আর কয়েকদিন পরই ঈদ। মুসলমানদের বৃহত্ ধর্মীয় উত্সব ঈদ। একমাস সিয়াম সাধনার পর ঈদ আসে সকল মুসলমানের মাঝে আনন্দ ও উত্সবের বার্তা নিয়ে। নতুন নতুন জামা-কাপড় পরিধান করা, ঈদগাহে নামাজ পড়া, ফিরনি-সেমাই খাওয়া প্রভৃতি ঈদের দিনের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। ইতোমধ্যে অনেকেই ঈদ শপিং শুরু করে দিয়েছেন। নিত্যনতুন জামাকাপড় কেনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন অনেকেই। নিজের জন্য অথবা নিজ সন্তান, স্বামী, স্ত্রী, নিকটজনের জন্য নতুন কাপড় কিনছেন সবাই। শপিং সেন্টারগুলোতে উপচে-পড়া ভিড় দেখেই তা আন্দাজ করা যায়। বাংলাদেশ মুসলিম প্রধান দেশ হওয়ায় ঈদকে কেন্দ্র করে মানুষের প্রস্তুতি ব্যাপক। দশ হাজার বিশ হাজার থেকে লাখ টাকারও ঈদ মার্কেট করবেন অনেকে। বাংলাদেশ উন্নত দেশের মর্যাদা পেলেও হতদরিদ্রের সংখ্যাও এদেশে কম নেই। দেশের বিরাট এক অংশ আজও দরিদ্র। তিন বেলা খাবার খাওয়াই যাদের কাছে কষ্টসাধ্য তাদের কাছে ঈদের আনন্দ মলিন। তাদের উপোস অনাহার আর কষ্টে রেখে আমাদের ঈদের আনন্দ কখনো সার্থক হবে না। বাংলাদেশে ভিক্ষুকের সংখ্যা আসলে কত তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে ভিক্ষুক আর ভিক্ষাবৃত্তি যে দেশের জাতীয় একটি সমস্যায় পরিণত হয়েছে এতে সন্দেহের অবকাশ নেই! সরকারি হিসেবে দিনে দিনে ভিক্ষুকের সংখ্যা কমছে বলে উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে কতটুকু কমেছে তা অনুমেয়। রাস্তাঘাটে বেরোলেই উল্লেখযোগ্যহারে ভিক্ষুক ও পথশিশু চোখে পড়ে। যাদের গায়ে নেই ভালো জামা। নেই ভালো খাবার। অনেকেই প্রতিবন্ধী। পেটের তাগিদে আর দারিদ্র্যের কারণে ভিক্ষাবৃত্তি করে বেড়ায়। সম্প্রতি এক জরিপে বলা হয়েছে যে, সবচেয়ে ভিক্ষুক বেশি রাজধানী ঢাকায়। এছাড়াও সারাদেশে বিশেষ করে প্রধান প্রধান শহরগুলোতে এদের অবস্থান বেশি। এরা তিন বেলা ঠিকমতো খাবার খেতে পারে না। এদের কাছে ঈদও অন্যসব দিনের মতোই। এদের দেখার দায়িত্ব আমাদের সবার। এই ঈদে তাদের মুখেও হাসি ফোটানো কর্তব্য সকলের। দরিদ্র জনগোষ্ঠী ছাড়াও দেশে পথশিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। ২০১৬ সালের তথ্য উল্লেখ করে বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ২৪.৩ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে। অর্থাত্ মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষই দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে। বেসরকারি এক জরিপ অনুযায়ী দেশে পথশিশুর সংখ্যা প্রায় ৬০-৭০ লাখ। এসব পথশিশুর নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা নেই। বাসস্ট্যান্ড, রেল স্টেশন, ফেরিঘাট বিভিন্ন জায়গায় এরা রাত কাটায়। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপে দেখা যায়, দেশে ১৮ লাখ শিশু শ্রমিক আছে, যাদের মধ্যে ১৩ লাখ ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে জড়িত। অভাবের তাড়নায় এসব শিশু বাধ্য হয় শিশু শ্রমিকের খাতায় নিজের নাম লেখাতে। এক জরিপে জানা গেছে যে, দেশে প্রায় ৪ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু শ্রমিক বেশি। অতীতের তুলনায় বর্তমানে আরো বেশি, তাই এর সঠিক পরিসংখ্যান বের করা সম্ভব নয়। এসব পথশিশু তাদের মা-বাবার সঙ্গে কিংবা একা নিজেই বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত। এদের কখনো দেখা যায় রাস্তার পাশে নির্মাণাধীন কোনো স্থাপনায় ইট বা খোয়া ভাঙতে। বাংলাদেশের শিশু শ্রমিকরা অনেকেই রেস্তোরাঁর মেসিয়ার হিসেবে কাজ করে। হোটেলের টেবিল মোছা, পানি সরবরাহ করা, ঝাড়ু দেওয়া প্রভূত কাজে তারা নিয়োজিত। আমরা কি পারি না সম্মিলিতভাবে এসব গরিব অসহায় মানুষ ও শিশুদের সঙ্গে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে? এরাও এই সমাজেরই অবিচ্ছেদ্য এক অংশ। আমরা চাইলে নিজের কাপড় কেনার টাকা থেকে কিছু অর্থ বাঁচিয়ে অসহায় দরিদ্রদের সাহায্য সহযোগিতা করতে পারি। দেশে বিভিন্ন জেলাভিক্তিক বেশ কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্রত্যেক ঈদে গরিব অসহায় নারী, পুরুষ ও শিশুদের ঈদের কাপড় ও ঈদ উপকরণ বিনামূল্যে বিতরণ করে থাকে। আমরা চাইলে এসব সংগঠনের সঙ্গে আর্থিক সাহায্য প্রদানের মাধ্যমে দরিদ্রদের সাহায্য করতে পারি। অথবা সবাই নিজ নিজ এলাকার হতদরিদ্রদের সাহায্য করতে পারি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে দেশে বেশ কয়েকটি বৃদ্ধাশ্রম রয়েছে। যেখানে বসবাস করছেন আমাদের অসহায় অধিকার বঞ্চিত মায়েরা। আমাদের সকলের সম্মিলিত উদ্যোগ তাদের মুখেও হাসি ফোটাতে পারে। সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং সরকারি সহায়তা পেলে সুনির্দিষ্ট সামাজিক সংগঠনগুলো আরো বেশি করে মানবসেবা করার সুযোগ পেতে পারে। তাই সরকারের উচিত এই বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়া। ঈদ হোক সবার জন্য আনন্দের, খুশির। আসুন আমরা সকলেই সকল ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যের মাধ্যমে ঈদকে সবার জন্য আনন্দময় করে তুলি।
n লেখক:শিক্ষার্থী, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া
