অটিস্টিক শিশু ও তার মা

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০১৪, ২১:০৯
আগামী ২ এপ্রিল বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস। অটিজম শিশু হল বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু। যারা অন্য স্বাভাবিক শিশুদের চেয়ে মানসিক বিকাশে, বুদ্ধিমত্তায় কিছুটা পিছিয়ে থাকে। আমাদের দেশে অনেক পরিবারে আছে এমন শিশু। তাই আমরাও পালন করি দিবসটি। কোন পরিবারে এমন শিশু এলে সেই পরিবারকে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। মায়েদের পোহাতে হয় নানা দুর্ভোগ, সইতে হয় বৈষম্য। দিবসটিকে সামনে রেখে তিনজন মা জানাচ্ছেন তাদের কথা— বিশেষ মা হয়ে ওঠার লড়াই —সুলতানা সেলিনা রূপা রাকিনের মা নদীর স্রোত চলতে চলতে হঠাত্ যেমন বাঁক নেয় তেমনি করেই আমার জীবনটাও চলতে চলতে হঠাত্ বাঁক নিল যেদিন জানলাম আমার বড় সন্তান রাকিন ‘অটিজম’ এ আক্রান্ত। রাকিনের সাড়ে তিন বছর বয়সে আমি জানতে পারলাম আমার আদরের সোনামনি ‘অটিস্টিক চাইল্ড’ বা একজন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু। সেই তখন থেকেই শুরু হল আমার এক ভিন্ন রকম জীবন-যাপন। শুরু হল জীবন-যাপনের গতানুগতিক ধারা থেকে বের হয়ে এসে একজন বিশেষ শিশুর একজন ‘বিশেষ মা’ হয়ে ওঠার লড়াই। ডাক্তার বললেন, রাকিনকে কোন বিশেষ স্কুলে পাঠানোর কথা। স্কুলের নাম ও ঠিকানা যেসব পেলাম সবই লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর এ সব এলাকায়। জন্মসূত্রে ও পরবর্তিতে বৈবাহিক সূত্রে আমার বসবাস ছিল পুরানো ঢাকায়। স্বামীর কর্মস্থলও সেখানে। যানজটের শহরে ছেলেকে নিয়ে এতদূর স্কুলে ভর্তি করাবো, কিভাবে নিয়ে যাব? বাসায় আমার ছোট সন্তান যার বয়স তখন মাত্র দেড় বছর। ওকে কে দেখবে? এসব নানা প্রশ্নের সমাধান খুঁজতে খুঁজতে কেটে গেল আরো ছয়টি মাস। রাকিনের চার বছর বয়সে আমি ওকে লালমাটিয়ার ‘স্কুল ফর গিফটেড চিল্ড্রেন’ নামের একটি বিশেষ স্কুলে ভর্তি করলাম। শুরু হল এক নতুন জীবন— এক নতুন লড়াই। দুই বছরের ছেলেকে এক কাজের মেয়ের কাছে রেখে প্রায় সাতটি ঘন্টা (চার ঘন্টা স্কুল ও আসা-যাওয়া প্রায় তিন ঘন্টা) আমাকে বাইরে থাকতে হত। একদিন আমাকে আমার এতো দিনের বাস ভেঙ্গে ফেলতে হবে। নতুন জায়গায় নতুন করে জীবন-যুদ্ধ শুরু করতে হবে। সেই পরিবর্তনের জন্যও আমাকে লড়তে হয়েছে। স্বামীকে বোঝাতে হয়েছে। তার পেশাগত কাজে অনেক সমস্যা হবে, এমন কি আমাদের আর্থিক আয়ের ক্ষেত্রেও সেটা প্রভাব ফেলবে তারপরও সে আমাকে সাপোর্ট করেছে। এছাড়া কোন উপায়ও ছিল না। নিজের আত্মীয়-স্বজন, মা, ভাই-বোন সবাইকে ছেড়ে, নিজের বাড়ি ছেড়ে চলে এলাম নতুন জায়গায়। দুই ছেলেকে নিয়ে এখন আমার ব্যস্ত জীবন। সব কিছুই আমার সিদ্ধান্তে হয়েছে। তবুও কোথায় যেন একটা শূন্যতা। এত ব্যস্ততার মাঝেও নিজেকে বড় একা মনে হয়। তখন রাকিনের দিকে তাকিয়ে থাকি আর মনে মনে বলি ‘বাব তুই আমার জীবনটা এভাবে পাল্টে দিলি?’ জীবনে চলার পথে মানুষের নানা রকম বিপদ আসে, অসুখ-বিসুখ হানা দেয়, তখনই প্রয়োজন হয় আপনজনের। যারা হাত বাড়িয়ে দেয়। আমার আপনজনদের সেই হাতগুলো আমার কাছ থেকে অনেক দূরে চলে গেছে। তবুও জীবন থেমে থাকে না। ০০০০০০০০০০০০০০০০০০ ধৈর্য নিয়ে কাজ করতে হবে —নাসরিন আহমেদ রাত ২টা নাই, ৩টা নাই হঠাত্ ঝর্ণা ছেড়ে গোসল করা ঘন্টার পর ঘন্টা ঘরের জিনিসপত্র ভাঙ্গা বা ছোঁড়া, দোকান থেকে হাজার হাজার টাকার জিনিস নগদে বা বাকিতে কিনে আনা। তারপরও সেইগুলো ভেঙ্গেচুরে নষ্ট করে আবার নতুন জিনিসের বায়না করা আমার বাচ্চাদের এই সব দেখে কাজের বুয়া বিরক্ত হয়ে চলে যায়। যখন মার বাসা থেকে নিজের আলাদা বাসা নেই, তখন প্রতিবেশীর অভিযোগ আমার বাচ্চারা চিত্কার করে অনেক শব্দ করে। দাপাদাপি করে তারা ঘুমাতে পারে না দিনের বেলায়। বাড়িয়ালাকে দিয়ে অভিযোগ করে ঐ মাসেই বাড়ি ছাড়া করা। তারপর থেকে কোন দিনও একতলা বাসা ছাড়া ভাড়া বাসায় থাকিনি। তখন থেকে ওদের আড়াল করা শুরু করলাম। মানুষ দেখলে আমি ভয় পেতাম না জানি কোনো প্রশ্ন করে বসে এখন। এই রকম জীবনে আরো অনেক নির্মম অভিজ্ঞতা আছে যা আজ লিখতে গিয়ে চোখ জলে ভরে উঠেছে। অনেক ভাবলাম ওদের নিয়ে কি করা যায় কোথায় যাব। কেন আমার দুটো সন্তানই এমন হলো? ওদের সমস্যা কি? এটা কি কোন রোগ? এই নিয়ে কার সাথে কথা বলব? তারপর হঠাত্ একদিন আমার এক পরিচিত আমার বাসায় এসে ওদের আচরণ দেখে আমাকে বলল বিশেষ স্কুলের কথা। সাথে সাথেই অনন্ত ও দুরন্তকে নিয়ে আসলাম। মারুফা আপার সাথে কথা বললাম, অনন্ত ও দুরন্তকে তিনি দেখলেন আর আমাকে বোঝালেন। তারপর আমি ওদের ডায়াগনোসিস করালাম। জানলাম, এই সমস্ত আচরণের কারণ আমার দুটো নয়নের মনি অনন্ত ও দুরন্ত ‘অটিষ্টিক’। মারুফা আপা বললেন একটি অটিষ্টিক শিশুর উন্নতি সফলতা তখনি সম্ভব, যদি শিশুকে দ্রুত সনাক্ত করে সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গঠনমূলক পরিবেশে তাদের দেয়া যায়। এইসব শুনে মনে সাহস ফিরে পেলাম, মনে মনে খোদাকে বললাম এই সমস্ত প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে আমি যেন আমার অনন্ত ও দুরন্তকে একটা সম্ভাবনার ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে পারি। সেই ধৈর্য তুমি আমাকে দাও আল্লাহ। ২০০৬ এ ওদের দুজনকে স্কুল ভর্তি করে দিলাম । শুরু হল আমার বাচ্চাদের নিয়ে আমার নতুনভাবে পথচলা। স্কুল শুরু করল, ওদের সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করা শুরু করলাম বাসায়। আর তখন বুঝতে পারলাম, আমার দুই মেয়ের দক্ষতা গ্রহণ করা না করার সীমাবদ্ধতাগুলো। সেই সমস্যাগুলো নিয়ে আমি এতোদিন বিভিন্ন বিড়ম্বনায় পড়ছিলাম তা কাটিয়ে উঠতে শুরু করলাম। কষ্টের ফল পাওয়া শুরু হল। অনেক কিছু সহজ হয়ে উঠল আমার কাছে। দিন দিন আমি এখন মনে করি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের সনাক্ত করে নেই। আন্তরিকতা, ভালবাসা, ধৈর্য দিয়ে এই শিশুগুলোর সাথে কাজ করলে ওদেরকে উন্নতির প্রান্তে নিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে আমি মনে করি। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের অসীম সহযোগিতা আর ধৈর্য নিয়ে কাজ করতে হবে। ০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০ আমার মেয়ে সাবিহা —জান্নাত আরা সাবিহার জন্ম ৯ ফেব্রুয়ারি ২০০৭। সাবিহার বয়স যখন ৯ মাস তখন আমি লক্ষ্য করি সাবিহা আমার কোনো কথায় সাড়া দেয় না, কোনো আই কনটাক্ট নেই। আমার ২য় মেয়ের যেহেতু হেয়ারিং ইম্পায়ারমেন্ট আছে এ কারণে আমি ভাবি সাবিহার হয়ত একই সমস্যা। এরপর মহাখালীর ‘সাহিক’-এ সাবিহার কানের সব ধরনের পরীক্ষা