মানুষের জীবন ধারণের ক্ষেত্রে পানি একটি মৌলিক উপকরণ। গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ হিসাবে পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবার সমান সুযোগ থাকা প্রয়োজন। আর সেটা বিবেচনা করেই সুপেয় পানির অধিকার ও স্যানিটেশন সুবিধাকে ২০১০ সালে মানবাধিকারের অন্যতম অংশ হিসাবে ধরা হয়েছে। তবুও দেখা যায়, পৃথিবীতে প্রায় ৭৫ কোটি মানুষ মানসম্মত পানির অধিকার এবং ২৫০ কোটি মানুষ স্যানিটেশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
শনিবার বিশ্ব পানি দিবসে সিরডাপ মিলনায়তনে ‘জলা-হাওর-নদী ব্যবহারে সমান সুযোগ চাই’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। বৈঠকের আয়োজন করে অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মো. নজরুল ইসলাম। অ্যাকশন এইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবীরের সভাপতিত্বে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বেলার প্রধান নির্বাহী রিজওয়ানা হাসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ, বুয়েটের অধ্যাপক ড. রেজাউর রহমান, ড. শামসুল হুদা প্রমুখ।
বৈঠকে বক্তারা বলেন, পানি ব্যবহারে সমান সুযোগকে মানবাধিকার হিসাবে চিহ্নিত করতে হবে। ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। রাজনৈতিক এবং উন্নয়নের মূলধারার আলোচনায় বিষয়টিকে নিয়ে আসতে হবে। এছাড়া পানি সংকটের একটি টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে বিভিন্ন ধারার মতামতকে একটি জায়গায় নিয়ে আসা প্রয়োজন বলে বক্তারা দাবি করেন।
এদিকে বিশ্ব পানি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আরেক অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেছেন, শক্তি-সম্পদ ও পানি-সম্পদ উভয়ই একটি অপরটির সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে সম্পর্কিত। উভয় সম্পদের সঠিক ব্যবহার টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করতে এবং উভয় সম্পদের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় করে পানি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সরকারকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান বিশেষজ্ঞরা।
জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘দ্যা ওয়াটার-এনার্জি নেক্সাস’ শীর্ষক মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, জাতিসংঘ তথ্য কেন্দ্র, ইউনিসেফ, বিশ্ব ব্যাংক, বাংলাদেশ ওয়াশ এ্যালায়েন্স, জাইকা বাংলাদেশ, বাংলাদেশ সেন্টার ফর এ্যাডভান্সড স্টাডিজ ও এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেল্থ যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে গণমাধ্যমকর্মী এবং আলোচকরা ‘পানি’ ও ‘শক্তি’ সম্পদের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় করে পানি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার উপর গুরুত্বারোপ করেন।
‘পানি-শক্তির সঠিক ব্যবহার করি-টেকসই উন্নয়নের ভিত গড়ি’-এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশ সেন্টার ফর এডভান্সড স্টাডিজ-এর নির্বাহী পরিচালক ড. এ. আতিক রহমান অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। অনুষ্ঠানে ‘পানি ও শক্তি’র উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আলোচনা করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মুজিবর রহমান। আরো বক্তব্য রাাখেন স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক ড. এম. ফিরোজ আহমেদ, জিডব্লিউএম এ্যান্ড ফিজিবিলিটি স্টাডি অব ১৪৬ পৌরসভা, ডিপিএইচই টিম লিডার, এমাদুদ্দিন আহমেদ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এর প্রধান প্রকৌশলী মো. নুরুজ্জামান, এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেল্থ এর নির্বাহী পরিচালক এসএমএ রশীদ প্রমুখ। অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ তথ্যকেন্দ্রের ঢাকাস্থ প্রতিনিধি মো. মনিরুজ্জামান জাতিসংঘ মহাসচিব বান-কি মুন-এর বিশ্ব পানি দিবস উপলক্ষে দেয়া বাণী উপস্থাপন করেন।
অনুষ্ঠানে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী পানি ও জ্বালানিসহ অন্যান্য শক্তি-সম্পদের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী শক্তি-সম্পদের ব্যবহার ৪৯ ভাগ বৃদ্ধি পাবে। ২০৫০ সালের মধ্যে শক্তি-সম্পদ উত্পাদনে পানির চাহিদা ১১ দশমিক ২ ভাগ বাড়বে। একইসাথে আগামী ৪০ বছরে পানির সার্বিক চাহিদা বাড়বে ৫০ ভাগ। অতএব এই পরিস্থিতিতে সে সব দেশেরই উন্নয়নের চাকা সচল থাকবে যারা এই দুই সম্পদের সমন্বিত ব্যবস্থাপনা করতে পারবে। আর যারা তা পারবে না তারা ভয়াবহ সংকটের মধ্যে পড়বে।
আলোচনায় উল্লেখ করা হয়, শিল্প উত্পাদন কাজে ব্যবহারের জন্য যে পানি উত্তোলন করা হয় তার ৭৫ ভাগ পণ্য উত্পাদন প্রক্রিয়ার একটি অংশ হিসাবে জ্বালানিসহ অন্যান্য শক্তি উত্পাদন কাজে ব্যবহূত হয়। অথচ এই কারখানাগুলো থেকে নির্গত তরল বর্জ্য কোনরকম পরিশোধন ছাড়াই বিভিন্ন জলাশয়ে পড়ছে। ঢাকায় অবস্থিত বুড়িগঙ্গা দেশের সবচেয়ে দূষিত নদী।
বক্তারা বলেন, ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক প্রতিকূলকার শিকার এবং বিভিন্ন দুর্গম ও পিছিয়ে পড়া অঞ্চলে বিদ্যুত্, জ্বালানি, তেল, গ্যাসসহ সকল প্রকার শক্তি সম্পদের প্রকট অভাব নিরাপদ পানি সংকটকে তীব্র করেছে।
অন্যদিকে বিশুদ্ধ জীবন ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের প্রয়োজনে নদ-নদী, খাল-বিল, হাওড়-বাঁওড় ও জলাধার রক্ষার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলন। তারা বলেছেন, শিল্পবর্জ্যের দূষণ থেকে নদী রক্ষায় শিল্প-কারখানায় ২৪ ঘণ্টা ইটিপি চালু রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। তাছাড়া মানবসৃষ্ট বর্জ্য ও শিল্পঘন অঞ্চলের বর্জ্য পরিশোধনের জন্য ‘সেন্ট্রাল ইটিপি’ স্থাপন করতে হবে।
শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলন (বিএএনএ) আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তারা এসব দাবি জানান। সংগঠনের সভাপতি অধ্যাপক আনোয়ার সাদত এর সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন সহসভাপতি অ্যাডভোকেট আমিনুল হক টুটুল, সাধারণ সম্পাদক মো. মনির হোসেন, যুগ্ম সম্পাদক মনোয়ার হোসেন রনি, যুগাম মহাসচিব আব্দুল্লাহ আল মামুন, ডা. বোরহান উদ্দিন অরণ্য প্রমুখ।
