ভিন্ন দুই দেশের দুই নারীকে নিয়ে সুতায় সুতায় হ্যানা ও শাপলা

আপডেট : ২২ মে ২০১৯, ২০:০২

মা হ বু ব  আ ল ম

 

দুই ভিন্ন দেশে দুই নারী বেড়ে ওঠে তাদের নানা দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা নিয়ে। আবহাওয়া, পরিবেশ, পরিস্থিতি বদলে দেয় মনন ও মানসিকতা। তাদের ভালো লাগা, মন্দ লাগার অনুভূতিগুলো হয়তো ভিন্ন হয় কিন্তু অনুভূতির নাম তো বদলে যায় না। কষ্টগুলো দেখতে ঠিক কষ্টের মতোই, আনন্দগুলোও তাই! ভিন্ন দুই দেশের দুই নারীকে নিয়ে আনিকা মাহিন একার নতুন নাটক ‘সুতায় সুতায় হ্যানা ও শাপলা’ মঞ্চে এনেছে বাংলাদেশের প্রথম সারির নাট্যদল থিয়েটার আর্ট ইউনিট। আর নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন রোকেয়া রফিক বেবী।

হ্যানার বেড়ে ওঠা সুইডেনের প্রাকৃতিক পরিবেশে। সেখানকার পাহাড়-পর্বত আর প্রজাপতির সঙ্গে খেলা করে বড় হয়েছে সে। আর অন্যদিকে বাংলার মাটি-জল স্পর্শ করে করে বড় হয়েছে শাপলা। পোশাক আর চালচলনে আলাদা হয়ে যায় দুটো চরিত্র। পোশাক পরিকল্পক বেশ সচেতনভাবেই সেই কাজটি করেছেন বলে মনে হয়েছে। যা হোক, দুজনের জীবনধারা দুটি ভিন্ন প্রবাহে প্রবাহিত হলেও তাদের মধ্যে যে একটি মাত্র মিল লক্ষ করা যায়, তা হলো দুজনই তাদের মায়ের কাছ থেকে পেয়েছে সুতা আর সুঁই। হ্যানা সুঁইয়ের ফোঁড়ে তুলে আনে তার পরিবেশের ছবি আর শাপলা তুলে আনা সোদামাটি মাখা মানুষের গল্প। সেই গল্পগুলো একসময় মলিন হয়ে আসে তাদের পরিণত বয়সে। হ্যানার বিয়ের কথাবার্তা চলতে থাকলে একদিন তার হবু বর তাকে সেলাইয়ের কাজ করা থেকে বিরত থাকতে বলে, কিন্তু হ্যানা তা মেনে নিতে পারে না। মায়ের কাছ থেকে পাওয়া এই শিল্পকর্মকে সে আঁকড়ে ধরে থাকতে চায়। অপর দিকে শাপলার বাবা মারা গেলে সে জীবনের তাগিদে চলে আসে শহরে। শুরু হয় তার শহুরে জীবন। যে জীবনের কষ্টের জাল তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখে গার্মেন্টসের চার দেয়ালের মাঝে। জীবনযাত্রার একপর্যায়ে শাপলা প্রেমিকের দ্বারা সন্তানসম্ভবা হলে তার যেন আর কোনো পথ থাকে না। সে কী করবে ভেবে পায় না। এমনি করে দিন যেতে থাকলে সৃষ্টিকর্তা পরিহাসের হাসি হাসে— গার্মেন্টসে আগুন লেগে পুড়ে মরে শাপলা। থেমে যায় জীবনের গতি, হারিয়ে যায় সুতায় সুতায় আঁকতে থাকা জীবনের গল্প।

দুই দেশের দুই নারীর জীবনের গল্পকে বেশ পরিপাটিভাবেই মঞ্চে তুলে এনেছেন নির্দেশক রোকেয়া রফিক বেবী। নাট্যকার আনিকা মাহিন একা খুব করে চেষ্টা করেছেন গল্পটিকে হূদয়গ্রাহী করে তোলার। কিন্তু দুটি গল্প যখন এক সুতায় মিলিয়ে ফেলার চেষ্টা চলছিল, সেই চেষ্টা বেশ ভালো লাগছিল, কিন্তু হঠাত্ করেই কোথায় যেন খেই হারিয়ে গেছে। বিশেষত শাপলার পরিণতি কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়।

সম্প্রতি সুইডেনে থিয়েটার আর্ট ইউনিটের এই নাটকটি মঞ্চস্থ হলো। শাপলার পরিণতি স্বাভাবিক মনে না হওয়ার কারণ এবার ব্যাখা করা যাক—বিদেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাওয়া একটি নাটকের একজন নারীর জীবনের পরিণতি যদি হয় শেষমেশ আগুনে পুড়ে মরা হয় তাহলে বোধহয় দেশের ভাবমূর্তি খুব যে উজ্জ্বল হয়, তা মনে হয় না। তবে এই পরিণতির হয় তো বিশেষ কোনো কারণ থাকতেও পারে, তার ব্যাখ্যা নিশ্চয় নাট্যকার নির্দেশকের কাছে আছে।

পরিশেষে নাটকের গুণগান না করে পারা যায় না। কেননা, নাটকের গানগুলো মনের ভেতরে এতই চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে যে, অন্য সবকিছুকে ছাপিয়ে যায় সেলিম মাহবুবের সুর ও সংগীত আর সেই সঙ্গে তাঁর দোহারদের ধুয়া ধরা। গানের সঙ্গে মেহমুদ সিদ্দিকি লেলিন ও সংগীতা চৌধুরীর কোরিওগ্রাফি খুবই চমত্কার হয়েছে। নাসিরুল হক খোকনের লাইটের খেলা বেশ উপভোগ্য ছিল, বিশেষ করে দুই দেশের দুই আকাশ আলাদা করে ফেলা ছিল খুবই চমত্কার। আর বিশেষ করে দর্শকের মনে গেঁথে থাকবে হ্যানা ও শাপলা চরিত্রে সংগীতা চৌধুরী ও মিতালী দাসের অভিনয়। মিতালী দাস দু-এক জায়গায় অতি অভিনয় করেছেন বলে মনে হলেও পরক্ষণেই মনে হয়েছে বাঙালির আবেগ তো এমনই—উপচে পড়া। মঞ্চ সফল হোক গত ২৬ এপ্রিলে মঞ্চে আসা থিয়েটার আর্ট ইউনিটের ‘সুতায় সুতায় হ্যানা ও শাপলা’।

ছবি :হামজা আনোয়ার