পিয়ারী শাকুর মজিদ পূর্বরাগ

আপডেট : ২৩ মে ২০১৯, ১৯:৫২

এক : মহাপূর্ণিমার খোঁজে

হুট করে এই নদীর পাড়ে এসে চিন্তায় পড়ে যায় ছেলেটি। এই শহরে তার কোনো পরিচিতজন নেই। রাতে থাকার মতো নিশ্চয়ই কোনো হোটেল পাওয়া যাবে—এমনটা মনে করেই বিকেলবেলা সে চলে এসেছে এখানে। সুনামগঞ্জেই যে আসবে এমন তার পরিকল্পনাও আগে থেকে ছিল না। শাহ্ আবদুল করিমের কবর দেখে দিরাইতে ফেরত এসে সে সিলেটের বাসেই উঠেছিল। ২০-২৫ কিলোমিটার যেতেই সিলেট সুনামগঞ্জ রোডের ইন্টার সেকশনে বাস থামলে তার চোখে পড়ে সুনামগঞ্জের সাইনবোর্ড। মাত্র ৭ কিলোমিটার পথই যদি হয় সুনামগঞ্জ তবে তার সেখানে যেতে সমস্যা কেন? করিম সাহেবের আগের পুরুষ হাছন রাজা। না হয় তাঁর বাড়িটা দেখেই আসুক।

এই জায়গাটিতে নানা রকমের বাস আর অটোরিকশা আসা যাওয়া করে। সে প্রথমে সিলেটগামী বাস থেকে নেমে পড়ল এবং মিনিটখানেকের মধ্যেই সিলেট থেকে আসা আরেকটা বাস যখন কিছু যাত্রী নামানোর জন্য একটু কড়া করে ব্রেক ধরল, তখনই সে প্রায় বাদুড়ঝোলা হয়ে বাসের ভেতর ঢুকে পড়ে।

এবার সে ঠিক কোথায় যাচ্ছে, একেবারেই জানতে চাইছে না। কিছুদূর যেতেই একটা কালভার্টের কাছে এসে রাস্তার দুই পাশে দুই দোতারা টাঙানো গেট দেখে বুঝে গেল, হাছন রাজার দেশে সে চলে যাচ্ছে। এই পথ মিনিট দশেকের মাথায় শেষ হলো। বাসটি তাকে নামিয়ে দিল পুরনো বাসস্ট্যান্ডে। কিন্তু এখন সে যাবে কোথায়?

বাসস্ট্যান্ডের ঠিক উল্টাদিকে কতগুলো খাবারের দোকান। আস্ত ছাগল, মুরগি আর বোয়াল মাছের ছবি দেওয়া সাইনবোর্ড। সে একটার ভেতরে চলে গেল। পানির দেশে তাজা মাছ নিশ্চয় থাকবে। বোয়াল মাছের অর্ডার করল। সঙ্গে ডাল। বোয়াল মাছ এল সঙ্গে আলু আর টমেটো। খারাপ না, এ অঞ্চলের লোকেরা কি ভুনা কম খায়? পাতলা ঝোলের তরকারিতে ভরপেট খেয়ে সে বেরিয়ে এল। এখন কী করবে?

সেলফোনের ঘড়িতে সময় দেখল। বিকেল পাঁচটা বাইশ মিনিট। এপ্রিল মাসে আকাশ মেঘলা থাকায় ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হতে তার কত দেরি হবে। সময়টা হিসেব করে ভাবল—সন্ধ্যা হতে যখন ঘণ্টাদেড়েক আছে, তখন সুরমা নদীর পাড়ে কিছুটা সময় না হয় কাটিয়ে ফেরা যাক শহরে।

বাস থেকে যতটা সে দেখেছে এই শহর, তাতে তার খুব ভালো লেগে গেছে। ঢাকা থেকে বেরিয়ে যে শহরেই যাক না কেন, ভালো লাগে। ছবি তোলার কাজে ফুরসত পেলেই সে শহর থেকে বেরিয়ে যায়। পলাশী থেকে হেঁটে হেঁটে শাহবাগ, সেখান থেকে মহাখালী এসে ময়মনসিংহের বাসে উঠে মাঝখানে কোথাও নেমে যায়। গাঁও-গেরাম ঘুরে ঘুরে ছবি তোলে। কেউ জিগ্যেস করলে নানারকম উত্তর দেয়। কারো কাছেই তার আসল পরিচয় জানায় না। যার কাছে যে পরিচয় দিতে হয়, সেটাই দিয়ে থাকে। কেউ জানে সে সাংবাদিক, কেউ জানে ফটোগ্রাফার। কেউ কেউ জানে সে জমির দালাল, কাউকে বলে সে তার এক আত্মীয়ের জন্য জমি দেখতে এসেছে।

