ফর্মহীনতাই এই অবস্থার জন্য দায়ী

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০১৪, ২২:০৬
জাতীয় দলের অধিনায়ক, ম্যানেজার, বোর্ড পরিচালক; নানা ভূমিকাতেই ক্রিকেট দলকে কাছ থেকে দেখেছেন। বাংলাদেশের ক্রিকেটের সঙ্গে খেলোয়াড়-সংগঠক সব রূপেই জড়িত আছেন ও ছিলেন। সেই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে এখন দলের খেলা দেখছেন খোদ দর্শক হিসেবে। এই দেখা থেকেই জাতীয় দলের বর্তমান সংকট, সমস্যা ও সমাধান নিয়ে কথা বলেছেন গাজী আশরাফ হোসেন লিপু। দৈনিক ইত্তেফাককে দেয়া একান্ত সাক্ষাত্কারে অনেক বিষয়েই খোলামেলা কথা বলেছেন লিপু। সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন দেবব্রত মুখোপাধ্যায় হঠাত্ করেই বাংলাদেশ দল যেন একটা বিপর্যয়ের চক্রে পড়ে গেছে। কারণটা কী বলে মনে হচ্ছে? হয়কি, যে কোনো দলই ভালো সময়, খারাপ সময়ের ভেতর থেকে যেতে পারে; যায়ও। কিন্তু একটা দলের যখন শীর্ষ কয়েকজন খেলোয়াড় এক সঙ্গে আউট অব ফর্ম হয়ে পড়ে, তখন টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে খেলাটা অন্য যে কোনো ফরম্যাটের চেয়ে কঠিন হয়ে পড়ে। শীর্ষ খেলোয়াড়দের, যারাই মূলত আপনাকে ম্যাচ জেতায়, তাদের ফর্মহীনতা নিয়ে এই ফরম্যাটের বিশ্বের সেরা দলগুলোর মুখোমুখি হওয়াটাই আসলে খুব কঠিন। এরকম একটা টুর্নামেন্টে খেলতে হলে আপনাকে এমনিতেই সেরা খেলোয়াড়দের ফর্মে থাকা লাগবে। কারণ এখানে আপনি খেলবেন বিশ্বসেরা দলগুলোর বিপক্ষে। সমস্যাটা তাহলে শুধুই শীর্ষ খেলোয়াড়দের ফর্মহীনতা? একটা টিম হিসেবে খেলতে না পারার মতো কিছু কি ঘটছে? দেখুন, এটা তো মানতেই হবে যে, আমাদের দলে ধরুন কুমার সাঙ্গাকারা, মাহেলা জয়াবর্ধনে বা অন্য কারো কথা যদি বলি, ওরকম সুপার স্টার নেই; যারা কি না যে কোনো পরিস্থিতিতে ম্যাচ বের করে আনতে পারবে। দলের খারাপ সময়ও এ রকম একজন দু’জন খেলোয়াড় দলকে বের করে আনতে পারে। এরকম কেউ না থাকায়, আমাদের সব সময়ই একটা কালেক্টিভ পারফরম্যান্স প্রয়োজন হয়। এসব সময়ই টিম হয়ে খেলাটা বেশি জরুরি হয়। এ জন্যই দেখবেন, আমরা কথায় কথায় বলি, সবার সেরাটা না দিলে জিততে পারবো না। এখন সবার সেরাটা একসঙ্গে পাওয়া যাবে না, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের যে কয়েকজন এক সঙ্গে সেরাটা দিলে ম্যাচ জিতি আমরা, তারাও আবার ফর্মে নেই। তাহলে আমাদের ওরকম শীর্ষ পর্যায়ের খেলোয়াড় নেই বলেই বলছেন? তা তো মেনে নিতেই হবে। আন্তর্জাতিক বাকি দলগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে, সব কিছু বিবেচনায় নিলে সে রকম দক্ষতা আছে, এমন খুব বেশি খেলোয়াড় আমাদের নেই; দু একজন হয়তো আছে। সেই সঙ্গে আরেকটা ব্যাপার আমাদের অভাব আছে আমাদের—কার্যকর অলরাউন্ডার। অনেক দল আছে, যারা অনেক বড় খেলোয়াড় ছাড়াও নিয়মিত ভালো ফল পায় কার্যকর অলরাউন্ডারদের ওপর ভর করে। আমাদের সে রকম কেউ নেই। কেউ কেউ বলছেন, প্রধান সমস্যাই আসলে দলের খেলোয়াড়রা খুব ব্যক্তিকেন্দ্রিক। তারা নিজের পারফরম্যান্স নিয়েই ভাবেন... তা যদি হয়ও, তারপরও আমরা এই সীমাবদ্ধতা নিয়েই তো খেলেছি। দলের