জ্যৈষ্ঠের অসহ্য তাপ-উত্তপ মাঝপথেই শেষ হয়ে গেল। খতম ভোট প্রচারের রুচিহীন বিদ্রুপ আর উত্তেজিত রাজনীতির বে-আবরু আবহ। পুঞ্জীভূত মেঘ বুকে নিয়ে হাসছে মহাপ্রকৃতি। হাসছে ভূজমিনের চরাচর। প্রাণ ভরিয়ে, তৃষা হরিয়ে চারপাশে ভাসছে কারো কারো স্বস্তির স্পন্দন। আকাশের উড়ন্ত মেঘমালা পরকীয়া প্রেমের কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি নিয়ে এই বুঝি নেমে আসবে নীচে। ছড়িয়ে দেবে বারিধারা। যে ধারায় ভিজতে থাকবে সম্ভাব্য ভোট জয়ীদের উল্লাস আর রং ছড়ানোর উচ্ছাস। প্রকৃতি ও মানুষের ইচ্ছার এ মিলনের পূর্বাভাস দেখে আমরা খানিকটা বিস্মিত। গতকালই একটি যত্সামান্য লেখায় বলেছি, সদ্যসমাপ্ত ভোটে এগিয়ে আছে বিজেপি। আরো এক বিস্ময়ের অপেক্ষায় ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র। ‘সকালে ঘুম থেকে উঠেই এক চ্যানেল থেকে আরেক চ্যানেলে চোখ ছুটছে, ঘন ঘন খবর আসছে, নিরষ্কুশ ক্ষমতা নিয়ে ফিরছে বিজেপি। পোস্টার ব্যালটের গণনা শেষ হতেই ছবি আরো পরিষ্কার, তুঙ্গে নরেন্দ্র মোদির বৃহস্পতি। দুপুর ১২টা পর্যন্ত গণনায় মোদি আর গেরুয়া শিবিরের নিশ্চিয়তা বাড়ল আরো। উত্তর থেকে দক্ষিণে, পূর্ব থেকে পশ্চিমে, প্রায় সব রাজ্যে নরেন্দ্রময়তা অক্ষত। আবার তার নেতৃত্বেই দিল্লিতে সরকার হবে। গেরুয়া শিবিরের এনডিএ শরিকদের কেউ কেউ যদি কোনো কারণে বেঁকেও বসেন, তাতেও মোদির সংকট নেই। মসনদে স্থিতি তার সুনিশ্চিত।
ভারতের গণতন্ত্রের ইতিহাসে নেহরুর পর এ আরেক দৃষ্টান্ত। ৪৭ থেকে ষাটের দশকের গোড়া পর্যন্ত প্রশ্নহীন জনরায় নিয়ে সরকার গড়েছেন জহরলাল। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত, অপরাজয়ে তার ক্যারিশমা। অম্লান ছিল গ্রহণযোগ্যতা। মোদির ঐ ভাবমূর্তি নেই। নেই প্রশ্নাতীত স্বীকৃতি। তার রাজনীতির বিতর্কিত হিন্দুত্ব নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে, সংশোধনহীন একমুখিতার জেদ আর বিস্তার জারি থাকলে ভবিষ্যতেও তাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড়াতে হবে; কিন্তু যে জনপ্রিয়তা, যে কৌশলী দৃষ্টিভঙ্গি তাকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলেছে, হাল আমলের রাজনীতিতে তার কোনো জুড়ি নেই। প্রসঙ্গত মনে রাখা জরুরি, নরেন্দ্র মোদির ভারতবোধে জনতার রায় আর সায় অসামান্য। পরপর জনসমীক্ষায় দেখা গেছে যে নেহরু আর শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর পর তিনিই সবচেয়ে বেশি চিত্তজয়ী প্রধানমন্ত্রী। ৭১-এ বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে সর্বস্তরের জনতার সমর্থন নিয়ে ভোটে জিতলেন ইন্দিরা। তার ব্যক্তিত্ব আর ক্ষমতার দৃঢ়তায় অবাক বিশ্ব। ওই ইন্দিরাকেই নিজের ভুলের খেসারত দিতে হলো ৭৭-এর নির্বাচনে। কংগ্রেস হেরে গেল। ক্ষমতায় এল জনতা দল, ইন্দিরার কঠোরতম সমালোচক