ভারতের লোকসভা নির্বাচনের চাকা ঘুরতে শুরু করেছে। সবারই জানা লড়াইটা হবে মূলত প্রধান দুই দল কংগ্রেস ও ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) মধ্যে। আগে প্রায় প্রতিটা নির্বাচনেই কংগ্রেস থাকতো ‘ফেবারিট’। আর বিজেপিসহ অন্য দলগুলো থাকতো ‘আন্ডারডগ’ হিসেবে। কিন্তু এবারই প্রথম দেখা গেল যে ভোটের আগেই নাস্তানাবুদ কংগ্রেস। আর যেন জিতে বসে আছে বিজেপি। প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার তো দোলক ঘড়ির মতো দুলছে বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদীর সামনে! কি জানি হয়তো বিরোধী দলের আসনে বসার জন্য মনে মনে তৈরি হয়ে আছে কংগ্রেস!
বিজেপি ভারতের মানুষের কাছে কোনো ‘ত্রাতা’ নয়। গণমানুষের ভালোবাসায় সিক্ত কোনো দল নয় আদভানি, মোদীর দল। বরং বিভিন্ন সময় সামপ্রদায়িক দাঙ্গায় সংখ্যালঘুদের রক্তে সিক্ত হবার কলঙ্ক জড়িয়ে আছে দলটির নামের সাথে। তাহলে কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো? কংগ্রেস কেন হঠাত্ করে জাতীয় ভিলেন হয়ে গেল আর বিজেপি হলো সুপারহিরো?
আসলে দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধিসহ অসংখ্য ইস্যু এবার কংগ্রেসের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। বিজেপি এই ইস্যুগুলোকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষের মন ভালোই তাতিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া লোকপাল বিল নিয়ে আন্না হাজারের আন্দোলন কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ভালোই ক্ষেপিয়ে তুলতে পেরেছে মানুষকে। এই সুযোগে উত্থান হয়েছে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের। তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে আম জনতার জন্য গঠন করেছেন আম আদমি পার্টি। অনেক বিশ্লেষকের ধারণা আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনই সবচে’ বেশি ক্ষতি করেছে কংগ্রেসের। কংগ্রেস ছিল ক্ষমতায়। আন্না হাজারে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে আইন চান, আর কংগ্রেস তা নিয়ে টালবাহানা করতে থাকে। এতে অনেকেরই ধারণা তৈরি হয়, কংগ্রেস বোধহয় দুর্নীতিবাজদের সাজা চায় না। একারণে লোকপাল বিল নিয়ে টালবাহানা করছে। এর বাইরে কংগ্রেসের কিছু মন্ত্রীর নাম বিভিন্ন বড় বড় কেলেংকারির সাথে জড়িয়েছে গত পাঁচ বছরে। মিডিয়াও এসব ঘটনা ফলাও করে প্রচার করে ঘোল খাইয়ে ছেড়েছে ক্ষমতাসীন দলটির। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়েরও যে ইমেজ গত দশ বছর ধরে ছিল, হঠাত্ করে তার বিরুদ্ধেও উঠতে থাকে নানা অভিযোগ। যদিও মিডিয়ার খবর অনুযায়ী কোনো দুর্নীতির সাথে মনমোহন সরাসরি জড়িত ছিলেন না। তারপরেও মানুষ পরিবর্তনকে ভালোবাসে। একঘেয়েমিকে অপছন্দ করে। যেকারণে হয়তো দুটি মন্দের মধ্যে ভালো হিসেবে বিজেপিকেই বেছে নিতে চাইছে তারা।
বিজেপি জোট যে এবার ক্ষমতায় যাবে এমন গ্যারান্টি আসলে কেউ দিতে পারে না। ভোট গণনা হবে ১৬ মে। সেদিনই জানা যাবে কার ভাগ্যের শিকে ছিঁড়লো। কিন্তু জনমত জরিপগুলো যে আভাস দিচ্ছে তাতে কপাল খুলতে যাচ্ছে হয়তো বিজেপিরই।