বন্ডিং যেমনই থাক, এই খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সেই তো আমরা রেজাল্ট পেয়েছি। মুশকিল হলো, এক সঙ্গে তারা এতো জন ফর্ম হারিয়ে ফেলাটা তো সামাল দেয়া কঠিন। আমার মনে হয়, এ জন্য আসলে একটু পরিকল্পনারও সমস্যা আছে। পরিকল্পনার সমস্যাটা কোথায় ছিল, একটু বলবেন? আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেটটা আসলে ঠিক এশিয়া কাপ ও বিশ্বকাপ মাথায় রেখে আয়োজন করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। এই দুটো বড় টুর্নামেন্টের আগে এনসিএল, বিসিএল, ঢাকা লিগ এবং কিছু বিসিবির আয়োজন মিলিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ছেলেরা টানা খেলেই যাচ্ছে। এটা আমার কাছে মনে হয়েছে, ক্রিকেটারদের খুব ক্লান্ত করে ফেলেছে। আমাদের ক্রিকেটারদের শারীরিক সামর্থ্যের কথা মাথায় রাখতে হবে। এই যে ইনজুরি নিয়েও মুশফিক, মাশরাফিকে খেলে যেতে হচ্ছে; এটা টানা ক্রিকেটের ফল বলেই মনে হচ্ছে। এমনও লেখা হচ্ছে যে, কোচ-অধিনায়ক খারাপ পারফরম্যান্সের জন্য প্রতিষ্ঠিত খেলোয়াড়দের কাছে জবাব চাইতে পারছেন না। এটা কী তাদের অথরিটির অভাব? এটা শুনে আমি অবাক হয়েছি। এটাই তো প্রক্রিয়া। এটা করতে সমস্যা কেন হবে? অধিনায়ক-কোচ খেলোয়াড়দের কাছে জবাব চাইবেন, বোর্ড অধিনায়ক-কোচের কাছে জবাব চাইবেন, দেশের মানুষ বোর্ডের কাছে জবাব চাইবেন; এটাই স্বাভাবিক। এখানে কোথাও সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবে এটা ঠিক যে, সম্প্রতি কিছু ব্যাপারে আমার মনে হচ্ছে আলাপ আলোচনাটা একটু কম হচ্ছে। অন্তত দল গঠন নিয়ে কোচ-অধিনায়কের সঙ্গে আরও পরিষ্কার থাকা উচিত। বিশেষ করে একটা বড় টুর্নামেন্টে তো এটা খুব জরুরি। দ্বিপাক্ষিক সিরিজে প্রতিপক্ষ কেমন হবে, জেনে আপনি একটা দল করেই ফেলতে পারেন। কিন্তু এখানে আপনার নানা ধরনের বৈচিত্র্যময় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলতে হবে। ফলে দলের ভারসাম্যটা সঠিক না হলে পারফরম্যান্সে তার প্রভাব পড়ে। আবার অধিনায়ক যে প্রকাশ্যে এর প্রতিক্রিয়া দেখালেন, সেটাও নিশ্চয়ই ঠিক হয়নি? অবশ্যই। এটা নিয়ে প্রকাশ্যে বলাটা তার ঠিক হয়নি। আবার অধিনায়কও পত্রিকায় দল জানবেন, এটাও ঠিক না। আসলে আমি বুঝতে পারি না, কেন এই যোগাযোগ ও বোঝাবুঝিজনিত সমস্যা আমাদের দলে থাকবে। ক্রিকেটারদের নিজেদের মধ্যে, বোর্ডের সঙ্গে, কর্মকর্তাদের সঙ্গে; সবার সঙ্গে সবার দারুণ সম্পর্ক থাকারই কথা। আমাদের তো বড় বড় দেশের মতো আঞ্চলিকতার সমস্যা নেই। ফলে আমাদের কেন এমন হবে! এখন এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী? এই টুর্নামেন্টেই আরও বড় তিনটে দলের সঙ্গে তো অন্তত খেলতে হবে... একটা দরকার যেটা, রাতের ম্যাচে উইকেটটা আরেকটু ব্যাটিং সহায়ক পাওয়াটা ব্যাটসম্যানদের আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার জন্য খুব জরুরি। আরেকটা ব্যাপার হলো, টপ অর্ডার ফর্মে আছে, এটা ভালো দিক। তাদের এখন দায়িত্বটাও বেশি নিতে হবে, ঝুঁকি কম নিতে হবে। তাদের বুঝতে হবে, ব্যাটসম্যানরা ফর্মে নেই। ফলে যা করার তাদের করে আসতে হবে।