একটা মাত্র ওভার বল করলেন ফরহাদ রেজা। তাতেই দওলাত জাদরানের উইকেট। ক্যাচটা জমা হতেই ফরহাদের মুখটা ভেসে উঠল স্টেডিয়ামের দৈত্যাকার পর্দায়। চকচক করতে থাকা মুখটা দেখে মনে হল, সিনেমার কোনো নায়ক বুঝি। শুধু ফরহাদ রেজা কেন? মাহমুদউল্লাহর ক্যাচ, সাব্বিরের নির্ভুল থ্রো, মাশরাফির ভয়ঙ্কর বোলিং, এনামুল বিজয়ের শট; যে যা করলেন, তাই মনে হল নায়কোচিত কীর্তি!
কয়েক মাস আগেও এই কীর্তিগুলো এতোটা নাটকীয় মনে হত না নিশ্চয়ই; তখনও বাংলাদেশ নিয়মিত জিতছিল। কিন্তু মাঝে ভাগ্যের ফেরে, ছোটখাটো ভুলে একের পর এক হার উপহার পেতে পেতে এই ক্রিকেটারদের মুখগুলোই বড় ম্লান হয়ে পড়েছিল। অবশেষে ফিরে এলো সেই মুখগুলোতে হাসির ফোয়ারা, অবশেষে সব অস্বস্তি ঝরে গেল মুখগুলো থেকে।
এই স্বস্তি ফেরানো হাসির কৃতিত্ব নিশ্চয়ই সবার। তবে ম্যাচের স্কোরকার্ড বলছে, বাংলাদেশের চিরায়ত সেই স্পিনত্রাস ফিরে আসাতেই এমন দানবীয় চেহারায় দেখা দিল বাংলাদেশ। শুধু একটা ছোট্ট পরিসংখ্যান দেখুন—এই ম্যাচে আফগানিস্তানের ১০টি উইকেটের ২টি ছিল রানআউট; বাকি ৮টি উইকেটের ৬টিই নিলেন তিন স্পিনার। আর এই দাপটেই আবার চেনা রূপে বাংলাদেশ।
অথচ মাঝে কিছুদিন স্পিনারদের এই দাপটটাই হারিয়ে যেতে বসেছিল।
গত কয়েক বছর ধরে, ভালো করে বললে সেই ২০০৫-০৬ সাল থেকে বাংলাদেশের মূল অস্ত্র হয়ে আছে স্পিন। এই স্পিন দিয়ে ঘরের মাটির নিচু বাউন্সের ধীরগতির উইকেটে বাংলাদেশ বিশ্বসেরা দলগুলোকেও ঘায়েল করেছে। কিন্তু এ বছরের শুরু থেকে চিত্রটা আমূল বদলে গেছে। এ বছর বাংলাদেশ যে ৭টি ওয়ানডে খেলেছে সেখানে ৮ জন স্পিনার ২০৮.৩ ওভার বল করে মাত্র ২২টি উইকেট পেয়েছেন; ম্যাচে কেউ ৩টি উইকেটও পাননি! আবার দুটি টি-টোয়েন্টিতে ২০ ওভার বল করে ৬ জন বোলার সাকুল্যে পেয়েছেন ৭টি উইকেট।
কাল আবার চেনা চেহারায় ফিরলেন স্পিনাররা। বলাই বাহুল্য, সেই চেনা চেহারার আক্রমণে নেতৃত্ব দিলেন বিশ্বের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার, বাংলাদেশের সেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান।
৩.১ ওভার বল করে ৮ রানে সাকিব তুলে নিলেন ৩ উইকেট। পরিসংখ্যানই সাকিবের দাপট বোঝাতে যথেষ্ট। তবে আরেকটু ভেতরে ঢুকে দেখলে দৃশ্যটা পরিষ্কার হবে। ম্যাচের তৃতীয় ওভারে আক্রমণে এলেন সাকিব। এক প্রান্তে মাশরাফি তখন ভয় ছড়িয়ে দিয়েছেন, অন্য প্রান্তে আল আমিন একটু আলগা করে দিচ্ছেন আক্রমণ। ঠিক তখনই সাকিব এসে এই ওভারটায় দিলেন মাত্র ২ রান। নিজের দ্বিতীয় ওভারে হ্যাটট্রিকই বঞ্চিত হলেন সাকিব। প্রথম বলেই ক্যাচ ফেললেন সাব্বির। পরের দু’বলে অবশ্য সাব্বির ও নাসির অসাধারণ দুটি ক্যাচ ধরে কিছুটা পুষিয়ে দিলেন।