করে কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি। ওখান থেকে শুধু জানানো হয় সাবিহা ‘অটিজমে’ আক্রান্ত। অটিজম সম্পর্কে আমার কোন ধারণাই ছিল না। এই নামও আগে কখনো শুনিনি। তখন আমি সাবিহাকে শিশু হাসপাতালে ডা. মোস্তাফা মাহবুব-এর কাছে নিয়ে যাই। উনি আমাকে পরামর্শ দেন সাবিহাকে একটি রেগুলার স্কুলে ভর্তি করাতে। তারপর সাবিহাকে সাহিক-এ ভর্তি করান। ওখানে ৩ মাস সময় পর্যন্ত সাবিহা ছিল কিন্তু সাবিহা সেখানে ১ সেকেন্ডের জন্যও স্থির হয়ে ক্লাসে বসেনি, শুধু ছোটাছুটি করতো। তখন আমার মনে হয়েছে, যে বাচ্চা ১ সেকেন্ডের জন্য বসে না, তাকে কিভাবে রেগুলার স্কুলে দেয়া সম্ভব? এমতাবস্থায় আমি সাহিক থেকে দুটি বিশেষ স্কুলের ঠিকানা পেয়ে সেখানে যোগাযোগ করি। এর মধ্যে একটি বিশেষভাবে পরিচিত। কিন্তু সেখান থেকে আমি কোনো আশানুরূপ সহযোগিতা পাইনি। শুরুতে প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে আমাকে জানায় কোনো সিট নেই। পরে উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত একজন প্রস্তাব দেন সাবিহাকে তার বাসায় নিয়ে গিয়ে ব্যবস্থাপনা নেয়ার জন্য। কিন্তু সাবিহার জন্য স্কুল ব্যতিত অন্য কিছু আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। তারপর সাবিহাকে নিয়ে আমি বাসায় প্রচণ্ড সমস্যার সম্মুখীন হই সেগুলো হলো- সাবিহার টয়লেটের কথা বলতো না। যেখানে-সেখানে করে দিত এবং কমোডে বসতো না। যেকোনো কারণে যে কারো চুল ধরে টানতো এবং ছিঁড়ে ফেলতো। বাসা থেকে কেউ বের হলে সাবিহাও চলে যেতে চাইতো এবং কোনোভাবেই ওকে ধরে রাখা যেত না। সারারাত ঘুমাতো না এবং কান্নাকাটি করতো। কোলে নিয়ে সারারাত ঘুরতে হতো। প্রচণ্ড শীতের মধ্যেও পাতলা নিমা পরে থাকত। একটা জামা যতদিন পর্যন্ত না ছিঁড়ত বা নষ্ট হত, ততদিন পর্যন্ত চেঞ্জ করতো না। হাতে সবসময় কোনো না কোনো জিনিস ধরে রাখতে চাইত। যেমন: কাঁটা চামচ, মার্কার, চিরুনী, ব্রাশ। রাতে ঘুমানোর সময়ও জিনিসগুলো হাতছাড়া করতো না। একটা মার্কার সাবিহা টানা ২ বছর যাবত্ হাতে রেখেছিল। একজোড়া জুতা দীর্ঘদিন পরে থেকেছে, এমনকি ঘুমের সময়েও। দাঁত ব্রাশ, নখ কাটা, চুল আচড়ানো ও চুল কাটাতে ছিল প্রচণ্ড সমস্যা। নিজ হাতে খাবার খেতে পারতো না এবং ক্ষুধার ব্যাপারটা অনুভব করতে পারতো না, শুধু কান্না করতো। ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে সাবিহাকে একটি বিশেষ স্কুলে ভর্তি করি। স্কুলে ভর্তির পর প্রথম দুই মাস পর্যন্ত সাবিহা ক্লাসে ঢুকতে চায়নি। আমি সাবিহাকে নিয়ে দোলনায়, বারান্দায়, স্লিপারে বসে থাকতাম। সাবিহার বাবা ভাবতো প্রতিমাসে এতোগুলো টাকা সাবিহার স্কুলের জন্য খরচ হয় তাহলে এত অল্প সময় কেন সাবিহা স্কুলে থাকছে। বর্তমানে স্কুলের সার্বিক সহযোগিতায় সাবিহা এখন নিয়মিত ক্লাস করছে এবং বর্তমানে সাবিহার টয়লেট ট্রেনিং হয়েছে। নিজ হাতে খেতে পারে এবং খাওয়ার পরে প্লেট পরিষ্কার করে গুছিয়ে রাখার বিষয়টিও বোঝে। সবশেষে সকল মায়েদের উদ্দেশ্যে আমি একটি কথা বলতে চাই, তা হল বাচ্চার উন্নতি হচ্ছে না বা কবে আমার বাচ্চা কথা বলবে অথবা কখন একটি নিয়মিত স্কুলে যাবে ভেবে অস্থির হয়ে এই স্কুল থেকে ঐ স্কুলে বার বার স্কুল পরিবর্তন না করে আপনারা ধৈর্য ধরে বাচ্চাকেও সময় দিন শিখতে ও বিশ্বাস অর্জন করতে।