চৈত্রের এই সময়ে বাইরে বের হওয়া মানে গরমে জীবন অতিষ্ঠ। তবুও প্রয়োজনে আপনাকে বাইরে যেতে হবেই। প্রচণ্ড রোদে ঘেমেনেয়ে একাকার হওয়ার পর মন চায় এক গ্লাস হিমশীতল পানীয়। শরীর জুড়াতে ও তৃষ্ণা মেটাতে আমরা নানা রকম পানীয় পান করি। কিন্তু তা আমাদের শরীরের জন্য কতটা স্বাস্থ্যকর সেই কথা কতটুকুই বা মনে রাখি। গরমে শরীরের সুস্থতার জন্য পানি বা পানীয় বিষয়ক নানা পরামর্শ নিয়ে এবারের মূল ফিচার। লিখেছেন খালেদ আহমেদ
গরমের এই সময়ে রোদের ভয়ে তো আর ঘরে বসে থাকা যায় না। জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে বাইরে যেতেই হয়। তবে এই গরমে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করলে প্রাত্যহিক জীবনটা সতেজ থাকে। যেমন গরমে ঘেমে ঘেমে কমে যায় শরীরের পানি। সেই সাথে কিছু খনিজ লবণ। পানির এ ঘাটতি পূরণ করতে পান করতে হবে পর্যাপ্ত পানীয়। পানিশূন্যতা প্রতিরোধের জন্যও পানি পান করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন আট গ্লাস বা তারচেয়ে বেশি পানি পান করা উত্তম। পান করুন ততক্ষণ যতক্ষণ না তৃষ্ণা মিটে। আর তৃষ্ণা পেলেই পান করবেন পানীয়। ঠাণ্ডা বিশুদ্ধ পানিই উত্কৃষ্ট পানীয়। ফ্রিজের অতি ঠাণ্ডা পানি না পান করাই ভালো, অতি ঠাণ্ডা পানীয় গলা ব্যথার কারণ হতে পারে। গরমে শিশুরা পানিশূন্যতায় আক্রান্ত হয় বড়দের চেয়ে দ্রুত। তাই শিশুরা যেন পর্যাপ্ত পানি পান করে, সেদিকে লক্ষ রাখুন। মন চাইলে লেবু ও চিনির শরবত পান করতে পারেন। বাইরের শরবত বা ফলের রস খাওয়ার পূর্বে এগুলোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে নিশ্চিত হোন। কেননা সেগুলো জীবাণুমুক্ত না থাকলে হতে পারে জন্ডিস, আমাশয়, ডায়রিয়া, টাইফয়েড। মৌসুমি ফলও পানির চাহিদা মেটায়। সাথে শক্তিও দেবে বেশ। তাই যথেষ্ট খেতে পারেন তরমুজ, শসা, পেঁপে, লিচু, আম, কলা, বেল, বাঙ্গি ইত্যাদি ফল। এতে শরীর ঠাণ্ডা থাকবে। তবে অনেক বেশি খেয়ে বদহজম, পেট খারাপ বা পাতলা পায়খানা যেন না হয়, সে খেয়ালও রাখুন। শরীর যখন ঘামে তখন ঘামের সাথে শরীরের লবণও বের হয়ে যায় যথেষ্ট পরিমাণে। আইসক্রিম খাওয়ার আগে বুঝে নিন তা আপনার গলার সমস্যা করবে কি না। গরমে ঘামের কারণে দেহে লবণের ঘাটতি হলে শরীর হয়ে পড়ে দুর্বল, ক্লান্ত। মাংসপেশিতে হতে পারে খিঁচুনি। লবণের এ ঘাটতিও পূরণ হওয়া প্রয়োজন। অবশ্য ফলমূল এ ঘাটতি পূরণে সহায়ক। খাবার স্যালাইনও পান করতে পারেন প্রয়োজনে। আর পর্যাপ্ত পানি পান না করলে বেশি গরমে শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে হতে পারে হিট স্ট্রোক, জ্বর, ঘামহীন শুষ্ক ত্বক, শ্বাস-প্রশ্বাসের হার বৃদ্ধি, হূদস্পন্দনের হার বৃদ্ধি, বমি বমি ভাব, মাথাব্যথা, খিঁচুনি, এমনকি অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
একটু সাবধানতা
