সুপ্রিয় শিক্ষার্থী, আজকে আমরা মুসলিম আইনের ১টি প্রশ্নের উত্তর নিয়ে আলোচনা করবো।
মুসলিম আইন
প্রশ্ন-মুসলিম আইনানুসারে বিবাহের উদ্দেশ্য কি? বাতিল ও ফাসিদ বিবাহের আইনগত ফলাফলসমূহ আলোচনা কর।
সমস্যা : কালাম নামের এক হানাফী মুসলমান তার এক স্ত্রী বর্তমান থাকাবস্থায় আরতি নামে এক হিন্দু মহিলাকে বিবাহ করে। এই বিবাহে তার প্রথম স্ত্রী সম্মতি দেয়নি। তাছাড়া এই বিবাহ প্রচলিত আইনানুযায়ী নিবন্ধিতও হয়নি। এই বিবাহের বৈধতা পরীক্ষা করে এর ফলাফল বর্ণনা কর।
গতকালের পর
একজন পুরুষ এবং নারী বিভিন্ন পরিস্থিতিতে পরস্পরে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে। যেমন বলা যায়, একজন পূর্ণবয়স্ক কুমার পুরুষের সাথে একজন কুমারীর, বিপত্নীক পুুরুষের কুমারী নারীর, কুমার পুরুষের সাথে বিধবা নারী এবং স্ত্রী থাকা অবস্থায় বিবাহিত পুরুষের সাথে কুমারী। বিধবা বা বিবাহবিচ্ছেদকৃত নারীর বিবাহ হতে পারে।
বাতিল বিবাহের আইনগত ফলাফল : (Effects of irregular marriage) : যে সকল বিবাহ রক্ত সংক্রান্ত কিংবা বিবাহ সংক্রান্ত কিংবা দুগ্ধ সংক্রান্ত বিধি নিষেধ লঙ্ঘন করে অনুষ্ঠিত হয়, মুসলিম আইনে ঐ সকল বিবাহকেই বাতিল বিবাহ বলে।
এছাড়া যদি কোনো স্ত্রীলোক এক স্বামী বর্তমান থাকা অবস্থায় অন্য স্বামী বিবাহ করে, তবে ঐ বিবাহটিকেও বাতিল বিবাহ বলে গণ্য করা হয়।
বাতিল বিবাহের নিম্নলিখিত ফলাফল পরিলক্ষিত হয় :
(ক) নিষিদ্ধ বিবাহ : বাতিল বিবাহের ফলে যে বিবাহ চুক্তি সম্পাদিত হয় এটি সম্পূর্ণ বাতিল চুক্তি বলে অভিহিত হয়। ফলে, বাতিল বিবাহকে মুসলিম আইনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বিবাহ বলে আখ্যায়িত করা হয়।
(খ) সন্তান বৈধ হয় : বাতিল বিবাহের ফলে যে সন্তান জন্মগ্রহণ করে তাকে অবৈধ বা জারজ সন্তান হিসাবে গণ্য করা হয়।
(গ) অধিকার ও দায়দায়িত্ব সৃষ্টির প্রশ্নে : এরূপ বিবাহ স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের মধ্যে পারস্পরিক অধিকার ও দায়দায়িত্বের সৃষ্টি করে না।
(ঘ) পিতার সম্পত্তি লাভে বঞ্চিত : এরূপ বিবাহের ফলে জন্মগ্রহণকারী সন্তানগণ পিতার সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারী হয় না।
(ঙ)দেওয়ানি অধিকার সৃষ্টির প্রশ্নে :এরূপ বিবাহের ফলে পক্ষদ্বয়ের মধ্যে কোনোরূপ দেওয়ানি অধিকার সৃষ্টি হয় না।
অনিয়মিত/ফাসিদ বিবাহের ফলাফল : যেসব বিবাহ সহিহ্ নয় কিংবা বাতিলও নয় সেসব বিবাহকে সুন্নী আইন মোতাবেক অনিয়মিত বা ফাসিদ বিবাহ বলে। যেমন: বিবাহে কোনো সাক্ষী না থাকলে ঐ বিবাহকে অনিয়মিত বিবাহ বলে। নিচে অনিয়মিত বিবাহের ফলাফল আলোচনা করা হলো :
সহবাসের পূর্ব ও পরের অবস্থা : যৌন সহবাস অনুষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে ফাসিদ বিবাহের কোনো আইনগত ফলাফলের উদ্ভব হয় না। তাই সহবাসের পূর্বে বা পরে যেকোনো সময়েই যেকোনো পক্ষই মৌখিকভাবে বিবাহটির পরিসমাপ্তি ঘটাতে পারে। ফলে সহবাস করার পূর্বে যেকোনো পক্ষ যদি এ কথা বলে যে, “আমি তোমাকে পরিত্যাগ করলাম” তাহলে উক্ত বিবাহের পরিসমাপ্তি ঘটবে।
এরূপ বিবাহের পর সহবাস অনুষ্ঠিত হয়ে থাকলে নিম্নবর্ণিত ফলাফল ঘটতে পারে :
মোহরানার ক্ষেত্রে : অনিয়মিত বিবাহের ফলে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে যৌন সংগম অনুষ্ঠিত হলে স্ত্রী যথাযথ অথবা সুনির্দিষ্ট দেনমোহরের মধ্যে যেটা কম হবে সেরূপ দেনমোহর বা মোহরানা পাওয়ার অধিকারী হয়। পক্ষান্তরে, অবৈধ বিবাহের ফলে স্ত্রী কোনোরূপ দেনমোহর লাভ করতে পারে না। তবে সহবাস হয়ে থাকলে স্ত্রী মোহরানা প্রাপ্ত হয়।
