কোথায় সেই টিম গেম?

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০১৪, ২২:২৩
২০০২ সালে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় বিশ্বকাপ আয়োজনের আগে ফিফা একটা বড় দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল—স্বাগতিকরা দু’দলই প্রথম রাউন্ডে বাদ হয়ে যাবে না তো? বিস্ময়করভাবে ২০১০ বিশ্বকাপের আগ পর্যন্ত ফিফা বিশ্বকাপে কখনোই স্বাগতিক দল প্রথম পর্ব থেকে বাদ পড়েনি; ২০০২ সালেও মানটা রেখেছিল দক্ষিণ কোরিয়া। ব্যাপারটা শুধু মান রাখার নয়, এর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও আয়োজনগত অনেক ব্যাপারও জড়িয়ে থাকে। স্বাগতিক দল শুরুতেই বাদ পড়ে গেলে টুর্নামেন্ট জৌলুস হারিয়ে ফেলে, উন্মাদনা হারিয়ে ফেলে। ফলে টুর্নামেন্ট শতভাগ ‘সফল’ হয়েও কোথায় যেন একটু বর্ণহীন হয়ে পড়ে। আজ থেকে সে অর্থে বাংলাদেশে চলমান আইসিসি ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টির বর্ণহীন-পর্ব শুরু হচ্ছে। আরও একবার ঘরের মাটির টুর্নামেন্টের প্রথম রাউন্ড থেকেই ছিটকে পড়ল বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মাটিতে টুর্নামেন্ট এ পর্যন্ত কম অনুষ্ঠিত হয়নি। প্রথম ঢাকায় অনুষ্ঠিত বড় টুর্নামেন্ট, মিনি বিশ্বকাপে তো বাংলাদেশ দল খেলতেই পারেনি। এর আগে-পরে এশিয়া কাপ বা তিন-চার দেশীয় টুর্নামেন্ট ঢের হয়েছে এখানে; এমনকি ওয়ানডে বিশ্বকাপও যৌথ আয়োজন করেছে বাংলাদেশ। আর বেশিরভাগ টুর্নামেন্টেই প্রথমপর্ব থেকেই বাদ পড়েছে বাংলাদেশ। ফলে এই বর্ণহীন আয়োজন দেখার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য বিরল নয়। বিরল হল—এমন রিক্ত-শূন্য হাতে টুর্নামেন্ট শেষ করার অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশ দল কবে সর্বশেষ এমন দীনহীন চেহারায় কোনো টুর্নামেন্ট শেষ করেছে, সেটা খুঁজতে হলে আপনাকে আতসি কাঁচই বের করতে হবে। হ্যাঁ, ২০০৭ সালের পর প্রতিটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকেই খালি হাতে ফিরেছে বাংলাদেশ। কিন্তু ২০০৯ সালের ইংল্যান্ড আসর ছাড়া প্রতি আসরেই কিছু লড়াইয়ের স্মৃতি অন্তত নিয়ে ফিরতে পেরেছে তারা। ২০১০ ও ২০১২ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে বিশ্বের দৃষ্টি খেলে ফেলা লড়াই করে ম্যাচ হেরেছিল তারা। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বাদ দিয়ে ওয়ানডে বিশ্বকাপে এলে ২০০৩ সাল ছাড়া আর কখনোই এমন ভয়াবহ ফলের সামনে দাঁড়াতে হয়নি বাংলাদেশকে। ১৯৯৯ সালে পাকিস্তানকে হারানো এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে লড়াই, ২০০৭ সালে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারানোর ইতিহাস আছে। ২০১১ সালে দু’টি কেলেঙ্কারি হলেও ইংল্যান্ডকে অবিশ্বাস্যভাবে হারানোর গর্ব আছে। কিন্তু এবার? গর্ব, ইতিহাস তো দূরে থাক; সামান্য লড়াইয়ের স্বস্তিটাও যে নিয়ে শেষ করা গেল না টুর্নামেন্টটা! কেন এমন হল—এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে আমি-আপনি মাথার চুল ছিঁড়তে পারি, কিন্তু উত্তর মেলা খুব কঠিন। সেই শুরু থেকে বাংলাদেশ দলের সব সিনিয়র ক্রিকেটার ও অধিনায়ক বারবার বলছেন, এমন বিপর্যয়ের কারণ একটাই—সেরা পারফরমাররা ফর্মে নেই। যুক্তিটা শুনতে প্রথমে ভালো লাগে। কিন্তু একটু ভেবে দেখুন তো, রাজ্জাক-মাশরাফি-সাকিব-তামিম-মুশফিক-নাসির; এই সেরা পারফরমারদের ছাড়া বাংলাদেশ নিকট অতীতে ম্যাচ জেতেনি? সামসুর রহমান, এনামুল হক, মুমিনুল হক, সোহাগ গাজীরা ম্যাচ জেতাননি বাংলাদেশকে। সবচেয়ে বড় কথা, কেউ বড় পারফরম্যান্স না করার পরও বাংলাদেশ একটা টিম হয়ে ম্যাচ জিতেছে, একটা টিম হয়ে খেলে চ্যালেঞ্জ পার করেছে। কোথায় গেল সেই টিম-গেম? বলাই হয়, ক্রিকেটে আপনি ৫ দিন ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের জোরে জিততে পারবেন, বাকি ৫ দিন আপনার তারকারা ভালো খেলবে না; তখনই দরকার হবে আপনার সেই দলীয় সংহতিটা দেখিয়ে দেয়ার। এই একটা সময় যখন আউট-অফ-ফর্ম ব্যাটসম্যানরা সিঙ্গেল-ডাবলের জন্য প্রাণ দিয়ে দেবেন, এই একটা সময় যখন বোলার নিজের সেরা ডেলিভারি খুঁজে না পেয়েও আটকে রাখতে চাইবে প্রতিপক্ষকে এবং ফিল্ডার একটা রান আটকানোর জন্য ঝাঁপাবেন; এসবই হবে শুধু একটা দলকে আপনি যখন একটা পরিবারের মতো, একটা ইউনিটের মতো করে মাঠে পাবেন। সেটা কী পাচ্ছি না আমরা? অধিনায়ক ও ম্যানেজমেন্ট স্বভাবতই প্রকাশে অন্তত বলার কথা নয় যে, তারা টিম-গেম পাচ্ছেন না। তবে অধিনায়ক একটা খুব তাত্পর্যপূর্ণ কথা বললেন এই প্রশ্নের উত্তরে, ‘দলের ভেতরে থেকে তো আমাদের সমস্যাটা বুঝতে পারছি না। এবার আমরা বাইরের ফিডব্যাকগুলো নিতে চাই। নিশ্চয়ই বাইরে থেকে অন্যরকম কিছু মনে হচ্ছে। সেটা নিয়ে আমরা আলোচনা করতে চাই।’ অসাধারণ একটা উদ্যোগ হতে পারে এটা। দলের আশেপাশে নানা ভূমিকায় দেশের সাবেক ৬ জন অধিনায়ক আছেন। মুশফিকরা চাইলেই তাদের ফিডব্যাকটা অন্তত পেতে পারেন। আগামী ১২ তারিখই সম্ভবত বাংলাদেশ ক্রিকেট লীগের বাকি অংশ শুরু হচ্ছে। তার আগে একটু বিশ্রাম নিয়ে এই ফিডব্যাক নিয়ে বসলে মন্দ হয় না।