স্মরণীয় যারা বরণীয় যারা

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০১৪, ২১:০৭
আলবার্ট আইনস্টাইন আমাদের কাছে যতটা পরিচিত, সত্যেন্দ্রনাথ বসু ততটা নন। কারণ প্রচার মাধ্যমে আইনস্টাইন সুযোগ পেয়েছেন সত্যেন বসুর চেয়ে বেশি। তাছাড়া স্বদেশী বিজ্ঞান সাধকের প্রতি আমাদের উত্সাহ বরাবরই কম। এ আমাদেরই দীনতা। তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের কিছু কিছু বিষয়ে সত্যেন বসুর অবদান আইনস্টাইনের অবদানের চেয়ে বেশি। ‘বোস-আইনস্টাইন’ তত্ত্বের আলোচনায় সত্যেন বসুর নামের ঠিক পরেই আইনস্টাইনের নাম উচ্চারিত হয়। কিন্তু বিশ্ব-বিখ্যাত এই তত্ত্বের প্রায় পুরো কৃতিত্বই সত্যেন বসুর। আইনস্টাইন সত্যেন বসুর মূল গবেষণাপত্রটি ইংরেজি থেকে জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন ১৯২৪ সালে এবং প্রকাশের সময় সত্যেন বসুর সাথে নিজের নামটাও যোগ করে দিয়েছিলেন। অবশ্য এটাও ঠিক যে সত্যেন বসুর নামের সাথে নোবেল বিজয়ী আইনস্টাইনের নাম যুক্ত না হলে হয়তো সত্যেন বসুকে যতটুকু সম্মান আজ দেয়া হয় তাও দেয়া হতো না। যেমন বেতার-তরঙ্গ সংক্রান্ত গবেষণা ও আবিষ্কারের জন্য জগদীশচন্দ্র বসুর প্রাপ্য সম্মান তাঁকে দেয়া হয়নি। আলোর মৌলিক কণা ফোটন, হিলিয়াম নিউক্লিয়াস বা আলফা পার্টিক্যল ইত্যাদি ‘বোস-আইনস্টাইন সংখ্যায়ন তত্ত্ব’ (Bose-Einstein Statistics) মেনে চলে। এ ধরণের কণাগুলো সত্যেন বসুর নামানুসারে ‘বোসন’ (Boson) নামে পরিচিত। কী অসাধারণ মৌলিক আবিষ্কারের বিনিময়ে এরকম স্বীকৃতি পাওয়া যায় তা বলাই বাহুল্য। আইনস্টাইন নিজেই সত্যেন বসুর কাজ সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন “এক কথায় অসাধারণ”। বিজ্ঞান বিশ্বের এই অসাধারণ পণ্ডিত সত্যেন্দ্রনাথ বসু খুব সাধারণ বাঙালি পরিবারের সন্তান ছিলেন। ১৮৯৪ সালের ১লা জানুয়ারি উত্তর কলকাতার গোয়াবাগান অঞ্চলে ঈশ্বর মিত্র লেনের পৈত্রিক বাড়িতে তাঁর জন্ম। বাবা সুরেন্দ্রনাথ বসু, মা আমোদিনী দেবী। সুরেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন রেলওয়ের হিসাব রক্ষক। নর্মাল স্কুলে প্রাথমিক ও হিন্দু স্কুলে মাধ্যমিক শিক্ষা লাভ করেন সত্যেন্দ্রনাথ। ১৯১৪ সালে এম-এস-সি পরীক্ষার আগে সত্যেন বসু ডাক্তার যোগেন্দ্রনাথ ঘোষের মেয়ে ঊষাবতী দেবীকে বিয়ে করেন। ১৯১৫ সালে এম-এস-সি পরীক্ষায় মিশ্র গণিতে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। বিদেশে গিয়ে পড়ালেখা করার ইচ্ছে সত্যেন বসুর ছোটবেলা থেকেই ছিল। এম-এস-সি’তে রেকর্ড পরিমাণ নম্বর পাবার পর তাঁর শিক্ষক প্রফেসর ডি এন মল্লিক সস্নেহে ডেকে বললেন, “এত বেশি নম্বর পেয়েছ পরীক্ষায়, বড় বেমানান লাগছে হে”। সত্যেন্দ্রনাথ ভাবলেন এবার মনে হয় সুযোগ এলো বিদেশ যাবার। কিন্তু হলো না। সে বছর পদার্থবিদ্যা বা গণিতের জন্য কোন বৃত্তি দেয়া হলো না। সবগুলো বৃত্তি পেলো রসায়নের শিক্ষার্থীরা। এত ভালো রেজাল্ট করার পরেও ভালো কোন চাকরির ব্যবস্থা হলো না। কিংবা বলা যায় এত ভাল রেজাল্টের কারণেই কোন চাকরি পাওয়া গেলো না। এত ভাল ছাত্রকে কেউ সাধারণ চাকরি দিতে চান না। চাকরির জন্য দরখাস্ত করতে করতে ক্লান্তি এসে গেল। নিজের পড়াশোনাটা আবার শুরু করার কথা ভাবছেন। এ সময় কলকাতার সায়েন্স কলেজে রসায়নে গবেষণা করছেন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, ডঃ প্রফুল্ল মিত্র প্রমুখ। সত্যেন বসু কেমিস্ট্রি পড়েন নি। ভাবছেন কী করা যায়। এদিকে জগদীশ বসু তখন পদার্থবিদ্যার গবেষণা থেকে সরে গিয়ে উদ্ভিদবিদ্যার দিকে ঝুঁকেছেন। উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখার্জির আহবানে সায়েন্স কলেজে ফলিত গণিতের অধ্যাপক পদে যোগ দিয়েছেন ডঃ গণেশ প্রসাদ। উনি জার্মানি থেকে ডঃ কাইনের কাছে গবেষণা করে এসেছেন। সত্যেন বসু একদিন হাজির হলেন ডঃ গণেশ প্রসাদের কাছে। সত্যেন বসুর এম-এস-সি থিসিসের পরীক্ষক ছিলেন ডঃ প্রসাদ। পরীক্ষার খাতায় অত্যন্ত কম নম্বর দেয়া এবং পরে কম নম্বর পেয়েছে বলে ছাত্রদের খোঁচা দেয়া ছিল তাঁর স্বভাব। কিন্তু সত্যেন বসুর থিসিসে খুব কম নম্বর দেয়া সম্ভব হয়নি তাঁর পক্ষেও। তাই ডঃ প্রসাদ তাঁর স্বভাব-খোঁচাটা দিতে পারলেন না সত্যেন বসুকে। বিশ্বনন্দিত বিজ্ঞানী আইনস্টাইন সত্যেন বসুর প্রতিভাকে চিনতে ভুল করলেন না। তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রবন্ধটি জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে ‘সাইটশ্রিফ্ট ফ্যুর ফিজিক’ (Zeits Fur Physik) জার্নালে নিজের মন্তব্য সহ প্রকাশের ব্যবস্থা করলেন। সত্যেন বসুর প্রবন্ধ সম্পর্কে আইনস্টাইন লিখলেন, “আমার মতে বোস কর্তৃক প্ল্যাঙ্কের সূত্র নির্ধারণ পদ্ধতি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ”।জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত কাজের মধ্যে অতিবাহিত করেছেন প্রফেসর সত্যেন্দ্রনাথ বসু। মৃত্যুর আগের দিনও তিনি প্রাইম নাম্বার নিয়ে গবেষণা করেছেন। ১৯৭৪ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন সত্যেন বসু। সংগৃহীত