‘যাচ্ছি কোথায়?’ জিজ্ঞেস করল রাইসুল আসাদ রুশো। ভোরের রোদ লাগছে চোখে, কুঁচকে রেখেছে চোখ-মুখ। গাড়ি চালাতে চালাতেই হাত চালাল চুলের ভেতর। ফিরে তাকাল একবার পেছনের সিটে বসা বন্ধুর দিকে।
‘বাঁয়ে,’ শান্তকণ্ঠে বলল জোসেফ হাওয়ার্ড।
মোড় নিয়ে গাছপালার মধ্যে দিয়ে যাওয়া পথধরে আরো কিছুদূর এগোল রুশো। নীল ভ্যানটা এনে রাখল মস্ত এক ইস্পাতের ফটকের সামনে। গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে দরজা খোলার চেষ্টা করল। ফিরে চেয়ে জানাল, ‘বন্ধ।’
‘বন্ধ?’ ভোঁতা প্রতিধ্বনি শোনা গেল যেন প্যাসেঞ্জার সিট থেকে। জোসেফের দিকে তাকাল এক জোড়া ঘুমজড়িত চোখ। ‘এই সাতসকালে ঘুম থেকে টেনে তুলে বন্ধ চিড়িয়াখানা দেখাতে নিয়ে এসেছ আমাদের?’
নীরবে একমুহূর্ত রুশোর ছোট ভাই রাজাকে দেখল জোসেফ। কৃত্রিম বিষণ্নতায় মাথা নাড়ল। ‘ঘুমাও, খোকা। ঘুম ভাঙলে আমাকে বলো।’
হেসে উঠল রুশো। ‘ওর সঙ্গে খামোকা কথা বলিস, রাজা। কথায় পারবি না। হাজার হোক উনি আমাদের প্রফেসর জোসেফ খান।’
‘প্রফেসর’ উপাধিটা রুশোই দিয়েছে বন্ধুকে। কম্পিউটার আর ইলেকট্রনিকসে অসাধারণ জ্ঞান জোসেফের।
‘কথা বলব কি?’ ঝাঁঝাল কণ্ঠে বলল রাজা। ‘ধরে এখন মার লাগাব। ব্যাটাআ! একে তো রোববার, চিড়িয়াখানা খুলতে এখনো এক ঘণ্টা বাকি। এতই যদি দেখানোর ইচ্ছে, আরো পরে আনতে পারল না?’
বেপোর্ট জুলজিক্যাল গার্ডেনে ঢোকার দরজার দিকে তাকাল রুশো, কর্মীরা ঢোকে যেখান দিয়ে। বলল, ‘রাজা ঠিকই বলেছে, জোসেফ। আরো পরে আনলেও পারতে।’
‘দরজা তো খোলেইনি,’ যোগ করল রাজা, ‘জানোয়ারেরাও নিশ্চয় এখনো ওঠেনি।’
হাসতে হাসতে ভ্যান থেকে নামল জোসেফ। ‘যে জানোয়ার দেখাতে এনেছি, দেখার পর বলবে, ওটার ঘুম না ভাঙাই ভালো।’
‘আবার রহস্য করে কথা বলে! ধরো তো ওকে, দাদা, কিল শুরু করি। আপনিই মুখ খুলবে।’
‘রহস্য না, রাজা,’ হাসিমুখে বলল জোসেফ, ‘ঠিকই বলছি। কয়েক হপ্তা ধরে ডক্টর ডোনাল্ড রিচারের সঙ্গে কাজ করছি। বিখ্যাত হারপিটোলজিস্ট।’
‘কী লজিস্ট?’ ঘুম চলে গেল রাজার।
‘হারপিটো। সাপ বিশেষজ্ঞ। বিষধর সাপ আর তাদের বিষ নিয়ে গবেষণা করেন ডক্টর রিচার। বিশেষ করে গোখরা জাতের সাপ। আমার কাজ হলো, আবহাওয়া-নিয়ন্ত্রক খাঁচা বানিয়ে দেওয়া। নতুন সাপের জন্যে নতুন ডিজাইনের।’
‘নতুন কি আসছে এখন?’ জিজ্ঞেস করল রুশো।
‘একটা অস্ট্রেলিয়ান টাইগার স্নেক, কিংবা বলতে পারো বাঘা সাপ। পৃথিবীর সবচেয়ে মারাত্মক সরীসৃপ। ক্যালিফোর্নিয়ায় ওই সাপ আর একটিমাত্র আছে। বিশেষ অতিথির জন্যে বিশেষ ঘর বানাতেই হবে।’ চারপাশে তাকাল জোসেফ, যেন তার গোপন কথা কেউ শুনে ফেলবে। ‘তাছাড়া সাপটার অতিরিক্ত দাম। সে জন্যেই ওটার আগমনের খবর যথাসম্ভব গোপন রাখতে চান ডক্টর।’
‘আমি তো জানতাম দুনিয়ার সবচেয়ে বিষধর সাপ কেউটে।’
মাথা নাড়ল জোসেফ। ‘কেউটের বদনাম বেশি, লোকে চেনেজানে তো। ভারতে আর মালয়েশিয়ায় প্রতি বছর বহু লোক কেউটের কামড়ে মারা যায়।’
‘তাহলে কেউটেই বেশি মারাত্মক,’ রায় দিয়ে ফেলল রাজা।
হাসল জোসেফ। ‘তোমার যুক্তি ফেলে দেওয়া যায় না, বেশি মারলে বেশি মারাত্মক। তবে, কেউটের কামড় খেয়ে চিকিত্সা ছাড়াও অনেক সময় লোক বাঁচে। কিন্তু বাঘা সাপের কামড় খেলে আর সঙ্গে সঙ্গে চিকিত্সা না করালে বাঁচার কোনো আশা নেই। মরবেই। কেউটের চেয়ে টাইগার স্নেকের বিষ চব্বিশ গুণ বেশি শক্তিশালী। আরো আছে। অন্য সাপ মানুষ দেখলে পালায়, লুকিয়ে পড়তে চায়, টাইগার ঠিক উল্টো। বাধা পেলে তো রুখে দাঁড়াবেই, না পেলেও তেড়ে আসে। ভাগ্যিস, পৃথিবীতে ওই সাপের সংখ্যা খুব কম, আর লোকালয়ের কাছে থাকে না।’
‘সাপটা তাহলে দেখার সৌভাগ্য হবে আমাদের?’ আগ্রহী মনে হলো রুশোকে।
পকেট থেকে ব্রোঞ্জ রঙের ছোট একটা প্লাস্টিকের কার্ড বের করল জোসেফ। ‘সিকিউরিটি পাস। গেট খোলার জন্যে। এটা দেখালেই ঢুকতে দেবে আমাকে।’
কয়েক সেকেন্ড পরই তালা খুলে গেল। গেট খুলল জোসেফ। আবার ভ্যানে উঠল সে আর রুশো। গাড়ি নিয়ে ভেতরে ঢুকল, থামল এসে কর্মচারীদের পার্কিং লটে।
ছোট একটা বাড়ি দেখাল জোসেফ। ‘ওটা সিকিউরিটি শ্যাক। সারা চিড়িয়াখানা জুড়ে জালের মতো ছড়িয়ে রাখা হয়েছে অ্যালার্মের তার আর নানারকম সেন্সর। ওগুলোকে ফাঁকি দিয়ে কিছুতেই যেতে পারবে না।’ পকেটে চাপড় দিল সে। ‘তবে পাস থাকলে আর অসুবিধে নেই।...ওই যে, বাঁয়ের এল-প্যাটার্ন বিল্ডিংটা, ওটাই গবেষণাগার। ওখানেই যাব।’
‘এত কড়াকড়ি কেন?’ ভুরু কুঁচকাল রুশো। ‘চিড়িয়াখানা থেকে কি চুরি যাওয়ার ভয়?’
‘কিছু কিছু প্রাণী আছে, অত্যন্ত দামি,’ জোসেফ জানাল। ‘তবে কিছু প্রাণী আছে, যেগুলো দামি হলেও চুরি করার সাহস করবে না কেউ। যেমন ধরো, আঠারো ফুট লম্বা পাইথন। তবু, বলা তো যায় না। নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতেই হয়েছে কর্তৃপক্ষকে। এতে সুবিধে আছে। ঢোকার সময় পাস লাগে, বেরোনোর সময় লাগে না। সর্বক্ষণ তোমার ওপর চোখ রাখবে ইলেকট্রনিক আই। ধরো, ভুল করে বাঘের খাঁচায় ঢুকে পড়লে...’
‘কসম, দাদা!’ হঠাত্ চেঁচিয়ে উঠল রাজা, জোসেফের কথায় কান নেই, তাকিয়ে আছে একটা গাড়ির দিকে। সুন্দর গাড়ি, মোটর সাইকেল, এসব তার হবি। ‘পিলারি ফোর হানড্রেড! আরিশ্শালার, রঙটা কি দেখেছ!’ পার্কিং লটের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির দিকে হাত ঝাঁকাল সে। ‘যেন আগুন জ্বলছে! আমি শিওর, ওটা কাস্টম-মেড হাই-পারফরমেন্স ড্রাইভিং মেশিন।’ মৃদু শিস দিয়ে উঠল সে।
‘হ্যাঁ, সুন্দর,’ রুশো বলল। ‘তা দাম কী রকম হবে, জনাব গাড়িপাগল?’
‘এই চিড়িয়াখানার কর্মীরা যা আয় করে, তার চেয়ে বেশি,’ গাড়িটার ওপর থেকে চোখ সরাতে পারছে না রাজা।
‘হবেই তো!’ তেঁতুলের টক ঝরল যেন জোসেফের কণ্ঠ থেকে। ‘বেতন আর কত পায়।
পুরো থ্রিলার ইত্তেফাক ঈদসংখ্যায়
