মাঝে কিছুদিন মুখ থেকে এই হাসিটা যেন হারিয়ে গিয়েছিল। গতকাল সংবাদ সম্মেলনের জন্য চেয়ারে এসে বসেই ঝরঝরে চেহারায় চিরচেনা সেই হাসিটা উপহার দিলেন মুশফিকুর রহিম। একটার পর একটা প্রশ্নে হেসে জবাব দিলেন, ইতিবাচক সব কথা শোনালেন। কিন্তু যেই এই প্রশ্নটা উঠল, মুশফিক যেন শিউরে উঠলেন। প্রাণপণে মাথা নেড়ে, মুখে ‘না, না’ বলে বোঝাতে চাইলেন—আফগানিস্তানের সঙ্গে ম্যাচটাই শেষ সুযোগ বলে ভাবছেন না।
শুধু মুশফিক নন, এর আগে প্রায় একই ভঙ্গি করে গেলেন আফগানিস্তান অধিনায়ক মোহাম্মদ নবী। তিনিও নানাভাবে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চাইলেন, উদ্বোধনী ম্যাচকেই ‘ফাইনাল’ ভাবছেন না তারা।
কিন্তু অধিনায়করা মুখে যাই বলুন, বাস্তবতা হল, ‘টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ’ ডাক নামের ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টির চতুর্থ আসরে আজ উদ্বোধনী ম্যাচেই কার্যতঃ ‘ফাইনাল’ খেলতে নামবে বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান। কারণ সোজা—এই ম্যাচে হারার অর্থ হল, সুপার টেন খেলার সম্ভাবনা প্রায় শেষ হয়ে যাওয়া।
বলাই বাহুল্য, এই চাপটা বাংলাদেশের ওপরই বেশী। আইসিসির প্রতিনিয়ত বদলাতে থাকা আইনকানুনের মারপ্যাঁচে পড়ে এবার বাংলাদেশকে প্রথমপর্ব নামের বাস্তবিক এই বাছাইপর্ব খেলতে হবে বড়দলগুলোর সঙ্গে মূলপর্ব খেলতে হলে। বাছাইপর্বের দুই গ্রুপে চারটি করে দল; সেখান থেকে একটি করে দল যোগ দেবে ‘সুপার টেন’ নামের মূলপর্বে। কাগজ কলমের হিসাব বলে, গ্রুপের বাকী তিন পিছিয়ে থাকা প্রতিপক্ষকে পার করে বাংলাদেশেরই যাওয়া উচিত মূলপর্বে। কিন্তু সমস্যাটা তৈরী করে ফেলেছে আফগানিস্তান।
আফগানিস্তান ক্রিকেটে নবীন দল, উঠতি শক্তি। কিন্তু এরই মধ্যে তারা বেশ বুঝিয়ে দিয়েছে, বাগে পেলে বড় দলকে কামড় দিতে জুড়ি নেই তাদের। ইতিমধ্যে বাংলাদেশকে এশিয়া কাপে হারিয়ে ‘দৈত্যবধ’-এর নজিরও তৈরী করে ফেলেছে আফগানরা। সে তো গেল ওয়ানডের কথা। টি-টোয়েন্টিতে আফগানিস্তান আগে থেকেই বেশ দাপট দেখিয়ে আসছে।
সোজাসাপটা পরিসংখ্যান দেখলে আফগানিস্তানকে রীতিমতো ভয়ঙ্কর দল বলে মনে হবে—২২টি টি-টোয়েন্টিতে এ পর্যন্ত তারা ১১টি জয় পেয়েছে; মানে অর্ধেক ম্যাচই জিতেছে তারা। অবশ্য সান্ত্বনা হল, এই জয়গুলো সবই ‘ছোট দল’-এর বিপক্ষে। তবে এসব পরিসংখ্যান ভুলে গিয়ে শারজায় পাকিস্তানের বিপক্ষে সর্বশেষ যে ম্যাচটা খেলেছে তারা, সেটা দেখলেও ভয় পেতে পারেন। পাকিস্তানকে একেবারে হারের মুখে ঠেলে দিয়েছিল আফগানিস্তানের দুর্দান্ত ফিল্ডিং ও বোলিং। শেষ পর্যন্ত শেষ ওভারের পঞ্চম বলে গিয়ে জয় পেয়েছিল পাকিস্তান।
এ হেন আফগানিস্তান ওয়ানডের চেয়েও টি-টোয়েন্টিতে যে বেশী বিপজ্জনক সেটা মুশফিকুর রহিমও মেনে নিলেন।
তবে মুশফিক যেটা মানলেন না তা হল, আফগানিস্তানই চূড়ান্ত পরীক্ষা নয়। তিনি বলছেন, ‘এখন যেহেতু সামনে আফগানিস্তান, তাই আমরা ওদের নিয়েই ভাবছি। তবে এমন না যে, এই ম্যাচ জিতে গেলেই কাজ শেষ। বাকী দুটো দলও বিপজ্জনক হতে পারে। এই ফরম্যাটে আসলে যে কোনো দলই বিপজ্জনক।’
এটা আপ্তবাক্য।
এই ধরনের কথা ভুলে গেলে শুধু সমীকরণই বলে যে, সুপার টেনে উঠতে গেলে এই ম্যাচ বাংলাদেশকে জিততেই হবে। কারণ দুর্ঘটনাচক্রে আজ হেরে গেলে পরের দুটো ম্যাচ জিতলেও বাংলাদেশকে অপেক্ষা করতে হবে তখন আফগানিস্তানের একটি হার এবং রানরেটের হিসাবের জন্য; মানে নানারকম ভাগ্যসহায়তা ছাড়া আর উপায় থাকবে না তখন।
তবে মুশফিকের কথায় আস্থা রাখলে মানতে হবে যে, বাংলাদেশ এসব ভাগ্য নিয়ে ভাবার জায়গায় অন্তত নেই। মুশফিক যথার্থই বলেছেন যে, ক্রিকেট স্কিলে এবং অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশ আফগানিস্তানের চেয়ে ঢের এগিয়ে আছে। সেই সঙ্গে ইনজুরির ছায়া দলের ওপর থেকে সরে গেছে। অধিনায়ক নিজে কিপিং করার মতো সুস্থ হয়ে গেছেন, তামিম-মাশরাফি ফিরেছেন, সাকিবকে আর অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু সামলাতে হচ্ছে না। মানে ঠিক যেমন সুস্থ ও তরতাজা দল বাংলাদেশ আশা করতে পারে, সেটাই মাঠে পাবে আজকে।
এখন শুধু অপেক্ষা নিজেদের সেরা খেলাটা খেলার।
মুশফিক কাল একটা কথা বারবার বললেন, টি-টোয়েন্টিতে যে কোনো এক দলের দুই-এক জন খেলোয়াড়ই খেলার ফল বদলে দিতে পারেন। আমরা নিশ্চয়ই অপেক্ষা করবো বাংলাদেশের সেই দুই-এক জন খেলোয়াড়ের বদলে দেয়া খেলা দেখার জন্য।