মোরারজি দেশাইয়ের নেতৃত্বে। বিজেপি তখন বাড়ছে। জনতা দলের ভেতরে-বাইরে তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। জনতা সরকার ক্ষমতার দ্বন্দ্বে মুখ থুবড়ে পড়ল। ভোটে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরলেন ইন্দিরা। আত্মঘাতীর গুলিতে মৃত্যু না হলে হয়তো আবার ফিরে আসতেন। শিখ গণহত্যার ভয়ংকর বিপর্যয়ের পরেও গণতন্ত্রের স্থিতিকে উঁচু করে রেকর্ড ভোটে ফিরে এল কংগ্রেস। রাজীব এবার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। পরের ভোটে বিরোধী ঐক্যে চুরমার কংগ্রেসের স্থাপিত প্রতিষ্ঠা। দিল্লিতে তখন দিশাহীন রাজনীতি। প্রধানমন্ত্রী পদে বারবার বদল। স্থায়িত্বের স্বপ্ন নিয়ে জনভোট বিজেপিকে বেছে নিল। ১৩ দিনের মোড়ে গদি হারালেন অটলবিহারী। এরকম টালমাটাল পরিস্থিতিতে ভারতে প্রবেশ করল জোট রাজনীতি। একদিকে ডানপন্থি বিজেপি অন্যদিকে মধ্যপন্থি, আঞ্চলিক ও সর্বভারতীয় কংগ্রেস। স্থিতিহীনতা মানল না জনশক্তি। ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনল অটলকে। ২০০৪ ভোটে হেরে গেল তার দল, দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এনডিএ। পরপর দুইবার প্রধানমন্ত্রী হলেন মৃদুভাষী অর্থনীতিবিদ মনমোহন সিং। ২০১৪-য় মোদি ঝড়ে উড়ে গেল কংগ্রেসের তখত-এ-তাউস।
সপ্তদশ লোকসভা ভোটে আমরা অনেকেই নিঃশব্দ মোদি হাওয়া টের পাইনি। তার সভায় উপচে পড়া ভিড়, কখনো আক্রমণাত্মক, কখনো আত্মরক্ষাত্মক, ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি, সন্ত্রাস দমনের অঙ্গীকার, মজবুত ভারত গড়ার স্বপ্নকে হেসে উড়িয়ে দিয়েছি এলিটিস্ট ভঙ্গিতে। বিরোধী ফেডারেল জোট বা মহাজোটের যাবতীয় ইস্যু-ডিমনিটাইজেশন থেকে বালাকোটের জঙ্গি ঘাঁটিতে হামলার প্রমাণিত, অপ্রমাণিত বাস্তবকে সাধারণ মানুষ সত্যের মহিমা দিয়ে বরণ করল। আবার নিশ্চিত করে তুলল মোদির একাধিপত্যকে। নেহেরু, ইন্দিরা আর মনমোহনের পর তিনিই একমাত্র প্রধানমন্ত্রী, যিনি দ্বিতীয়বারের জন্য ক্ষমতার শীর্ষে বসবেন। এবারের ভোটের বৈশিষ্ট্য, মোদির চেয়ে অনেক বেশি সভা করেছেন রাহুল। তার সাংবাদিক বৈঠকের সংখ্যাও ৫০-এর অধিক। মোদি গত পাঁচ বছরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছেন কুল্লে একবার। তাও সাতদফা ভোটের পরদিন। ভোট হয়েছে মোদি বনাম বিরোধী ঐক্যজোট আর কংগ্রেসের মধ্যে। মমতা বনাম মোদির জবরদস্ত মোকাবিলাও অবাক হয়ে দেখতে পেল ভারত। বিজেপি নয়, এন ডি এ নয়, মোদিই সবার টার্গেট। মোদির তীরের তীক্ষ্নতার লক্ষ্য প্রধানত রাহুল আর মমতা। ব্যক্তিগত, অরাজনৈতিক আক্রমণ, রটনা আর কুত্সায় কেউ কাউকে ছাড় দেননি। বিরোধীরা যেমন ভুলে গেলেন নরেন্দ্র মোদি বিজেপির মুখ হলেও, তার বড় পরিচয় দেশের প্রধানমন্ত্রী। তাকে তুই-তুকারি করা যায় না। তার গালে ‘গণতন্ত্রের থাপ্পড়’ দেওয়া অসঙ্গত। মোদি