আজকের পুরো দিনটা আমাদের কেটেছে সান্তা ফে নগরী থেকে বেশ দূরে আমেরিকার যশস্বী চিত্রকর জর্জিয়া ও’কিফের স্টুডিও হোমে আর্ট-ট্যুর করে। এ চিত্রসফরে আমার সঙ্গী হয়েছিলেন মিস রুবারটা ত্যালমস। এক জামানায় আমি সাউথ আফ্রিকার প্রিটোরিয়া নগরীর ভিলা ক্রিসনথিমাম নামে একটি বাড়িতে বসবাস করতাম। প্রতিবেশী রুবারটা ছিলেন ভিলাটির মালকিন। বাড়িওয়ালী হিসেবে তাঁর মতো রহম দিল মহিলা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। প্রিটোরিয়া বাসের প্রথম দিকে (মাস ছয়েক) আমার কোনো বাহন ছিল না, বেকার হালতে গাড়ি খরিদ করার মতো আর্থিক তাকদও ছিল না, তাই কম্বি বলে এক ধরনের মাইক্রোবাসে চলাফেরা করতাম। বিষয়টি রুবারটার নজরে পড়লে তিনি আমাকে একখানা লক্করঝক্কর গোছের ভক্সহল গাড়ি ধার দিয়েছিলেন। তো বর্তমানে আমি সান্তা ফে নগরীর প্রান্তিকে বাস করছি। যুক্তরাষ্ট্রে বেড়াতে এসে রুবারটা আমার ভদ্রাসনে মেহমান হয়েছেন। চিত্রকলার প্রতি এ রাশভারি মহিলার আকর্ষণ অবসেশনের পর্যায়ে পড়ে। তো আমি মেজবান হিসেবে আজ তাঁকে নিয়ে যাই জর্জিয়া ও’কিফের স্টুডিও হোমে।
দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গদের শাসনামলে রুবারটা ছিলেন সবচেয়ে কমবয়স্ক দুঁদে ডিপ্লোম্যাট। নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বে ওখানে কৃষ্ণাঙ্গদের দাঁব-রোয়াব কায়েম হলে চাকরিচ্যুত হন তিনি। তারপর থেকে মহিলা তাঁর জীবন ও অতিক্রান্ত যৌবন উত্সর্গ করছেন চিত্রকলার সমঝদারিতে। হামেশা তিনি ফ্রান্স, ইতালি বা ভারতের কোনো না কোনো গ্যালারিতে ঘুরপাক করেন। চিত্রকলার স্লাইড তুলেন, ভিডিও বানান। তারপর জানাশোনা পঞ্চজনকে তাঁর ছনে ছাওয়া সুপরিসর ভিলাতে জিয়াফত করে এসব দেখনদারির বন্দোবস্ত করেন।
জর্জিয়া ও’কিফকে বিংশ শতাব্দীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী মনে করা হয়। তাঁর জগতজোড়া পরিচয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে আছে সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গিতে আঁকা কিছু ফুলের চিত্র। তবে সমঝদাররা রঙতুলি বিষয়ক ভাবনার শক্তিমত্তা উপস্থাপনার জন্য তাঁর অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করে থাকেন। পুষ্পের বর্ণাঢ্য চিত্রকলা ছাড়াও নাটকীয় ভঙ্গিতে আঁকা নগরদৃশ্য, বিজন মরুর আলোয় উদ্ভাসিত ল্যান্ডস্কেপ এবং পশুর হাড় ও করোটিকে এঁকেছেন তিনি একাধিকবার হাই ডেজার্টের দিকচক্রবালে নেমে আসা বর্ণিল আকাশের প্রেক্ষাপটে।
তো আমরা ও’কিফের স্টুডিও-হোমে অনেকগুলো অরিজিনাল চিত্রকলা পর্যবেক্ষণ করে গোধূলি লাগার লগ্নে ফিরে আসি সান্তা ফে শহরে। অতঃপর নগরীর আপস্কেইল রেস্তোরাঁ জেরোনিমোতে আসা হয় মূলত রুবারটার উত্সাহে। ডিনারের অর্ডার নিতে এসে বো-টাই পরা কেতাদুরস্ত খানসামা আমাদের গ্লোব শেইপ গ্লাসে ‘অন দি হাউস’ বলে পরিবেশন করেন বাতাবি লেবুর সৌরভ ছড়ানো মারগারিটা। তারপর ডিনারের স্টেক ঝলসানোতে সময় লাগবে জানিয়ে, শিষ্টাচারসম্মতভাবে ক্ষমা চেয়ে আমার দিকে তাকান।
তিনি আমার দিকে দিশা ধরে তাকিয়ে অতঃপর ডান চোখে তিন বার পলক ফেলে বলেন, ‘স্যার, আমাদের রেস্তোরাঁয় ওয়েট্রেস হিসেবে কাজ করেন আপনার দেশের একটি মেয়ে। এখন তার অফ ডিউটি চলছে। দ্য গার্ল ইজ ভেরি লোনলি। দেশের লোকজনের সঙ্গে এখানে তো তার দেখা হওয়ার কোনো উপায় নেই। আপনি কী মেয়েটির সঙ্গে কাইন্ডলি একটু কথা বলতে আগ্রহী হবেন?’ আমি রুবারটার দিকে তাকালে তিনি মৃদু হেসে বলেন, ‘যাও না, শুনে এসো.. হোয়াট দ্য গার্ল হ্যাজ টু সে। আমার অনেকগুলো ইমেইলের উত্তর দেওয়া হয়নি আজ, আমি এ ফাঁকে আইফোনে একটু কাজ সেরে নিই।’ রুবারটার সম্মতি পাওয়ায় আমি নির্ভারভাবে উঠে পড়ি।
খানসামা করিডোর ধরে আমাকে নিয়ে এসে ব্যাকইয়ার্ডের দোরগোড়ায় ছেড়ে দিয়ে ফের ডান চোখে একসঙ্গে একাধিক পলক ফেলে বলেন, ‘হিয়ার ইজ দ্য লাভলি গার্ল ফ্রম পাকিস্তান, এর নাম আয়নুর, আমরা বলি আয়নুর :দ্য ট্রাইভাল বিউটি ফ্রম ওরিয়েন্ট।’ আমি খানসামাকে ‘থ্যাংকস অ্যা বাঞ্চ’ বলে সিঁড়ির দিকে...
পুরো ভ্রমণ ইত্তেফাক ঈদসংখ্যায়
