মিশরীয় মমি এবার ডিজিটাল যাত্রায়

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০১৪, ২১:১৪
সেই ১৯০৮ সালে ম্যানচেস্টারের একটি লেকচার থিয়েটারে উন্মোচন করা হয় এমন একটি মমি। সেটা দেখার জন্য পাঁচ শতাধিক দর্শক উপস্থিত ছিল সেই থিয়েটারে। এর পরেও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যতবারই মমি উন্মোচন করা হয়েছে, সেগুলো দেখার জন্য আগ্রহী দর্শনার্থীদের কোনো কমতি ছিল না। সেই কমতি নেই এখনও। তবে সময়ের সাথে সাথে পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখনকার এই ডিজিটাল যুগে এসে সবকিছুতেই যখন প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে, সেখানে মমির গায়েও লেগেছে ডিজিটাল প্রযুক্তির ছোঁয়া। আর এর মাধ্যমেই এখন প্রশস্ত হয়েছে মমির ডিজিটাল সংস্করণ উন্মোচনের। আসলে বিভিন্ন জাদুঘরে রক্ষিত মমিগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় স্ক্যান করার একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কম্পিউটেড টমোগ্রাফি স্ক্যানিং বা সিটি স্ক্যানিং প্রযুক্তির মাধ্যমে এই মমিগুলোর ত্রিমাত্রিক স্ক্যানিং করে ডিজিটাল প্রতিরূপ তৈরি করা হবে। এই উদ্যোগের সাথে সংশ্লিষ্ট রয়েছে সুইডেনের স্টকহোমের মেডেলহ্যাভসমিউসিট, মিউজিয়াম অব মেডিটেরানিয়ান, নেয়ার ইস্টার্ন অ্যান্টিকুইটিস এবং ইন্টার্যাকটিভ ইনস্টিটিউট সুইডিশ আইসিটি। অনলাইনে কিংবা ডিজিটাল একটি প্রদর্শনীর জন্যই এই দলগুলো কাজ করে যাচ্ছে মমি স্ক্যানিং করে এর ডিজিটাল সংস্করণ তৈরির জন্য। প্রাথমিকভাবে ৮টি মমির ডিজিটাল প্রতিরূপ তৈরি করছে তারা। ইতোমধ্যেই এই ৮টি মমির মধ্যে মিশরীয় পাদ্রী নেসওয়াইউয়ের স্ক্যানিং সম্পন্ন হয়েছে। তার মূল মমি এবং কফিনের পাশেই এখন ডিজিটাল সংস্করণের মমিটিও প্রদর্শন করা হচ্ছে। ‘ডিজিটাল অটোপসি টেবিল’ নামক বিশেষ ধরনের ডিজিটাল টেবিলে নতুন এই মমি রাখা হয়েছে। জাদুঘরে আগত দর্শনার্থীরা এই মমিকে একদম কাছে থেকে পর্যবেক্ষণের সুযোগ পাচ্ছেন। শুধু পর্যবেক্ষণই নয়, হাতে-কলমে এই ভার্চুয়াল মমিকে কাঁটাছেড়ার স্বাদ গ্রহণের সুযোগও রয়েছে তাদের সামনে। এ প্রসঙ্গে জাদুঘরটির কিউরেটর সোফিয়া হ্যাগম্যান জানান, মমিকে নিয়ে সাধারণ মানুষের যে কৌতূহল, সেটাকে এতদিন পর্যন্ত গবেষকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য দিয়েই মেটাতে হত। কিন্তু আমরা চেয়েছিলাম এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে, যাতে দর্শনার্থীরা নিজেরাই একটি মমিকে হাতে-কলমে উন্মোচন করে এর সম্পর্কে নিজের জিজ্ঞাসাগুলোকে জেনে নিতে পারে। তার নিজের ভাষায়, ‘আপনি এখন নিজেই একটি মমিকে গবেষকদের মতো করে উন্মোচন করতে পারবেন।’ ভার্চুয়াল সংস্করণের এই মমিকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ করে দিতে ডিজিটাল অটোপসি টেবিলে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘ইনসাইড এক্সপ্লোরার’ নামক সফটওয়্যার। এটি তৈরি করেছে ইন্টার্যাকটিভ ইনস্টিটিউট সুইডিশ আইসিটি। তারা প্রথমে হাসপাতাল এবং মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য এই সফটওয়্যার তৈরি করে। পরে তারা ব্রিটিশ মিউজিয়ামের সাথে যৌথ উদ্যোগে সাধারণ মানুষের উপযোগী করে একে তৈরি করেন। পরে তারা লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্টোরি মিউজিয়াম, ওয়াশিংটনের স্মিথসোনিয়ান এবং শিকাগোর ফিল্ড মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্টোরির সাথেও কাজ করেছে তারা। তবে নেসওয়াইউয়ের মমি নিয়ে তারা সর্বশেষ যে কাজটি করেছে, সেটাকেই তাদের সর্বোত্তম প্রচেষ্টা বলে অভিহিত করছে তারা। এতে সিটি স্ক্যানের পাশাপাশি ফটোগ্রামেট্রি প্রযুক্তিতে প্রাপ্ত ছবিও ব্যবহার করা হয়েছে। এতে কফিন এবং মমির বিভিন্ন কৌণিক বিন্যাস থেকে তোরা দ্বিমাত্রিক ছবি ব্যবহার করে একটি নিখুঁত ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরি করা হয়েছে। এই মডেল তৈরির কাজে অটোডেস্কের রিক্যাপ সফটওয়্যারও ব্যবহার করা হয়েছে। এই গবেষণার অন্যতম প্রধান থমাস রাইডেল বলেন, ‘সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে মমি ও কফিনের অভ্যন্তরের যাবতীয় তথ্য পাওয়া গেলেও এর মাধ্যমে মমি ও কফিনের বহিরাবরণ এবং রঙের বিন্যাস সম্পর্কে জানা যায় না। এ জন্যই লেজার স্ক্যানিং ও ফটোগ্রামেট্রি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে মমি ও কফিনের বহিরাবরণ এবং রঙের বিন্যাসকে নিখুঁতভাবে ধরা গেছে। আর তার ফলেই মমির ভার্চুয়াল মডেলে সূক্ষাতিসূক্ষ সব পরিবর্তন ধরা সম্ভব হয়েছে।’ ভার্চুয়াল এই মমি সামনের দিনে অনলাইনেও দেখা সম্ভব হতে পারে বলেই আশাবাদ সংশ্লিষ্টদের। আর সেটা হলে বিশ্বের সকল প্রান্তের মানুষই মমিকে নিয়ে নিরন্তর কৌতূহল মেটাতে সমর্থ হবে।