মনে আছে বেশ কয়েক বছর আগে আমি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বলেছিলাম আমাদের দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আসলে মৃত্যুপথযাত্রী, সেটা জেনেশুনেও আমরা তার হাত ধরে বসে আছি শুধু তার মৃত্যুযন্ত্রণা একটুখানি কমানোর জন্য। আমি জানি এটি অত্যন্ত নিষ্ঠুর একটা বক্তব্য— অনেক দুঃখে এরকম একটা বক্তব্য দিয়েছিলাম। তারপর অনেক বছর কেটে গেছে আমি যদি এখন নিজেকে সেই একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করি তাহলে আমি কী উত্তর দেব? পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ভয়ংকর দুঃসময় কি কেটে গেছে? এখন কি আমরা বলতে পারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সত্যিকারের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে শুরু করেছে?
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্পর্কে বাইরের পৃথিবী কী বলে? কিছুদিন আগে অস্ট্রেলিয়া গিয়েছিলাম। সেখানে আমাদের ছাত্রছাত্রীরা আমাকে ভয়াবহ একটা তথ্য দিয়েছে। আমাদের দেশের দুই একটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্নাতক ডিগ্রিটাকেও তারা স্বীকার করে না। সেটাকে একটা ডিপ্লোমার সমান ধরে নেয়। কী লজ্জার কথা! এজন্য নিশ্চয়ই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক দায়ী না— দায়ী হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। অস্ট্রেলিয়া থেকে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল সেই তথ্য পাঠানো হয়নি। ব্যক্তিগতভাবে পাঠিয়ে দিলে হবে না। যাদের দায়িত্ব তাদের পাঠাতে হবে এবং শুধু একবার পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত হলে হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত বিষয়টি নিষ্পত্তি না হচ্ছে ততক্ষণ এর পিছনে লেগে থাকতে হবে। সেগুলো করা হয়নি।
ষোলো কোটি দেশের সবচেয়ে ভালো ছেলে-মেয়েরা সারা পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো ছেলে-মেয়ে, শিক্ষকেরা সারা পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো শিক্ষক। কাজেই তারা যে ইউনিভার্সিটির ছাত্র এবং শিক্ষক সেই ইউনির্ভাসিটিগুলো পৃথিবীর প্রথম কয়েক হাজারের ভেতর নেই এই তথ্যটি কোনোভাবেই সঠিক তথ্য নয়; কিন্তু যেহেতু র্যাংকিংয়ে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, বুঝতে হবে কোথাও আমরা কিছু গোলমাল করেছি। অনুমান করছি কোনো একধরনের র্যাংকিংয়ে বিবেচিত হতে হলে যে প্রক্রিয়ায় সেই তথ্য পাঠাতে হয় আমরা নিশ্চয়ই সেভাবে সেই তথ্য পাঠাইনি। যেহেতু সারা দেশে এটা নিয়ে হইচই হচ্ছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মুখ কাচুমাচু করে নানা রকম কৈফিয়ত দিয়ে যাচ্ছে তাই আমি মনে করি এখন সময় হয়েছে আমাদের র্যাংকিংয়ে অবস্থানগুলো জানার। প্রতি বছর সারা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে ছাত্রছাত্রীরা আন্তর্জাতিক প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। সেই প্রথম একশ থেকে একশ পঞ্চাশটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝে আমাদের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় নিয়মিতভাবে অংশ নিচ্ছে কাজেই আমরা সারা পৃথিবীর মাঝে নিজেদের র্যাংকিং নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগব সেটা তো হতে পারে না।
তবে আমি খুব মজা পেতাম যদি দেখতাম আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বুক ফুলিয়ে বলতো ‘আমরা এই র্যাংকিংয়ের থোড়াই কেয়ার করি! আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে অমুক অমুক গবেষক নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন, প্রতি বছর এতো হাজার পেপার প্রথম শ্রেণির জার্নালে প্রকাশিত হয় এতোগুলো পেটেন্ট ফাইল করা হয়। অমুক অমুক শিক্ষক আন্তর্জাতিক মানের তারা অসুক অসুক জার্নালের এডিটরিয়াল বোর্ডের সভাপতি, প্রতি বছর আমাদের এতো হাজার পিএইচডি বের হয়। এতোগুলো দেশ থেকে এতোজন ছাত্রছাত্রী নিয়মিত ভাবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এতোগুলো হাইটেক কোম্পানি স্পিন অফ করে বের হয়েছে। এখন তারা এতো বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি, সেখানে এতোজন গবেষক ইঞ্জিনিয়ার কাজ করে ইত্যাদি ইত্যাদি’। দুর্ভ্যাক্রমে আমরা এগুলো কিছুই বলতে পারছি না তাই সোস্যাল মিডিয়া এবং খবরের কাগজে গালমন্দ অপমান সহ্য করতে হচ্ছে। (আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সার্চ ইঞ্জিন সংক্রান্ত একটা কোম্পানি স্পিন অফ করে বের করার চেষ্টা করা হয়েছিল। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ সরাসরি না করে দিয়েছে। যখন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে তারা জানিয়েছে আগে যেহেতু কখনো এধরনের কিছু করা হয়নি তাই তারা কিছুই বলতে পারছে না।)
যাই হোক, দেখাই যাচ্ছে বাইরের পৃথিবীর সামনে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধর্তব্যের মাঝেই নেই; কিন্তু আমাদের নিজেদের মূল্যায়ন কী? একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বময় হর্তাকর্তা হচ্ছেন ভাইস চ্যান্সেলর। তাদের কী পরিমাণ ক্ষমতা সেটি বাইরের মানুষের পক্ষে কল্পনা করা পর্যন্ত সম্ভব নয়। এখন প্রশ্ন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভাইস চ্যান্সেলরদের কী ঠিকভাবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে?
