ভারতের নির্বাচন :এই বিতর্কের শেষ কোথায়?

আপডেট : ২২ মে ২০১৯, ২১:৫৯

আজ বৃহস্পতিবার ভারতের বহুকাঙ্খিত জাতীয় নির্বাচনের ফল ঘোষিত হচ্ছে। আমাদের নিকটতম প্রতিবেশি ভারত বর্তমানে সামরিক শক্তি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিক থেকে একটি শক্তিশালী দেশ। পরাশক্তি হিসেবেও দেশটিকে আজ বিবেচনা করা হয়। ভারতের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এই দেশটিকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করা হইয়া থাকে। আয়তনের দিক থেকে এটি পৃথিবীর সপ্তম বৃহত্তম দেশ হলেও এর জনসংখ্যা ১৩০ কোটি। এজন্য চীনের পরই দ্বিতীয় জনবহুল দেশের নামও ভারত। যেহেতু চীন গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বিবেচ্য নয়, তাই বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের উপাধিটি ভারতেরই প্রাপ্য।

ভারতের গণতান্ত্রিক পথচলার সুদীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে। ১৯৫০ সালের ২৬ মার্চ ভারতের সংবিধান কার্যকর হয় যেখানে ভারতকে একটি সার্বভৌম গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তখন থেকেই বলতে গেলে নিরবচ্ছিন্নভাবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু আছে ভারতে। গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। এর শিরোনাম- এ গাইড টু দ্য ড্রামা অ্যান্ড ডাইনামিকস বিহাইন্ড ইন্ডিয়া’জ হিস্ট্ররিক ইলেকশনস’। এর শিরোনামের মধ্যেই ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বরূপ উদঘাটিতে হয়েছে। অর্থাত্ ভারতে নির্বাচনের চর্চা বহুদিনের। নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পালন করে শক্তিশালী ভূমিকা। আবার এই দেশের নির্বাচনে আছে নাটকীয়তাও।

গত ছয় সপ্তাহ ধরে ভারতের পার্লামেন্ট বা লোকসভার সপ্তদশ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। শেষ ধাপের ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে গত ১৯ মে রবিবার। ইতোমধ্যে বুথ ফেরত জরিপের ফল ঘোষণা করা হয়েছে এবং এ নিয়ে চলছে নানা বিতর্ক। এছাড়া বলা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়েছে ভারতে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এজন্য ব্যয় করেছে সাত বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ। খোদ নির্বাচন কমিশন প্রায় এক বিলিয়ন নগদ অর্থ জব্দ করেছে যা নির্বাচনকে অযাচিতভাবে প্রভাবিত করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছিল বলে জানা যায়।

বিজেপি নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর জোট এনডিএ (ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স) প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র  মোদিকে এখনো শক্তিশালী নেতা হিসেবে বিবেচনা করছে। তারা মনে করছেন, মোদিই রক্ষা করতে পারবেন ভারতকে। আর কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ধর্মনিরপেক্ষ, বাম ও মধ্যবামপন্থি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর জোট ইউপিএ (ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স) মনে করছে মোদির হিন্দু-ফার্স্ট বা হিন্দুপ্রথম নীতি ও রাজনীতি ভারতকে কম সহিঞ্চুতার দেশে পরিণত করছে। মোদির অর্থনৈতিক এজেন্ডা ব্যর্থ হয়েছে। সুতরাং তাকে এবার ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হবে। ২০১৪ সালে কংগ্রেসের যে শোচনীয় পরাজয় ঘটে, তা থেকে এক সময়ের দাপুটে এই দলটির কতটা উত্তরণ ঘটছে, তা আজ নির্বাচনের ফলাফলের মাধ্যমেই জানা যাবে।

এবারের নির্বাচনে ইভিএম (ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন) বিতর্ক ঝড় তুলেছে। নির্বাচনের আগেও এ নিয়ে প্রশ্ন ছিল, দুনিয়া জুড়েই ছিল। যদিও ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ইভিএমের ব্যবহার নতুন নয়। ১৯৮২ সালে প্রথম ইভিএম ব্যবহূত হয়। তবে এবারের ইভিএমের ব্যবহার বেড়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে যেখানে ১.৮ মিলিয়ন ইভিএম ব্যবহূত হয়েছিল, সেখানে এবার ব্যবহূত হয়েছে ২.৩ মিলিয়ন; কিন্তু কংগ্রেসসহ বিরোধী দল এবার ইভিএমে কারচুপির আশঙ্কা করেছে। এজন্য ২২ দলের নেতারা নির্বাচন কমিশনে যান এবং সব ইভিএম স্লিপ গণনার দাবি জানান। ইভিএমের সঙ্গে ভিভিপ্যাট নামে একটি যন্ত্র সংযুক্ত থাকে যেখান থেকে একজন ভোটার ভোট দেওয়ার পর কোন দলের প্রার্থীকে ভোট দিলেন তার তথ্য সম্বলিত একটি স্লিপ বেরিয়ে আসে। এই স্লিপ সংরক্ষিত থাকে এবং ইউপিএ জোট তাও গণনার আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছে। এর আগে নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর যে বুথ জরিপ প্রকাশিত হয়, তাতে এনডিএ জোট ৩০০-এরও বেশি আসনে জয়লাভ করবে বলে বলা হয়। মোট ৫৪৩টি আসনের মধ্যে নির্বাচনে জয়লাভের জন্য পেতে হবে ন্যূনতম ২৭২ আসন। তামিল নাড়ুর ভেলোরে নির্বাচন স্থগিত থাকায় এবার সাত ধাপের নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হয়েছে ৫৪২টি আসনে। বুথ জরিপের ফলাফল অনেক সময় সত্য হয় না। এজন্য কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এই সকল জরিপের ফলাফলে তার সমর্থকদের হতাশ না হওয়ার কথা বলেছেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এরূপ ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী স্ট্রং রুম (যেখানে ভোটের পর ইভিএম রাখা হয়) ও গণনা কেন্দ্র পাহারা দেওয়ার কথা বলেছেন। বাংলাদেশেও গত জাতীয় নির্বাচনের সময় আগের রাত থেকে ভোটকেন্দ্র পাহারা দেওয়ার কথা বলেছিলেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেন; কিন্তু বাস্তবে আমরা তার প্রতিফলন দেখিনি। আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতির সঙ্গে এই মিল কি কাকতালীয়?

ভারতে ইভিএমের অস্বচ্ছতা ও সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনা না করতে পারার অভিযোগ তুলছেন বিরোধীরা। তারা নির্বাচন কমিশনকে পক্ষপাতদুষ্টু বলে মন্তব্য করছেন। যদিও পক্ষপাতের অভিযোগ মানতে নারাজ ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও কংগ্রেস নেতা প্রণব মুখার্জি; কিন্তু গত বছরের ৬ জুন ক্ষমতাসীন দল বিজেপির আদর্শিক পরামর্শদাতা সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সদর দপ্তরে এক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে প্রণব মুখার্জি কংগ্রেসের অনেক নেতা-কর্মীর বিরাগভাজন হন। মোটকথা, ভারতের এবারের নির্বাচন নিয়ে যে সমালোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তাতে গণতন্ত্রকামীরা অনেকাংশে আশাবাদী যে হতে পারছেন না তা বলাই বাহুল্য। এই বিতর্কের শেষ কোথায় তা আমরা কেউ বলতে পারি না।

n লেখক : সাংবাদিক