গরমে অনেকেরই প্রথম পছন্দ কোমল পানীয়। তবে কোমল পানীয় কিন্তু কোমল নয়, এতে আছে ক্ষতিকর নানা উপাদান। তাই গরমে কোমল পানীয় গ্রহণে সবাইকে একটা সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। অনেকে ওজন কমানোর জন্য ডায়েট ড্রিংকস খান। কিন্তু এ ডায়েট ড্রিংকসে চিনির বিকল্প হিসেবে আছে আস্পারটাম নামক উপাদান, যা মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকর। এসব কোমল পানীয় ইনসুলিন ও লেপটিন নামের দুটি হরমোন নিঃসরণ করে, যা মস্তিষ্ককে বেশি বেশি খাবার খেতে সংকেত দেয়। ফলে এই পানীয় খেলে ওজন কমার বদলে বেড়ে যেতে পারে। শিশুদের অল্প বয়সে স্থূলতার জন্য কোল্ড ড্রিংকস অনেকাংশেই দায়ী। কোমল পানীয়তে ক্যাফেইন ব্যবহারের ফলে তা গ্রহণকারীর উদ্বিগ্নতা, নার্ভাসনেস এবং সন্তান জন্মদানে অক্ষমতা দেখা দেয়। কোমল পানীয়তে কোনো পুষ্টি উপাদান না থাকায় এ পানীয় আমাদের দেহের বৃদ্ধিতে কোনো কাজে লাগে না। যারা ডায়েট করেন, ওজন কমাতে চান, হেলদি লাইফস্টাইল মানতে চান, তারা কোমল পানীয় বাদ দিয়ে সাধারণ পানি, ডাবের পানি অথবা চিনি ছাড়া ফলের জুস খান এবং নিজেকে সুস্থ রাখুন।
টিপস
মাত্রাতিরিক্ত কঠোর পরিশ্র্রমের কাজ করবেন না।
হালকা, পুষ্টিকর এবং চর্বিহীন খাবার খাবেন।
গরম এবং অ্যাসিডিক শাকসবজি এবং ফলমূল খাবেন না।
শুকনো ফল খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিয়ে তাজা ফল খাবেন।
বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলে ঘাম সহজে বাষ্পীভূত হয় না। ফলে আমাদের শরীর কার্যকর এবং সহজ উপায়ে তার উষ্ণতা বা গরম কমাতে বাধাপ্রাপ্ত হয়। আর এ কারণেই আপনি তৃষ্ণার্ত না হলেও পানি পান করুন।
উচ্চ চিনিযুক্ত পানীয় পান করা থেকে বিরত থাকুন। অনেক সফট ড্রিংকেই তরলীকৃত ফসফরিক অ্যাসিড মিশ্রিত থাকে। এ ধরনের পানীয়তে প্রিজারভেটিভ, কৃত্রিম রং এবং চিনি মিশ্রিত থাকে। এসব পানীয় অ্যাসিডিক এবং ইউরিনেট করার মাধ্যমে শরীর থেকে অতিরিক্ত তরল বের হয়ে যায়।
খুব বেশি ঠাণ্ডা পানীয় না পান করাই ভালো। গরমে আপনাকে কিছুক্ষণ শীতল রাখা ছাড়া এই পানীয় মূলত কোনো কাজেই আসে না।
আপনার পানীয়তে তুলসীর বীজ মিলিয়ে খাবেন। এতে শরীর ঠাণ্ডা করার চমত্কার উপাদান রয়েছে।
গরম, ঝাল, মশলাযুক্ত ও অতিরিক্ত লবণাক্ত খাবার এবং বাড়তি লবণ খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিন। শরীর তার প্রয়োজনীয় লবণ বিভিন্ন ফল এবং শাকসবজি থেকে গ্রহণ করে।
চানাচুর, সমুচা, চিপস, শিঙ্গাড়া, চপ, পেঁয়াজু, পাপড়, পুরি, বেগুনি, নানা রকম তেলে ভাজা পিঠা ইত্যাদি খাবার ত্যাগ করুন। এ ধরনের উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবারে শরীরে তাপ বৃদ্ধি পায়।
খাদ্যতালিকায় সম্ভব হলে চিনি ছাড়া প্রচুর ফলের রস এবং সবজির সালাদ রাখবেন।
ঘামের মাধ্যমে যে তরল বের হয়ে যায়, সেই শূন্যস্থান পূরণের জন্য লেবুর শরবত, ডাবের পানি এবং পাতলা ননিযুক্ত দুধ পান করতে পারেন।
অতি মিষ্টি খাবার; যেমন মধু, ঝোলাগুড় ইত্যাদি এড়িয়ে ফলমূল এবং সবজিতে বিদ্যমান চিনি খেতে চেষ্টা করুন।