নিজের কানে শোনা দুইজন ভাইস চ্যান্সেলরের দুইটি উক্তির কথা বলি। একজন সরাসরি আমাকে বলেছেন ‘যদি কোনো ভাইস চ্যান্সেলর দাবি করে সে কোনো ধরনের লবিং না করে ভাইস চ্যান্সেলর হয়েছে, তাহলে বুঝতে হবে হি ইজ এ ড্যাম লায়ার। আরেকজন ভাইস চ্যান্সেলর দায়িত্ব নেওয়ার পর তার আগের ভাইস চ্যান্সেলর সম্পর্কে বলেছেন, ‘তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম পক্ষে ত্রিশ কোটি টাকা নিয়ে গেছেন’। কেউ যেন আমাকে ভুল না বুঝেন আমি মোটেও দাবি করছি না আমাদের সব ভাইস চ্যান্সেলর এরকম; কিন্তু আমি অবশ্যই যথেষ্ট ক্ষোভের সঙ্গে বলছি যদি একজন ভাইস চ্যান্সেলরও এরকম হয় আমি সেটাও মানতে রাজি নই।
আমি অবশ্যি আমার জীবনে একজন অসাধারণ ভাইস চ্যান্সেলর পেয়েছিলাম। তিনি প্রফেসর মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান। একবার বিশ্ববিদ্যালয়ে গুন্ডামি করার কারণে ছাত্রলীগের ছেলেদের শাস্তি দেওয়ার অপরাধে তারা আমাকে এবং তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছিল। দেখতে ছোটখাটো কিন্তু সুঃসাহসী মানুষ ছিলেন। কখনো কোনে চাপের মুখের মাথা নোয়াতেন না। একবার কোনো একটি একাডেমিক কাউন্সিলে তার সঙ্গে আমার তুমুল তর্ক বিতর্ক ঝগড়া হলো। একাডেমিক কাউন্সিল শেষ হওয়ার পর আমি বের হয়ে ফিরে যাচ্ছি তখন বিএনপি-জামায়াতপন্থী একজন শিক্ষক আমার কাছে এসে গলা নামিয়ে বললেন, ‘আপনি চালিয়ে যান আমরা আপনার সঙ্গে আছি’!
আমি কেয়ক সেকেন্ড তার দিকে হা করে তাকিয়ে রইলাম তারপর সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে ভাইস চ্যান্সেলর হাবীবুর রাহমানের কাছে ফিরে এলাম। তাকে বললাম ‘স্যার, আমি আপনার সাথে অনেক ঝগড়াঝাটি করেছি, ভবিষ্যতে মনে হয় আরো করব; কিন্তু স্যার আপনাকে বলতে এসেছি আমি আপনাকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করি। এই ঝগড়াঝাটি করি বলে কিন্তু মনে করবেন না আপনার প্রতি আমার শ্রদ্ধা এতোটুকু কমবে। আমি কী করব না করব সব আপনাকে দেখে ঠিক করি’।
প্রফেসর হাবীবুর রহমানের চোখ মুহূর্তের জন্য অশ্রু সজল হয়ে গিয়েছিল।
যাই হোক আন্তর্জাতিক ভাবে র্যাংকিংয়ে বিবেচিত হবার আগে আমরা কী জিজ্ঞেস করতে পারি দেশের সাধারণ মানুষ তাদেরকে কীভাবে র্যাংকিং করবে? প্রতি বছর ভর্তি পরীক্ষার সময় এই দেশের বাচ্চা ছেলে-মেয়েদের এবং তাদের অভিভাবকদের কী পরিমাণ কষ্ট করতে হয় সেটা জানতে দেশের কোনো মানুষের বাকি নেই। এই কষ্টটুকু শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রশাসকরা জানতে পারেননি।
২.
এতক্ষণ পর্যন্ত ক্রমাগত নেতিবাচক কথা বলে এসেছি; কিন্তু এরকম মন খারাপ করা কথা বলে লেখাটা শেষ করতে মন চাইছে না, কোনো একটা ভালো কথা বলে লেখাটি শেষ করতে চাই, কয়েকদিন আগে খবরের কাগজে দেখেছি আমাদের দেশের আটটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় মিলে সম্মিলিত ভাবে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। খবরটি পড়ে আমার বুকটি আনন্দে ভরে গেছে। মনে হয়েছে এই দেশে অন্তত আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আটজন ভাইস চ্যান্সেলর আছেন যারা তাদের শিক্ষকদের নিয়ে এই অসাধরণ কাজটি করতে রাজি হয়েছেন। এই ভাইস চ্যান্সেলর শিক্ষক এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের দেশের সাধারণ ছেলে-মেয়ের জন্য ভালোবাসা রয়েছে। কী চমত্কার একটি ব্যাপার। আমি কীভাবে তাদের কাছে আমার কৃতজ্ঞতাটুকু প্রকাশ করব বুঝতে পারছি না। যদি সামনা সামনি গিয়ে প্রকাশ করার সুযোগ কখনো নাও পাই তারপরেও তাদের জন্য রইল আন্তরিক ভালোবাসা। শুধু আমার নয় এই দেশের লাখ লাখ ছেলে-মেয়ে এবং তাদের অভিভাবকদের কৃতজ্ঞটুকু নিশ্চয়ই তারা অনুভব করবেন।
n লেখক :শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক
