নানান বৈচিত্র্যের ছোঁয়া নিয়ে পাহাড়ে আসে নতুন বছর। পুরোনো বছরকে বিদায় আর নতুন বছরকে নানান আয়োজনে স্বাগত জানায় পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসকারী আমাদের আদিবাসী সমপ্রদায়। পার্বত্য অঞ্চলের বর্ষবরণের উত্সবের মূল নাম ‘বৈসাবি’। কোনো কোনো আদিবাসীরা আগে এ উত্সব পালন করতেন ‘বৈসুক’ নামে, কেউ আবার ‘সাংগ্রাই’ আবার কেউ ‘বিজু’ নামে। তবে পুরো পার্বত্য এলাকায় এ উত্সব এখন বৈসাবি নামেই পরিচিত। বৈসুক, সাংগ্রাই আর বিজু এই তিন নামের আদ্যাক্ষর নিয়েই বৈসাবি শব্দের উত্পত্তি। পাহাড়িদের এ উত্সব মূলত হয় চৈত্রের শেষ দু’দিন এবং বৈশাখের শুরুর দিনটায়। চলুন দেখে আসি পাহাড়ের বর্ষবরণ উত্সব
বান্দরবান
বান্দরবান শহরের মারমা সমপ্রদায় নানা আয়োজনে পালন করে এ উত্সব। তাদের মূল উত্সব হয় চৈত্র সংক্রান্তি, পয়লা বৈশাখ এবং এর পরের দিনটায়। দিন তিনটিকে যথাক্রমে পাইং ছোয়াই, সাংগ্রাই আফ এবং সাংগ্রাই আপ্যাইং নামে পালন করে থাকে তারা। এবারের চৈত্র সংক্রান্তিতে বান্দরবান শহরে বর্ণিল শোভাযাত্রা বের করবে মারমা সমপ্রদায়ের লোকজন। শোভাযাত্রাটি শহরের অলিগলি ঘুরে বেড়াবে। পয়লা বৈশাখের দিন বিকেলে তাদের উত্সবের নাম বুদ্ধের স্নান। এলাকার সব বুদ্ধ মূর্তিকে এদিন জড়ো করা হবে সাঙ্গুর পাড়ে। সাঙ্গুর জলে বুদ্ধকে স্নান করাতে সব বয়সের মারমারা জড়ো হবেন জায়গাটিতে। শেষের দিনে রয়েছে মারমাদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় উত্সব পানি খেলা। এর নাম মৈত্রী বারি বর্ষণ উত্সব। শহরের বোমাং রাজবাড়ির মাঠে মারমা তরুণ-তরুণীরাই পানি খেলায় অংশ নেবেন। মাঠের একপাশে সামিয়ানার নিচে দুইপাশে দুটি নৌকা ভর্তি জল রাখা হয়। আর নৌকার দুই পাশে দু’ দলে বিভক্ত হয়ে বিশেষ পোশাকে থাকেন তারা। এরপরে একদল আরেক দলকে জল মারতে থাকে আনন্দের সঙ্গে। এদিন বান্দরবান শহরের সড়কে যাকেই সামনে পায় শিশুরা তাকেই ফিচকারি দিয়ে পানিতে ভিজিয়ে দিতে চেষ্টা করে। কিভাবে যাবেন :ঢাকা থেকে সরাসরি বান্দরবান যায় এস আলম সার্ভিস (০২-৯৩৩১৮৬৪), ডলফিন পরিবহন, সৌদিয়া পরিবহন (০২-৯৩৩৮৫১০) এবং ইউনিক সার্ভিস (০২-৯০০২৭১০)। প্রতিদিন সকালে ও রাতে ছাড়ে বাসগুলো। ডলফিন পরিবহনের বাস ছাড়ে কলাবাগান ও মতিঝিল ইস্পাহানি বিল্ডিং-এর পাশ থেকে। আর এস আলম, সৌদিয়া পরিবহন ও ইউনিক সার্ভিস ছাড়ে ফকিরাপুল ও কমলাপুর থেকে। ভাড়া ৩০০-৩৫০ টাকা। এ ছাড়া যেকোনো বাস অথবা ট্রেনে চট্টগ্রাম এসেও বাসে বান্দরবানে যাওয়া যায়। চট্টগ্রাম থেকে বান্দরবানের বাসগুলো ছাড়ে বদ্দারহাট বাস স্টেশন থেকে। সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উভয় রুটে পূর্বানী ও পূরবী পরিবহনের বাসগুলো চলাচল করে, ভাড়া ৬০-৭০ টাকা। বান্দরবান থেকে কক্সবাজারও যায় পূর্বানী ও পূরবী পরিবহনের বাস। ভাড়া ৮৫ টাকা।
