সাঙ্গ হল প্রাণের উত্সব

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০১৪, ২২:২৪
টানেল থেকে খেলোয়াড়রা বের হচ্ছেন; সবার আগে থাকা অধিনায়ক দু’হাত দু’পাশে ছড়িয়ে দর্শকদের উল্লাস করার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। কিংবা ম্যাচ জিতে ব্যাট-হেলমেট ছুঁড়ে ফেলে অধিনায়ক ও খেলোয়াড়রা গ্যালারি মাতানো অঙ্গভঙ্গি করছেন। এসব বক্সিং কিংবা রেসলিংয়ে আপনি নিয়মিত দেখে থাকতে পারেন; ক্রিকেটে নয়। বিশেষ করে আধুনিক ক্রিকেটের তো এই উদ্দাম, আনন্দ করার ফুরসতই নেই। টাকা, ক্যামেরা, বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে আদালত, মিডিয়া অনেক কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকা ক্রিকেটারদের আনন্দ করার মত সময়টা কই? ফলে ক্রিকেট দর্শকেরও এখন আনন্দ-উল্লাস করাটা আর ভাগ্যে জোটে না। ক্রিকেট দর্শকের এখনও তেতো মুখ নিয়ে সময় কাটে গ্যালারিতে। এই ‘সিরিয়াস’ ক্রিকেটের দুনিয়ায় খেলাধুলার সেই আদি ও অকৃত্রিম রূপটা যদি কেউ ধরে রাখতে পারেন, সেটা ওই ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলোয়াড়রা। সেই ২০১২ সালের টি-টোয়েন্টি থেকে শুরু হয়েছিল ক্যারিবীয় ক্রিকেটারদের টি-টোয়েন্টি ম্যাচে এই উত্সব-উল্লাস। মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামও কয়েক পশলা সেই আনন্দ পেয়েছে। অবশেষে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সেমিফাইনালে হারের ভেতর দিয়ে সাঙ্গ হল এই উত্সবের। ক্রিকেট সিরিয়াস ব্যাপার হয়ে গেছে অনেক আগেই। তারপরও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটটা যখন এলো, শুরুতে একটা খোলা হাওয়া একটু এসেছিল। প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের সেই আশির দশকের পোশাকে মাঠে নামা, অস্ট্রেলিয়ানদের শুরুর দিকে ডাকনামই জার্সিতে লেখা; এমন অনেক কিছু করেই সিরিয়াস ক্রিকেটাররাই চেষ্টা করেছিলেন আনন্দটা অন্তত এই ফরম্যাটে ধরে রাখতে। কিন্তু কালক্রমে সে টি-টোয়েন্টিও মহাগম্ভীর একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইপিএল, চ্যাম্পিয়নস লিগ, বিশ্বকাপ মিলিয়ে এখন এটাও ক্রিকেটারদের জীবন-মরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে যেন। এর মধ্যে আনন্দের পতাকাটা ধরে রেখেছেন ক্যারিবীয়রা। আনন্দ-উত্সব করায় মানুষ হিসেবেই ক্যারিবীয় সমুদ্রপাড়ের বাসিন্দাদের জুড়ি মেলা ভার। বব মার্লে থেকে উসাইন বোল্ট; সঙ্গীত থেকে অলিম্পিক; সব জায়গাতেই তাদের বাঁধভাঙা আনন্দ আর আনন্দ। সেই আনন্দ যখন শ্রেষ্ঠত্বের সঙ্গে মেলে, তখন তা হয়ে ওঠে সারাবিশ্বের উপভোগের কারণ। ক্রিকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সে শ্রেষ্ঠত্ব হারিয়েছে অনেক আগে। ক্লাইভ লয়েড, ভিভ রিচার্ডসরা নেই; এমনকি ব্রায়ান লারারাও নেই। ফলে এই ওয়েস্ট ইন্ডিজ আনন্দ করল, উত্সব করলো কি না, তাতেই বা কী আসে যায়! এখানেই গেইল-স্যামিদের কৃতিত্বটা। তারা এই তথাকথিত জয়-পরাজয় দিয়ে আনন্দ মাপার সাধারণ হিসেবকে অতিক্রম করে যেতে পেরেছেন। হ্যা, গত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে যে গ্যাংনাম করেছিলেন, সেটা হয়তো বেশি নজর কেড়েছিল। কিন্তু একটু কাছ থেকে দেখলে বুঝতে পারতেন, ওই ট্রফি না জিতলেও আসলে এদের আনন্দটা এমন কিছু কমে যেতো, রঙ হারাতো, তা নয়। এই তো ক্রিস গেইল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ঘরোয়া ক্রিকেটের সেই ফর্মটা ধরে রাখতে পারছেন না। তারপরও এবারের বিশ্বকাপ শুরুর আগে সংবাদ সম্মেলনে যে উচ্ছ্বাস, যে মজা করলেন; তা অনেক ‘সেরা’ খেলোয়াড়ও করতে পারেন না। দিনশেষে আপনি যখন স্কোরকার্ড ভুলে শুধুই টুকরো টুকরো ছবিগুলোর দিকে তাকাবেন, তখন দেখবেন সেঞ্চুরি নয়, পাঁচ উইকেট নয়; স্মৃতির পাতাটা দখল করে আছে স্যামি-গেইলদের ওই উচ্ছ্বাসের ছবি। এই উচ্ছ্বাস করতে বোল্ট হতে হয় না, এই উচ্ছ্বাস করতে ভিভ হতে হয় না। এই উচ্ছ্বাস করতে চাই শুধু প্রাণ আর প্রাণ। অত্যন্ত আফসোসের সঙ্গে আমাদের বলতে হচ্ছে, সেমিফাইনালে ক্যারিবীয়দের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে আসলে এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেই প্রাণেরই বিদায় হয়ে গেল।