হারিয়েছিলাম সাতদিন

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০১৪, ১৮:৩৫
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হারিয়েছিলাম সাতদিন। আমরা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের লেভেল-৪, সেমিস্টার-১ এর শিক্ষার্থীরা সাতদিন হারিয়েছিলাম বান্দরবানের উঁচু নিচু পাহাড়, রাঙামাটির ঝুলন্ত ব্রিজ, কাপ্তাই, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত, সেন্টমার্টিন আর ছেঁড়াদ্বীপে। হ্যাঁ, আমাদের শিক্ষা সফরের কথা বলছি। তারিখটা ২৬ ফেব্রুয়ারি, রাত আটটা; আমরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবন সংলগ্ন হ্যালিপ্যাডে অপেক্ষা করছি। একটু পরই অনুষদের সবাই ছয়টি ভাগে ভাগ হয়ে ভিন্ন ছয়টি গাড়ি করে রওনা হবো। টানা সাতদিন গাড়ি ভ্রমণ, নানান জায়গার নানান খাবার, নতুন নতুন পরিবেশ, নতুন নতুন মানুষ এইসব নানামুখী দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুম হয়নি অনেকেরই। তারপরও আমরা সবাই হাসিমুখেই যাচ্ছি কারণ এতদিন সুন্দর সুন্দর যে সব জায়গার কথা শুধু শুনে এসেছি সেগুলো স্ব-চোখে, স্ব-শরীরে দেখতে যাচ্ছি। আমরা গ্রুপ-৫ তে ছিলাম ৩১ জন, সাথে ছিলেন উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের ড. মো: শাহজাহান মঞ্জিল, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ড. মো: শাহাদাত হোসেন সুমন। প্রথম দিন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে ভৈরব ও কুমিল্লা হয়ে সোজা বান্দরবানের মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্স। দুপুরে বান্দরবানের হর্টিকালচার সেন্টারে গোসল-খাওয়া শেষ করে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে দেখতে বের হলাম বালাঘাটের স্বর্ণ মন্দির। রাতটা ওখানে কোন রকম পার করে পরদিন খুব ভোরে দেখতে বের হলাম বান্দরবানের নীলাচল, নীলগিরি ও চিম্বুক পাহাড়। পরদিন ১ মার্চ, খুব ভোরে সোজা রাঙ্গামাটির ঝুলন্ত ব্রীজ। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ছোট বোটে চড়ে কাপ্তাইয়ের বুকে ঘুরলাম। রাঙামাটির পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্স, ঝুলন্ত ব্রিজ, রাজবনবিহার ও জলে ঘেরা বরকল উপজেলা ঘুরে সবাই মুগ্ধ হলাম। ওইদিন বিকেলে চট্টগ্রাম, বান্দরবান পার হয়ে রাত সাড়ে ১২ টায় গিয়ে পৌঁছলাম পূর্ব নির্ধারিত আমাদের থাকার স্থান কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। কোন রকমে ব্যাগটা রেখেই সকল ক্লান্তি ভুলে স্যারদের নিষেধ অমান্য করে রাত ১ টায় কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র থেকে পায়ে হেঁটে মাত্র ৫ মিনিট দূরে অবস্থিত সমুুদ্রে ছুটে গেলাম তার গর্জন শুনতে। সমুদ্রের গর্জন শুনলাম প্রায় রাত ৩ টা পর্যন্ত। সমুদ্র সৈকতে খালি পায়ে হেঁটে বেড়ালাম আমি, নাজমুল, আরিফিন, উত্তম, ফরিদ ও আরো অনেকে। রাতে নামমাত্র একটু ঘুমিয়ে সকালেই বেরিয়ে পড়লাম সমুদ্র সৈকত দেখতে। আমাদের প্রায় কারোরই এর আগে সমুদ্র সৈকত দেখার অভিজ্ঞতা ছিল না। তাই সবাই মিলে খুব মজা করলাম। সমুদ্রের ঢেউ যে কত সুন্দর হতে পারে তা কক্সবাজার না গেলে বুঝতামই না। সমুদ্রে লাফালাফি, ঝাঁপা-ঝাঁপি করেই দিনটা কেটে গেল। কক্সবাজারের রেস্টুরেন্টের সামুদ্রিক মাছ, হিমছড়ির ৩শ’ ফুট উঁচু পাহাড়, ইনানী সমুদ্র সৈকত থেকে সূর্যাস্ত উপভোগ করা ছিল মনে রাখার মত। এরপর ৩ মার্চ ছিল আমাদের সবার স্বপ্নের দিন। সাথে ছিল আরো দু’টি গ্রুপ (গ্রুপ-১, ৩)। এইদিন ঠিক দুপুর ১২টায় আমরা পৌছলাম সেন্টমার্টিন দ্বীপে। সেন্টমার্টিনে একটি রাত, অনুভূতিটাই ছিল অন্যরকম। চারপাশের সমুদ্রের গর্জন আমাদের ঘিরে রেখেছিল। ওইদিন সেন্টমার্টিনের প্রবাল আর ঢেউয়ের সাথে খেলা করে সন্ধ্যায় আমরা সবাই বের হলাম শপিং করতে। রাতে বারবিকিউ পার্টি ও সাথে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল মনে রাখার মত। চাঁদের আলোতে সেন্টমার্টিনের সমুদ্র সৈকতে তানবিনের গিটার হাতে গান গাওয়া আমাদের সবার হূদয় ছুঁয়ে গেছে। পরদিন ভোরে স্পিড বোটে করে ছেঁড়াদ্বীপে যাবো বলে উত্তেজনায় আমাদের কারোরই ঠিকমত ঘুম হয়নি। সেন্টমার্টিন থেকে সূর্যোদয় দেখা ছিল অনেক রোমান্টিক একটা দৃশ্য। স্যারদের কথামত খুব ভোরে স্পিড বোটে করে রওনা হলাম ছেঁড়াদ্বীপের উদ্দেশ্যে। আমার মত অনেকেরই স্পিড বোটে চড়ার অভিজ্ঞতা একেবারেই নতুন। ছেঁড়াদ্বীপে দু’ঘণ্টা পার করা আমাদের প্রত্যেকের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর কিছু মুহূর্তের মধ্যে অন্যতম।