কিংবা তার সহপ্রচারক অমিতশাহও এড়িয়ে গেলেন, গণতন্ত্রে তর্ক-বিতর্ক চলবে, জোরগলায় প্রচার চলবে; কিন্তু ব্যক্তিস্তরের কুত্সা, অপবাদ গণতান্ত্রিকতার উচ্চতাকে খর্ব করে, ভোটপ্রচারকেই হাস্যকর করে তোলে। ভারতের মতো শক্তিমান গণতন্ত্রে আমাদের রাজনীতিকরা, আমাদের জনসেবকরা, সেবকদের অনুগামীরা ক্ষমতা রক্ষার লড়াইয়ে অথবা ক্ষমতা অর্জনের জন্য যে কালো অধ্যায় রচনা করলেন, তা ইতিহাস একদিন হিসেব করবে।
আরেকটি কথা। ভোটের আগে, ভোটপর্বে বলা হয়েছিল হিন্দিবলয়ে বিজেপির বিপর্যয় ঘটবে। উত্থান ঘটবে আঞ্চলিক রাজনীতির। গণনার বিভিন্ন রাউন্ড খতিয়ে দেখা যাচ্ছে, হিন্দিভাষী এলাকায় বিজেপি তার ১৪ সালের গ্রহণ যোগ্যতা হারায়নি। ভোটশেয়ার খুব একটা কমেনি। বরং উত্তরে ও দক্ষিণে বেড়েছে। বেড়েছে বাংলার মতো বহুত্ববাদী, বিভেদহীন রাজ্যেও। দুঃসাহসী মমতার প্রায় ঘাড়ের ওপর এই প্রথম জোর নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করল গেরুয়া শিবির। তৃণমূলের অর্জিত ভোটের অঙ্ক এখনো বেশি। ৪৫ শতাংশের ওপরে। সেখানে বিজেপি ২৪ শতাংশ থেকে বাড়ালো শতকরা ৩৯-এ। আসন জয়ে অবশ্যই অপ্রতিরোধ্য বাংলার সবচেয়ে বড় দল তৃণমূলের ক্ষমতা অটুট থাকবে; কিন্তু বাম-কংগ্রেসের বর্তমান অন্ধকার। ভবিষ্যতে নেমে আসছে বিদঘুটে আঁধার। এপর্যন্ত যে হিসাব মিলেছে, বামপন্থিদের ভোট শেয়ার মাত্র ৭.১ শতাংশ। কংগ্রেসের ৫.৪০। সর্বভারতীয় স্তরে অবশ্য তাদের (কংগ্রেস) আসন বাড়বে। বাড়বে ভোটের হার।
প্রশ্ন উঠতে পারে, বিরোধী ঐক্যের প্রবল তোড়জোড়, চৌকিদার প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে লাগামহীন অভিযোগ, প্রতিষ্ঠান বিরোধীতা সত্ত্বেও কোন পথ বেয়ে এল নরেন্দ্র মোদির সাফল্য? সংক্ষিপ্ত উত্তর, জনরায় স্থিতিশীল সরকার চেয়েছে। দ্বিতীয়ত, মোদির নেতৃত্বে মজবুত রাষ্ট্রের স্লোগানকে, সন্ত্রাসদমনের অঙ্গীকারকে ভরসা ভেবেছে। তৃতীয়ত, জাতীয়তাবাদের উগ্রতার ফিসফাসেও তারা আশ্বস্ত। চতুর্থত, কংগ্রেস ফেডারেল জোটকে আমল দেয়নি। লড়ছে এককশক্তির কল্পিত, অনাশ্রিত গরিমা নিয়ে। এটাই তার বিপর্যয়ের প্রধান হেতু। ফেডারেল জোটও আভ্যন্তরীণ দুর্বলতা, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা এড়াতে পারল না। নিজ নিজ রাজ্যেই তারা আটকা পড়ে গেল। মমতার মতো জনমুখী জনপ্রিয়, অগ্নিবর্ষী নেত্রীও প্রচারে রাজ্যের বাইরে যাবার বিশেষ ফুরসত্ পেলেন না। তার শ্রম, তার নিষ্ঠা, তার একাগ্রতা পাহাড়ের মতো কঠিন, দুর্ভেদ্য। তবুও গেরুয়া কানাঘুষা বাংলার বহুত্ববাদী ঐতিহ্যের উপকণ্ঠে ঘনঘন নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ পেয়ে গেল। বাস্তবতাকে উড়িয়ে দেওয়া অন্যায়। জনরায়কে মান্যতা দিয়েই এবার হয়তো শুরু হবে নবতর অভিযান।
লেখক n ভারতীয় সাংবাদিক, আরম্ভ পত্রিকার সম্পাদক
mail: [email protected]