স্বামী স্ত্রীর পারস্পরিক উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে : নিয়মিত বিবাহের ফলে দাম্পত্য মিলন অনুষ্ঠিত হলেও স্বামী স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক উত্তরাধিকার সৃষ্টি হয় না। অর্থাত্ একে অপরের সম্পত্তিতে কোনো অংশ পায় না। পক্ষান্তরে, একইভাবে অবৈধ বিবাহের ফলে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক উত্তরাধিকারিত্ব সৃষ্টি হয় না। অর্থাত্ একজন মারা গেলে অন্যজন তার সম্পত্তিতে কোনো অংশ পায় না।
সন্তানের বৈধতার প্রশ্নে : অনিয়মিত বিবাহের ফলে যে সন্তানাদি জন্মগ্রহণ করে, তারা বৈধ সন্তান হিসাবে স্বীকৃত হয়। তাই এরূপ বিবাহের সন্তানগণ পিতামাতা উভয়ের সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারী। পক্ষান্তরে, অবৈধ বিবাহের ফলে যে সন্তানাদি জন্মগ্রহণ করে, তারা বৈধ সন্তান হিসাবে স্বীকৃত হয় না। অর্থাত্ এরূপ বিবাহের ফলে যে সন্তান হয় তাকে অবৈধ বা জারজ সন্তান হিসাবে গণ্য করা হয়। এরূপ সন্তানগণ পিতার সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারী হয় না।
অবৈধ বিবাহ অনুষ্ঠানের জন্য যদিও পক্ষগণ হদ্দ বা জেনার শাস্তি পাওয়ার যোগ্য নয়, তথাপি ইসলামী আইন মোতাবেক পক্ষগণকৃত অপরাধের জন্য শাস্তিবিহীন যেতে পারে না। তাদেরকে তাজির (বিবেচনামত শাস্তি) দ্বারা সংশোধন করা হবে, যার মাত্রা বা পরিমাণ প্রত্যেকটির ক্ষেত্রে অবস্থাভেদে কঠিনও হতে পারে।
শিয়া আইনে অবৈধ এবং বাতিল বিবাহের মধ্যে কোনোরূপ পার্থক্য করা হয় না। সুন্নী আইন মোতাবেক সে বিবাহ অবৈধ, শিয়া আইন মোতাবেক বিবাহ সম্পূর্ণরূপে পণ্ড বা বাতিল বিবেচিত হবে।
সমস্যার সমাধান : আলোচ্য সমস্যাটিতে কালাম নামে একজন হানাফী মুসলমান প্রথমা স্ত্রীর পূর্ব অনুমতি ব্যতিরেকে একজন হিন্দু মহিলাকে বিবাহ করে। এক্ষেত্রে নিম্নলিখিত ফলাফলগুলো সৃষ্টি হবে :
(১) মুসলিম আইন মতে প্রথমা স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিবাহ করার কারণে বিবাহটি অনিয়মিত বা ফাসিদ ও ত্রুটিপূর্ণ বিবাহ হিসেবে পরিগণিত হবে।
(২) হিন্দু অর্থাত্ বিধর্মী মহিলাকে বিবাহ করার ন্যায় বিবাহটি ফাসিদ বলে গণ্য হবে।
(৩) ১৯৮০ সালের কাজীর আইন এবং ১৯৬১ সালের পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ মোতাবেক বিবাহটি রেজিস্ট্রি হয়নি বলেও বিবাহটি ফাসিদ বিবাহ হিসেবে পরিগণিত হবে।
অবশ্য উল্লিখিত কারণে বিবাহটি বাতিল হবে না। নতুন বিবাহিত আরতি এবং কালামের মধ্যে সহবাসের পূর্বে তালাক শব্দ উচ্চারণ করলে এই বিবাহের পরিসমাপ্তি ঘটবে। কিন্তু সহবাস হয়ে থাকলে আরতি দেনমোহর পাওয়ার অধিকারী হবে। তাদের সন্তান বৈধ বলে গণ্য হবে এবং পিতামাতার সম্পত্তিতে সন্তানের উত্তরাধিকার বৈধ বলে গণ্য হবে।
উপসংহার : উল্লিখিত আলোচনার প্রেক্ষাপটে আমরা বলতে পারি যে, মুসলিম আইনে বৈধ, অনিয়মিত ও বাতিল বিবাহের ফলাফল বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ। কারণ, বিবাহের প্রকৃতি ও শ্রেণীতে পার্থক্যের কারণ বিবাহের পক্ষদ্বয় ও সন্তানাদির ওপর এর প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়। তাই, মুসলিম আইনে স্বামী স্ত্রী ও তাদের সন্ত্মানগণের পারস্পরিক অধিকার ও দায়-দায়িত্ব বিবাহের শ্রেণীগত অবস্থার ওপর নির্ভর করে।