আজ এই সুনামগঞ্জে নেমেই তার মনে হলো, এখানে দু-চার দিন থাকা যায় অনায়াসে। দিরাইতে শাহ্ আবদুল করিমের বাড়িতেও তার থাকার ইচ্ছে হয়েছিল, কিন্তু কেউ রাখেনি। দুদিন আগে ভোরবেলা সিলেট নেমেই জগন্নাথপুরের কেশবপুর গ্রামে গিয়েছিল রাধারমণের বাড়িতে। সারাদিন রাধারমণের মন্দিরের পাশে পুকুরপাড়ে বসেছিল। সন্ধ্যা হলে চলে আসে আসিম শাহ্-র মাজারে। সেখানে সারারাত গানবাজনার মধ্যে থেকে, শেষরাতের দিকে মাজারের পাশের বড় ঘরটির এক কোনায় ফ্লোরের ওপর হ্যাভারসেক রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে চলে আসে দিরাই। সারাবেলা নৌকা নিয়ে কালনী নদী ঘুরে ক্লান্ত হয়ে দিরাই বাজারের এক হোটেলে তিন শ টাকায় রুম ভাড়া করে রাত কাটিয়ে গিয়েছিল উজানধল গ্রামে। শাহ্ করিমের কবরের পাশে কিছুক্ষণ বসেছিল। তার বসাবসি আবার খুব নিশ্চুপ থাকে না। সে ক্যামেরা ছাড়া নড়তে পারে না। আগে শুধুই স্টিল ক্যামেরা তার সঙ্গী থাকত, পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ভিডিও ক্যামেরা। এই দুই ক্যামেরা বাদ দিয়ে নতুন একটা ডিএসএলআর নিয়েছে। এতে দুই ক্যামেরার কাজ হয় তার। পকেটে আছে ভয়েস রেকর্ডার। আর আছে ছোট্ট ক্লিপ মাইক্রোফোন। সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিলেটের হাওর-বাওরে সে এক মাস ঘুরে বেড়াবে। সিলেটের এই ভাটি অঞ্চলে কী করে বা কেন এত আউল-বাউলের জন্ম হলো, তা সে উদ্ঘাটন করেই ছাড়বে।

কিন্তু এই শেষ বিকেলে এই লোকালয়ে এসে কী করবে ঠিক বুঝতে পারছে না। তার কাঁধে যে ব্যাগ এটা একটা বিশেষ ডিজাইনের। নতুন এসেছে বাজারে। এর এক পাশে চমত্কারভাবে তার ম্যাকবুকটা রাখা। ভেতরে অনেকগুলো খোপ আছে। বড় খোপটা ক্যামেরার, বাকি খোপগুলো নানারকমের ল্যান্স, হুড, চার্জার, এসবের জন্য। তার একটি মাত্র ল্যান্স ১৮-২০০ মিলিমিটার। আর কিছু নাই। আছে তিনটা চার্জার। ম্যাকবুক, ফোন আর ক্যামেরার। এসব রাখার পর আরো তিনটা ছোট খুপরি পড়ে থাকে ব্যাগের ভেতর। একটিতে টুথপেস্ট, টুথব্রাশ, আর একটা ছোট্ট ডিওডোরেন্ট। আগে শেভিং কিটস্ নিয়ে বেড়াত ব্যাগে। এখন প্রয়োজন হচ্ছে না। এটা তার এখন লাগে না। গোঁফ-দাড়ি নিজের মতো একটু বাড়ছে। তাতে অবশ্য মাঝে মাঝে সমস্যা হয়। ছোকরা টাইপের ছেলেরা তার কাছে এসে জিগ্যেস করে—শুকনা কোথায় পাওয়া যায়? সে প্রথমে বুঝেনি। পরে ভদ্র ভাষায় জবাব দিয়েছে, না ভাই, গাঁজা আমি খাই না। সিগারেটও না।

তার ব্যাগের অপর দুই খুপরিতে আরো দুটো জামা আছে। একটা ইলাস্টিক দিয়ে বানানো ঢিলাঢালা থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট। আরেকটা সুতির পাতলা টি-শার্ট। এগুলো সে কখনো কখনো ঘুমানোর সময় ব্যবহার করে, আবার কখনো এই ঘুমের পোশাক পরেই ছবি তুলতে বেরিয়ে যায়।

ব্যাগের সাইড পকেটে ছোট্ট একটা নোটবুক। এখানে কতগুলো তারিখ, জায়গা আর কিছু মানুষের নাম লেখা। মাঝে মাঝে খুব সংক্ষেপে, তার নিজের বোঝার মতো কিছু শব্দ লেখা থাকে। তার ইচ্ছে, পরবর্তী সময়ে তার ফটোবুক যখন প্রকাশিত হবে, সেখানে সে এখান থেকে তথ্য নেবে। ব্যাগের ভেতর তার সবচেয়ে আদরের জিনিসটা, তার ক্যামেরা। ক্যামেরাটা সে নিজের টাকায় কিনেছে। তার এক টিচারের পুরস্কারজয়ী একটা আর্কিটেকচারাল প্রজেক্টের ওপর ৫ মিনিটের একটা ডকুমেন্টারি...

পুরো উপন্যাস ইত্তেফাক ঈদসংখ্যায়