওয়া। অপারেশনের পরে করণীয় ব্যথা সহনীয় হলে রোগী দাঁড়াবে বা ওয়াকার দিয়ে হাঁটার চেষ্টা করা। টয়লেটে কমোড ব্যবহার করা। নিয়মিত ব্যায়াম করা। তবে এক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপিস্ট এর সহযোগিতা নেওয়া উচিত। কতদিন হাসপাতালে সাধারণত: রোগীর অবস্থার উপর নির্ভর করে ৫ থেকে ৭ দিন হাসপাতালে থাকতে হয়। অপারেশনের পরের ফলোআপ অপারেশন থেকে ২ সপ্তাহ পর একবার (সেলাই কাটার জন্য)। পরবর্তী সময়ে প্রতি ৩ সপ্তাহ পরপর প্রথম তিন মাস। প্রতি ৬ সপ্তাহ পরপর ৬ মাস। প্রতি ১২ সপ্তাহ পরপর ১২ মাস। একবার অপারেশন করলে কতদিন চলবে নির্ভরযোগ্য বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের মাধ্যমে মানসম্পন্ন কৃত্রিম হাড়ের সংযোজন করা হলে ২০ থেকে ২৫ বছর ভাল থাকা যায়। হাঁটুর সমস্যা ও কৃত্রিম হাঁটু প্রতিস্থাপন হাঁটুর সংযোগ স্থলে সমস্যা হলে হাঁটা-চলা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। হাঁটুর সমস্যা নিয়ে অস্বাভাবিক ভাবে হাঁটতে গেলে পায়ের অন্যান্য হাড়ের সমস্যা দেখা দেয়। বয়স বাড়ার সাথে শরীরের হাড়ের ক্ষয় একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বয়স ও ওজন বেশি হলে এই সমস্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলে। বিশ্বায়নের এই যুগে মানুষের গড় আয়ু যেমন বাড়ছে তেমনি বাড়ছে ওজন বৃদ্ধিসহ হাঁটুর নানা সমস্যা। ওজন কমানোর জন্য উপদেশ দেওয়া হয় নিয়মিত হাঁটার, কিন্তু হাঁটুর ব্যথা থাকলে তা করা সম্ভব নয়। ঠিকমত ওঠা ও বসা করতে না পারার কারণে নামাজ এবং প্রার্থনা করা কষ্টকর হয়ে পড়ে। প্রায় ৭০ থেকে ৮০ ভাগ মানুষ জীবনের শেষার্ধে হাঁটু সমস্যায় ভূক্তভোগী। নানা চিকিত্সা সেবায় যখন হাঁটুর অস্টিও আর্থ্রাইটিস নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। সে ক্ষেত্রে উপায় হলো কৃত্রিমভাবে হাঁটুর প্রতিস্থাপন করা। উন্নত দেশে হাঁটু প্রতিস্থাপন ৬০ থেকে ৭০ এর দশক থেকে চালু হলেও আমাদের দেশে এই অপারেশনের দক্ষতা এখনও অঙ্কুরেই রয়ে গেছে। স্বল্প পরিসরে হলেও হাঁটু প্রতিস্থাপন এখন বাংলাদেশেই হচ্ছে। এই আধুনিক চিকিত্সার মাধ্যমে অপারেশনের পরের দিন থেকেই রোগীরা হাঁটতে পারে। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে সপ্তাহ খানেক সময় লাগে। যাদের জন্য অপারেশন অস্টিও আর্থ্রাইটিস (শেষ পর্যায়) রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস আঘাতজনিত জটিলতা।  অধ্যাপক (ডা:) এম. আমজাদ হোসেন চিফ কনসালটেন্ট অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগ ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল, ঢাকা