দক্ষিণাঞ্চলে বেহাল নৌপথ

আপডেট : ২২ মার্চ ২০১৪, ২৩:০০
দক্ষিণাঞ্চলের ৩ হাজার কিলোমিটার নৌপথ মরণফাঁদে রূপ নিয়েছে। ১৪শ’ কিলোমিটার নৌপথ নাব্যতা হারিয়ে এখন নৌযান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। নাব্যতা সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে এ অঞ্চলের ২৮টি নৌ-রুট। আরো তিনটি রুট বন্ধ হওয়ার উপক্রম। ১৫ মার্চ থেকে বর্ষা মৌসুম শুরু হলেও নাব্যতা সংকটে নৌযান চলাচল মারাত্মক ভাবে ব্যাহত হচ্ছে, জানিয়েছেন নৌযান চালকরা। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্নস্থানে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম নৌপথ। বিভাগের ৬টি জেলা ও ৪০টি উপজেলার কয়েক কোটি মানুষকে যাতায়াত করতে হয় নৌপথে। নৌ-রুট রয়েছে ৮৮টি। এরমধ্যে শীত ও শুষ্ক মৌসুমে ২৮টি রুটে লঞ্চ চলাচল করতে পারে না। ৩৮টি রুটে ডাবল ডেকার লঞ্চ চলাচল করে। বাকি অভ্যন্তরীণ রুটগুলোতে চলাচল করে ‘এমএল’ টাইপ লঞ্চ। বিআইডব্লিউটিএ’র হিসেবে প্রতিদিন গড়ে লক্ষাধিক লোক এসব রুটে যাতায়াত করে। প্রতিবছর শুকনো মৌসুমে ১৪শ’ কিলোমিটার নৌপথই থাকে চলাচলের অনুপযোগী। নাব্যতা সংকটের কারণে ৫টি নদীর প্রায় ৩৫ কিলোমিটার এলাকায় নৌ-চলাচল বলতে গেলে বন্ধ হয়ে গেছে। বিআইডব্লিউটিএ জানায়, ‘এমএল’ টাইপ লঞ্চ চলাচলের জন্য কমপক্ষে ৮/৯ ফুট পানি প্রয়োজন, ডাবল ডেকার লঞ্চের জন্য প্রয়োজন ১৪/১৫ ফুট পানি। কিন্তু গত ডিসেম্বর মাস থেকে অব্যাহতভাবে দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীতে পানি কমতে থাকে। কীর্তনখোলা, লোহালিয়া, বিষখালী, পায়রা, নিশিন্দা, ইলিশা, কালাবদর, তেঁতুলিয়া, গণেষপুরা, সন্ধ্যা, সুগন্ধা, আড়িয়াল খাঁ, ঝুনাহার, ধানসিঁড়ি ও পালরদী নদীর পানি কমে গেছে, নদীতে জেগে উঠেছে চর। বরিশাল থেকে ঢাকাগামী ভাষানচর ও চরনাইন্দাসহ মেহেন্দিগঞ্জের কয়েকটি চ্যানেলের অবস্থা খুবই নাজুক। বন্ধ হওয়ার উপক্রম বরিশাল-ভোলা নৌ-রুট। ঐ রুটের সাহেবেরহাট ও লাহারহাট পয়েন্টে নাব্যতা কমে যাওয়ায় দুধল, দাঁড়িয়াল, বাকেরগঞ্জ, চরামদ্দি, বলাইকাঠী, চন্দ মোহন, বুখাইনগর, মেহেন্দিগঞ্জ রুটের লঞ্চ চলাচল বন্ধ হতে চলেছে। বরিশাল-ভোলা রুটের লঞ্চগুলোকে বিকল্প পথে লাহারহাট অথবা চরমোনাই হয়ে যাতায়াত করতে হয়। ঢাকা-বরিশাল রুট কিংবা বরিশাল-চট্টগ্রাম রুটের জন্য নেই কোন বিকল্প চ্যানেল। ফলে এসব রুটের বড় নৌযানকে জোয়ার-ভাটার উপর নির্ভর করে যাতায়াত করতে হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআইডব্লিউটিএ’র এক শীর্ষ কর্মকর্তা ইত্তেফাককে জানান, শুধু দক্ষিণাঞ্চলের ১৪শ’ কিলোমিটার নয়, সারাদেশে ২৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ’র অধীন থাকা ৭টি ড্রেজারের সাথে দু’ বছর পূর্বে নতুন তিনটি ড্রেজার বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান জানান, দেশে বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট ১৯টি ড্রেজার রয়েছে। নদীর যে অবস্থা তাতে নাব্যতা ধরে রাখার জন্য আরো দ্বিগুণ ড্রেজার প্রয়োজন। সরকারের আরো ১০টি ড্রেজার কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। বরিশাল নৌ-বন্দরে ডুবোচর বরিশাল বন্দরঘাট সংলগ্ন কীর্তনখোলা নদীতে প্রায় অর্ধ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ডুবোচরের সৃষ্টি হয়েছে। আধুনিক নৌ-বন্দর টার্মিনাল ঘেঁষে এ ডুবোচর জেগে উঠার কারণে যাত্রীবাহী নৌযানে ঘাটে নোঙ্গর করা ও ছেড়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ২০০৮ সাল থেকে ঐ এলাকা নৌযান চলাচলের উপযোগী করার জন্য প্রতিবছর ড্রেজিং করতে হয়। শীতকালে ড্রেজিং করার পর বর্ষাকালে পলি পড়ে জমাট হয়ে আবার দেখা দেয় নাব্যতা সংকট। ড্রেজিং করতে বিআইডব্লিউটিএ’র কোটি কোটি টাকা খরচ হলেও কীর্তনখোলার নাব্যতা ধরে রাখা যাচ্ছে না। নৌযান চালকরা অভিযোগ করেন, প্রতিবছর শীত মৌসুমে নামেমাত্র লোক দেখানো ড্রেজিং করা হয়। এ কারণেই সমস্যার সমাধান হয় না। ড্রেজার দ্বারা নদীর বালু কেটে আবার পানিতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। খনন করা বালি স্থলভাগে তুলে ফেলতে পারলে হয়ত সংকট নিরসন করা সম্ভব হতো। জোয়ার-ভাটার উপর নির্ভর করে যাত্রীবাহী লঞ্চগুলোকে ঘাটে নোঙ্গর করতে হয় আবার সেভাবেই যাত্রী নিয়ে গন্তব্যে রওয়ানা হতে হয়।