নির্বাচন নিয়ে ভারত জুড়ে চালানো প্রায় সবগুলো জনমত জরিপের ফলাফলে বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোট এগিয়ে আছে। সর্বশেষ জি নিউজ-তালিম রিচার্স, এনডিটিভি, সিএনএন-আইবিএন এবং এর আগের এবিপি আনন্দ-এসি নিয়েলসন, ইন্ডিয়া টুডে-সি ভোটার এবং আইবিএন-সিএসডিএস সব ফলাফলেই ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে কেন্দ্রে সরকার গড়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছে এনডিএ। তার অনেক পেছনে রয়েছে ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ বা সংযুক্ত প্রগতিশীল মোর্চা। এমনকি একশ’র কম আসনও তাদের কপালে জুটলে অবাক হবার কিছু থাকবে না।
জি গ্রুপ ও তালিম রিসার্চ ফাউন্ডেশন কর্তৃক পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পেতে পারে বিজেপি। এর বিপরীতে কংগ্রেসের পাওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ১৯ দশমিক ৯ শতাংশ ভোট। জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, বিজেপি এককভাবে পেতে পারে ২১৫টি থেকে ২২৫টি আসন। যেখানে কংগ্রেস পেতে পারে ১২১টি থেকে ১৩২টি আসন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী পদে নরেন্দ্র মোদীকে পছন্দ করছেন ৪৫ দশমিক ৭ শতাংশ ভোটার। তার প্রতিদ্বন্দ্বী রাহুল গান্ধীকে পছন্দ করছেন ২১ দশমিক ৩ শতাংশ ভোটার। অপরদিকে, এনডিটিভির জরিপে দেখা গেছে এনডিএ জোট ২৫৯টি আসন পেতে পারে। এর সঙ্গে আরো ১১৮টি আসন যোগ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। এনডিএ-এর প্রতিপক্ষ কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট পেতে পারে ১২৩টি আসন। অর্থাত্ কোনো হিসেবেই কংগ্রেসের এবার ক্ষমতায় ফিরে যাবার সম্ভাবনা থাকছে না। যদি জরিপের ফল সত্য বলে ধরে নিতে হয়।
নির্বাচনের ফল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত কেবল ‘যদি’র উপর ভর করে হাঁটতে হবে সবাইকে। কংগ্রেস চায় জরিপ মিথ্যা হয়ে যাক। দলীয় সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী মুখে সেটাই বলেছেন। তিনি জনগণকে এসব জরিপে বিভ্রান্ত না হয়ে নিজেদের কাণ্ডজ্ঞান ব্যবহার করে ভোট দিতে বলেছেন। এমনটি নির্বাচন কমিশনে কংগ্রেস আবেদন জানিয়েছিল এসব জরিপ টরিপ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হোক। কারণ এগুলো মানুষকে বিভ্রান্ত করে। জরিপ দেখে অনেকে প্রভাবিত হয়। জরিপের ফল বাস্তবে ফলে না এমন মন্তব্য করেছেন কংগ্রেসের অনেক নেতা।
কিন্তু আসলে কি তাই? জরিপ মানেই তো বাস্তব জনমত। মানুষ যা ভাবে সেটাই তার কাজে প্রতিফলিত হয়। সেটা কংগ্রেসও ভালো করে জানে। প্রাক-নির্বাচনী ফলাফল জরিপের তথ্য ৭০ শতাংশ পর্যন্তও ফলে যেতে পারে। যদি তাই হয়, তবে বিজেপির জয়ের সম্ভাবনাই বেশি। তাদের নেতৃত্বেই হয়তো গঠিত হবে ভারতের ১৬তম লোকসভা। কিন্তু সোয়া শতাব্দীর চেয়ে বেশি পুরোনো রাজনৈতিক দল হিসেবে কংগ্রেসের নির্বাচন মোকাবিলার অভিজ্ঞতা অন্যদের তুলনায় একটু আলাদা। তাই দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে আহত বাঘের ন্যায় তারা যদি ঘুরে দাঁড়িয়ে মারণ ছাবল মারতে পারে তবে কি জানি, হয়তো পাশার চাল উল্টেও যেতে পারে!
