ঈদের আগে বেতন-ভাতা নিয়ে শ্রম অসন্তোষের শঙ্কা রয়েছে, এমন ৫ শতাধিক গার্মেন্টস কারখানার তালিকা করেছে সরকার। শিল্পাঞ্চল পুলিশ ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এ তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২০টি কারখানাকে বিশেষ নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে। শ্রম মন্ত্রণালয়, শিল্পাঞ্চল পুলিশ ও পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সমন্বিতভাবে এ নজরদারি ও তদারক করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শ্রম অসন্তোষপ্রবণ কারখানার বেশিরভাগই অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের। এসব কারখানা মূলত সাব কন্ট্রাক্ট বা ঠিকাভিত্তিতে পোশাক তৈরির ক্রয়াদেশ নেয়। এর মধ্যে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ’র বাইরেও বেশকিছু পোশাক কারখানা রয়েছে। রয়েছে টেক্সটাইল কারখানাও।
চলমান পরিস্থিতিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও শ্রম মন্ত্রণালয়ে গত দুই সপ্তাহে আলাদা আলাদা একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষ গতকালও শ্রম মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গঠিত ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কোর কমিটি ঈদের আগে বেতন-বোনাস পরিশোধের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করেছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এদিকে গতকালও মানিকগঞ্জ জেলায় বিউটিফুল জ্যাকেট লিমিটেড নামে আকস্মিক বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি গার্মেন্টসের পাওনা পরিশোধের দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন শ্রমিকরা। পরবর্তীতে তারা সেখান থেকে শ্রম মন্ত্রণালয় ঘেরাও করেন। সূত্র জানিয়েছে, ঈদ কেন্দ্রিক অসন্তোষ ঠেকাতে করণীয় ঠিক করতে আজ বৃহস্পতিবার ফের বৈঠকে বসছে শ্রম মন্ত্রণালয়।
শিল্পাঞ্চল পুলিশের মহাপরিচালক আব্দুস সালাম ইত্তেফাককে বলেন, প্রাথমিকভাবে ৬৭৪টি কারখানাকে তদারকির জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। গত কয়েকদিনে বেশকিছু কারখানার সমস্যা সমাধান করা হয়েছে। আশা করছি ঈদের সব সমস্যাই সমাধান হয়ে যাবে।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলাপ করে প্রায় ২০টি কারখানার নাম জানা গেছে, যেখানে শ্রমিকের পাওনা নিয়ে এখনো সমস্যার সমাধান হয়নি। এর মধ্যে কিছু কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, কিছু কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে। জাতীয় গার্মেন্টস ঐক্য ফোরামের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার ইত্তেফাককে বলেন, এবার অতীতের চেয়ে ‘ঝামেলা’ বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণার পর এবার প্রথম ঈদ। এছাড়া জুনের শুরুর দিকে ঈদ হওয়ায় চলতি মাসের বেতন পরিশোধ নিয়ে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক ইত্তেফাককে বলেন, আমরা আশঙ্কা করছি, শতাধিক কারখানা ঈদের আগে শ্রমিকের পাওনা পরিশোধ করতে পারবে না। গত তিন সপ্তাহে ২২টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আরো ৩০টি কারখানা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। যে কোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে কোনো শ্রমিক ঈদের আগে বেতন না পেয়ে অভুক্ত অবস্থায় বাড়ি যাবে— তা দেখতে চাই না। এ লক্ষ্যে তাদের নানামুখী উদ্যোগের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সম্প্রতি একটি কারখানার মালিককে তিন দিন আটকে রেখে মেশিনপত্র বিক্রি করে ওই কারখানার শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করা হয়েছে। এছাড়া কোনো কারখানায় অসন্তোষের আলামত দেখা গেলে শিল্পাঞ্চল পুলিশের সঙ্গে যোগযাযোগ রক্ষার জন্য প্রযুক্তির সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে।
বেতন-বোনাস নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে এ তলিকায় রয়েছে গাজীপুরের ইন্ট্রামেক্স গার্মেন্টস, ওয়ার্কফিল্ড নিটওয়্যার, উত্তরার এম কে এম গার্মেন্টস, খিলগাঁওয়ের সিসিলি গার্মেন্টস, রামপুরা এলাকার ড্রাগন সোয়েটার, কুমিল্লা চৌদ্দগ্রাম এলাকার ড্রাগন সোয়েটার, আতিক গার্মেন্টস। এছাড়া আশুলিয়ার ডংলিয়েন লিমিটেড, সেঞ্চুরি জ্যাকেট, গাজীপুরের ডেকো ও ডেবা গার্মেন্টস, স্পিড লিমিটেড, শাদাতিয়া সোয়োটার, ফোর এইচ গার্মেন্টস, মদিনা সোয়েটারের একটি ইউনিট, টিএনএইচ অ্যাপারেল, স্প্রিং ট্রেড লিমিটেডসহ আরো কয়েকটি কারখানায় পাওনা নিয়ে বর্তমানে সমস্যা রয়েছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি।
ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিল এক বিবৃতিতে আগামী ২৫ মে’র মধ্যে শ্রমিকদের চলতি মাসের বেতন ও ঈদ বোনাস দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। শ্রম আইন অনুযায়ী, মাস শেষ হওয়ার পর সাত কার্যদিবসের মধ্যে পূর্বের মাসের পাওনা পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু আগামী ঈদের আগে মাস শেষ হলেও সাত কার্যদিবস শেষ না হওয়ায় অনেক শ্রমিক চলতি মাসের বেতন পাবেন না। এ নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিতে পারে বলেও মনে করছেন শ্রমিক নেতারা।
