রাজধানীর রামপুরায় চোরাচালানের স্বর্ণের বার আত্মাসাতের ঘটনায় জড়িত তিন পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা নিয়ে চলছে রশি টানাটানি। মহানগর পুলিশ বা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ তিন পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরে দায়িত্ব নিতে চাচ্ছে না। গতকাল দিনভর রশি টানাটানির কারণে এ ব্যাপারে কোন মামলা হয়নি। অপরদিকে এই তিন পুলিশ সদস্যকে আটকের পর দুই দিন পার হতে চললেও রশি টানাটানির কারণে তাদেরকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে গতকাল বুধবার তাদেরকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। উল্লেখ্য, চোরাই স্বর্ণের ১৬৫টি বার (যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ১২ কোটি টাকা) আত্মসাতের অভিযোগে গত সোমবার রাতে রামপুরা থানার এসআইসহ তিন পুলিশ সদস্য ও পুলিশের এক সোর্সকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পুলিশ নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও বগুড়ায় অভিযান চালিয়ে তাদের কাছ থেকে আত্মসাত্ হওয়া ১৮ কেজি ওজনের ১৪৯টি বার উদ্ধার করে। গ্রেফতারকৃতরা হলেন- রামপুরা থানার সিভিল টিমের এসআই মঞ্জুরুল ইসলাম, কনস্টেবল ওয়াহেদুল, আকাশ চৌধুরী ও পুলিশের সোর্স রনি।
মামলা দায়ের না হওয়ার ব্যাপারে গোয়েন্দা পুলিশের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, এটি সরকারি কর্মকর্তার অপরাধ। এসব ঘটনায় মামলা দায়েরের জন্য দুদক একমাত্র এখতিয়ারভুক্ত প্রতিষ্ঠান। এ কারণে এ ঘটনায় মামলা করবে দুদক। অপরদিকে দুদকের কর্মকর্তারা বলছেন, যেহেতু পুলিশ সোনাসহ তাদের তিন সদস্যকে ধরেছে, সেহেতু মামলা পুলিশকেই করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ চাইলে দুদকের অনুমতি নিতে পারে। তাছাড়া এ ধরনের ঘটনাগুলোয় দুদক কখনোই মামলা করে না। ফৌজদারি দণ্ডবিধিতে এ ঘটনায় মামলা করতে হয়।
তবে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম গতকাল রাতে ইত্তেফাককে বলেন, মামলার প্রস্তুতি চলছে। এসব মামলার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুমোদন প্রয়োজন। এ কারণে মামলা দায়েরের অনুমতি চেয়ে গতকাল বিকালে পুলিশের পক্ষ থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে আবেদন করা হয়। কমিশন গতকাল অনুমোদন না দেয়ায় মামলা দায়ের করা সম্ভব হয়নি। কমিশন থেকে বলা হয়েছে বৃহস্পতিবার কমিশনারদের বৈঠকে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। কমিশন অনুমোদন দিলেই পুলিশের পক্ষ থেকে দণ্ডবিধি ৪০৯ ধারায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হবে।
গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ১৩ মার্চ সোর্স রনির তথ্যের ভিত্তিতে এসআই মঞ্জুরুল, কনস্টেবল আকাশ ও ওয়াহেদুল বনশ্রী এলাকা থেকে একটি প্রাইভেটকার জব্দ করেন। এসময় প্রাইভেটকারের আরোহীরা পালিয়ে যায়। তারা গাড়ি তল্লাশি করে ২৩৫টি স্বর্ণের বার পান। কিন্তু স্বর্ণগুলো তারা জমা না দিয়ে নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নেন। কিন্তু বিষয়টি গণমাধ্যমে জানাজানি হলে রামপুরা থানার পুলিশ কর্মকর্তারা বিপাকে পড়েন। পরে ১৬ মার্চ কৌশলে প্রাইভেটকারের সীটের মধ্যে ৭০টি স্বর্ণের বার লুকিয়ে রেখে পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে তা উদ্ধারের নাটক সাজান। পরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে প্রাইভেট কারটির চালক সমীর বিশ্বাস এবং স্বর্ণের বাহক জাহিদ হোসেন ওরফে মাহিনকে আটক করা হয়। গ্রেফতারকৃত জাহিদ হোসেন ও সমীর বিশ্বাসকে দুইদিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। দুই দিনের রিমান্ডের পর মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে গ্রেফতারকৃত মাহিন জানান, ‘তারা ২৩৫টি স্বর্ণের বার নিয়ে বনশ্রী এলাকা থেকে পুরান ঢাকার তাঁতী বাজার এলাকায় যাচ্ছিলেন। এসময় পুলিশের ধাওয়া খেয়ে তারা গাড়িটি ফেলে পালিয়ে যান। স্বীকারোক্তির পর তাদেরকে জেল হাজতে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
তিনি আরো বলেন, এরপর অভিযানে নেতৃত্বদানকারী রামপুরা পুলিশের এসআই মঞ্জুরুল ইসলাম, কনস্টেবল ওহেদুল ইসলাম, আকাশ চৌধুরী ও কথিত সোর্স রনি আহমেদকে মহানগর ডিবি পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করে। আর এতেই বের হয়ে আসে খোয়া যাওয়া স্বর্ণের আসল রহস্য। গ্রেফতারকৃত তিন পুলিশ সদস্য ও কথিত পুলিশের সোর্স রনিকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তারা স্বর্ণ আত্মসাত্ করার বিষয়টি স্বীকার করেন। রনির শ্বশুর বাড়ি থেকে ১৪ পিস, এসআই মঞ্জুরুলের হবু শ্বশুর বাড়ির ডিপ ফ্রিজ থেকে ৫৮ পিস, কনস্টেবল আকাশের গাজীপুরের শ্বশুর বাড়ি থেকে ১৪ পিস ও বগুড়ার সোনাতলার ওয়াহেদের গ্রামের বাড়ি থেকে ৬৩ পিস স্বর্ণ উদ্ধার করে ডিবির দুইটি পৃথক টিম। তবে পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী এখন পর্যন্ত ১৬ পিস উদ্ধার হয়নি।