পরের দু’বলেও অসাধারণ দুই ডেলিভারিতে প্রতিপক্ষ অধিনায়ককে পরাস্ত করেছিলেন। আরও উইকেট এই সময় না পাওয়ায় বরং আফসোস করতে পারেন। সে আফসোস শেষ করে দিলেন নিজের শেষ ওভারের প্রথম বলেই আফগানিস্তানের শেষ উইকেট তুলে নিয়ে।
সাকিবের পাশাপাশি দারুণ উজ্জ্বল ছিলেন কাল রাজ্জাকও। মাঝে ক’টা দিন বাজে বোলিং, মাঠে অমনোযোগিতা নানা অভিযোগ, গুঞ্জনে এই দারুণ শান্ত-অভিজ্ঞ বোলারকে মনোকষ্টেও কাটাতে হয়েছে। নিজেই বার বার বলেছেন, সেরাটা করতে না পারলে খেলাই ছেড়ে দেবেন।
তার আর দরকার নেই।
অসাধারণ দুই আর্ম বলে তুলে নিলেন ২ উইকেট। রাজ্জাকের দুরন্ত এই আক্রমণাত্মক বোলিংয়ের পাশাপাশি কৃপণ চেহারাটা দেখিয়ে ৪ ওভারে মাত্র ৮ রান দেয়ার সঙ্গে একটি উইকেট নিলেন মাহমুদউল্লাহও। এরপর আর কী চাই!
ব্যাট করতে নেমে বিজয়ের দুরন্ত সব শট, মাশরাফির অসাধারণ শুরু, সাব্বিরের নিয়ন্ত্রিত বোলিং, ফরহাদ রেজার ছোট্ট একটু জ্বলে ওঠা; স্পিনারদের কীর্তির সঙ্গে এসব যোগ হয়ে বাংলাদেশকে দিল এক অসাধারণ বিকেল উপহার।
এই বিকেলটা লম্বা হোক, চলতেই থাকুক বিশ্বকাপ জুড়ে।
স্কো র কা র্ড
আফগানিস্তান রান বল ৪ ৬
শাহাজাদ ক মাহমুদউল্লাহ ব মাশরাফি ০ ১ ০ ০
তারাকাই ক নাসির ব সাকিব ৭ ১১ ১ ০
নাইব ক সাব্বির ব সাকিব ২১ ২২ ৩ ১
নওরোজ রান আউট ০ ১ ০ ০
নবী এলবিডব্লিউ রাজ্জাক ৩ ৯ ০ ০
সাদিক রানআউট ১০ ২৩ ০ ০
সফিকুলউল্লাহ ক মুশফিক ব মাহমুদউল্লাহ ১৬ ১৬ ২ ০
শেনওয়ারি ব রাজ্জাক ১ ৩ ০ ০
দওলাত ক মাহমুদউল্লাহ ব ফরহাদ ১ ৬ ০ ০
সাপুর ব সাকিব ১ ১১ ০ ০
আফতাব নটআউট ০ ১ ০ ০
অতি. (বা ২, লেবা ৫, ও ৩, নো ২) ১২
মোট: ১৭.১ ওভারে (অলআউট) ৭২
বোলিং:মাশরাফি ২-০-৮-১, আল আমিন ২-০-১৮-০, সাকিব ৩.১-০-৮-৩, মাহমুদউল্লাহ ৪-১-৮-১, রাজ্জাক ৪-০-২০-২, সাব্বির ১-০-১-০, ফরহাদ ১-০-২-১
বাংলাদেশ রান বল ৪ ৬
তামিম এলবিডব্লিউ শেনওয়ারি ২১ ২৭ ২ ০
এনামুল নট আউট ৪৪ ৩৩ ৪ ৩
সাকিব নট আউট ১০ ১২ ১ ০
অতি. (বা ১, ও ২) ৩
মোট: ১২ ওভারে, ১ উইকেটে ৭৮
বোলিং:নবী ৩-০-১১-০, সাপুর ১-০-৭-০, সাদিক ২-০-১৭-০, দওলাত ২-০-১৩-০, শেনওয়ারি ৩-০-১৪-১, আফতাব ১-০-১৫-০।
ফল: বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জয়ী
ম্যান অব দ্য ম্যাচ: সাকিব আল হাসান
