রাশিয়া-চীন ক্রমবর্ধমান মৈত্রী

আপডেট : ২২ মে ২০১৯, ২১:৫৯

বলিতে গেলে খানিকটা অনালোচিতভাবেই অন্যতম দুই পরাশক্তি রাশিয়া ও চীনের মধ্যকার বন্ধুত্ব গত কিছুদিন ধরিয়া ক্রমশ শক্তিশালী হইতেছে। আমেরিকার নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব মনে করিত যে, এই দুই পরাশক্তির মধ্যে অনাস্থা ও অবিশ্বাস এত গভীরে যে ইহারা চিরকাল পরস্পর হইতে দূরেই থাকিয়া যাইবে। অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রের অমিলগুলিও এই দুই পরাশক্তির কাছাকাছি না আসিবার ব্যাপারে পশ্চিমা দুনিয়াকে আশ্বস্ত রাখিত। সম্ভবত সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের নেতৃত্ব লইয়া গত শতাব্দীর ষাটের দশকে এই দুই দেশের মধ্যকার বৈরিতার স্মৃতি এহেন পর্যবেক্ষণে বড় ভূমিকা রাখিয়াছিল; কিন্তু সমাজতন্ত্র শেষ হইয়াছে কয়েক দশক পূর্বে। রাশিয়া ও চীন উভয়ে এখন কট্টর বাজার অর্থনীতিমুখী। এই দুইয়ের মধ্যে চীন আবার সারা পৃথিবীতে অর্থনৈতিক শক্তির জোরে দাপাইয়া বেড়াইতেছে। আর সামরিক শক্তির দিক হইতে ভাবিলে রাশিয়া এখন অবধি প্রধান দুই শক্তির একটি। এমতাবস্থাতে এই দুই দেশের ক্রমবর্ধমান মৈত্রী সামনের দিনগুলিতে বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় নূতন বৈশিষ্ট্য যোগ করিতে বাধ্য বলিয়াই বিশ্লেষকরা ধারণা করিতেছেন।

রাশিয়া ও চীনের কাছাকাছি আসিবার ক্ষেত্রে স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী যুগে দুনিয়াব্যাপী আমেরিকার প্রবল আধিপত্য অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করিতেছে বলিয়া মনে হইতেছে। উভয় দেশ আমেরিকার একক আধিপত্য বিরোধী। উত্তর কোরিয়া কিংবা ইরান সংকটসহ অন্য আরও বেশ কয়েকটি ইস্যুতে ইহারা প্রায় একই সুরে কথা বলিতেছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর নিয়মিত দেখা-সাক্ষাতের মধ্যেও দুই পরাশক্তির ঘনিষ্ঠ হইয়া উঠিবার আভাস মিলিতেছে। দুই দেশ বর্তমানে বিনিয়োগ, যোগাযোগ, মহাকাশ বিজ্ঞান এবং গোপনীয় সামরিক প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রগুলিতে একত্রে কাজ করিতেছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে যে, রাশিয়া-চীনের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক কেবল শি-পুতিনের ব্যক্তিগত সুসম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকিয়া রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পরিব্যাপ্ত হইয়াছে। এইদিকে, পাঁচ মহাদেশের দেড় শতাধিক রাষ্ট্রকে স্থল-জল পথে যুক্তকরণ এবং অবকাঠামো নির্মাণ, উন্নয়ন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে গঠিত চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ শীর্ষক মহাপরিকল্পনার সহিত, রাশিয়া তাহার নেতৃত্বাধীন মধ্য ও উত্তর এশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের অনেকগুলি দেশ লইয়া গঠিত ইউরেশিয়ান ইকোনমিক ইউনিয়ন নামক অর্থনৈতিক জোটটিকে সমন্বিত করিয়া লইয়াছে সম্প্রতি। এই দুই উদ্যোগের গূঢ় উদ্দেশ্য যাহাই হোক না কেন, একবার ইহারা কাজ করিতে শুরু করিলে পৃথিবীব্যাপী তাহার প্রভাব কোনো না কোনোভাবে অনুভূত হইতে বাধ্য।

রাশিয়া ও চীনের প্রভাব বৃদ্ধির মুখে নূতন দুনিয়ার ধরন কেমন হইবে? আমেরিকার সর্বময় প্রভাব কি হ্রাস পাইবে? অষ্টাদশ শতকের ইউরোপীয় উপনিবেশ আমল হইতে ধ্রুব হিসাবে মান্য হওয়া নানাবিধ তত্ত্ব ও ব্যবস্থার পরিণতি কেমন হইবে? এইসব প্রশ্নের জবাব জানিতে সুদীর্ঘকাল অপেক্ষা করিতে হইবে বলিয়া মনে হয় না।