কোথায় থাকবেন:শহরের বাইরে পর্যটন মোটেল (০৩৬১-৬২৭৪১, ০৩৬১-৬২৭৪২, এসি দ্বৈত কক্ষ ১ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৭৫০ টাকা, নন এসি দ্বৈত কক্ষ ৮৫০ থেকে ২ হাজার টাকা) ও মেঘলা টুরিস্ট রিসর্ট (০৩৬১-৬২৫০৬, প্রতি কক্ষ ২ হাজার টাকা)। শহরের ভেতরে-হোটেল প্লাজা বান্দরবান (০৩৬১-৬৩২৫২, ০১৬৭৮০৬০১০৭, এসি দ্বৈত কক্ষ ২ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা, নন এসি দ্বৈত কক্ষ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, নন এসি একক কক্ষ ৮০০ টাকা)।
রাঙ্গামাটি
রাঙ্গামাটি শহরে চাকমা সমপ্রদায় এ তিন দিনকে যথাক্রমে ফুল বিজু, মূল বিজু এবং গজ্জ্যেপজ্জ্যে নামে পালন করে থাকে। চৈত্র সংক্রান্তিতে শুরুর দিনটায় তারা নিজ নিজ ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে। ছেলেমেয়েরা খুব ভোরে ফুল সংগ্রহ করে ঘর সাজায়। খুব সকালে কাপ্তাই লেকে ফুল ভাসায় তারা। দ্বিতীয় দিনে সবার ঘরে নানান পদের খাবারের আয়োজন থাকে। প্রত্যেকে প্রত্যেকের ঘরে যায় এদিন। সবার ঘরেই এদিন রান্না করা হয় বিভিন্ন রকম সবজি দিয়ে বিশেষ এক পদ ‘পাজন’। শেষ দিন বিহারে ধর্মানুষ্ঠানের আয়োজন থাকে। শেষ দিনে মারমা সমপ্রদায়ের বিশেষ আয়োজন হলো ‘রিলং পোয়েহ্’ বা পানি খেলা। ত্রিপুরা সমপ্রদায় এ দিন তিনটিকে পালন করে থাকে হারি বৈসুক, বৈসুকমা এবং বিসিকাতাল নামে। শুরুর দিনটায় তারাও নিজ নিজ ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে। ছেলেমেয়েরা খুব ভোরে ফুল সংগ্রহ করে ঘর সাজায়। কিশোর-কিশোরীরা বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের স্নান করায়। দ্বিতীয় দিনে ঘরে ঘরে থাকে নানান খাবারের আয়োজন। ত্রিপুরা সমপ্রদায় এদিন আয়োজন করে থাকে গড়াইয়া নৃত্যের।
কিভাবে যাবেন :ঢাকার কলাবাগান, ফকিরাপুল ও কমলাপুর থেকে সরাসরি রাঙ্গামাটি যায় ডলফিন পরিবহন (০১৭৩১৮২৩৭২১), এস আলম (৯৩৩১৮৬৪), সৌদিয়া পরিবহন (০১৯১৯৬৫৪৮৫৭), শ্যামলী পরিবহন (৭৫৪১০১৯), ইউনিক সার্ভিস (০১৯১৮০৬৪৪৭) ইত্যাদি। ভাড়া জনপ্রতি ৩৫০-৩৮০ টাকা। শ্যামলী পরিবহনের একটি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত বাস ঢাকা থেকে প্রতিদিন রাত দশটায় এবং রাঙ্গামাটি থেকে সকাল সাড়ে দশটায় ছাড়ে। ভাড়া ৫০০ টাকা। এ ছাড়া যেকোনো বাস, ট্রেন কিংবা বিমানে চট্টগ্রাম এসে সেখান থেকেও রাঙ্গামাটি আসতে পারেন।
কোথায় থাকবেন :রাঙ্গামাটি শহরে পাশে পর্যটন কমপ্লেক্সের ভেতরে পর্যটন মোটেল (০৩৫১-৬৩১২৬, ঢাকা অফিস ৮১১৭৮৫৫-৯, ৮১১৯১৯২, এসি দ্বৈত কক্ষ ১ হাজার ৭২৫ টাকা, নন এসি দ্বৈত কক্ষ ৮০৫ টাকা)। শহরের কাঁঠালতলীতে হোটেল সুফিয়া (০৩৫১-৬২১৪৫, এসি একক কক্ষ ৯০০ টাকা, এসি দ্বৈত কক্ষ ১ হাজার ২৫০ টাকা, নন এসি দ্বৈত কক্ষ ৮০০ টাকা )। রিজার্ভ বাজারে হোটেল গ্রীন ক্যাসেল (০৩৫১-৬৩২৮২, ০১৭২৬৫১১৫৩২, এসি কক্ষ ১ হাজার ১৫০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা, নন এসি কক্ষ ৭৫০-১ হাজার ৫০০ টাকা)। কলেজ গেট এলাকায় মোটেল জজ (০৩৫১-৬৩৩৪৮, ০১৫৫৮৪৮০৭০১, এসি কক্ষ ৯০০-১ হাজার ১০০ টাকা, নন এসি কক্ষ ৩৫০-৭০০ টাকা)।
