ধর্ম প্রচারে শাহ্ সূফী হযরত বদরশাহ (রহ.)-এর অবদান

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০১৪, ২০:৪২
বারো আউলিয়ার পুন্য এবং ধন্যভূমি চট্টগ্রামে আগত পীর, আউলিয়া, ফকির, দরবেশদের মধ্যে সর্বপ্রথম যিনি আসেন তিনি হলেন প্রখ্যাত সাধক সূফী হযরত শাহ বদর রহমতউল্লাহ। তাঁর প্রকৃত নাম মখদুম শাহ বদরউদ্দীন বদরে আলেম জাহেদী। তিনি বদরশাহ নামেই পরিচিত। চট্টগ্রামে তাঁর আগমন কাল সঠিকভাবে জানা না গেলেও ধারণা করা হয় ১৪০০ শতাব্দীর প্রথম দিকে চট্টগ্রামে আগমন করেন। তখন চট্টগ্রামের অবস্থা এখনকার মত ছিলনা। বর্তমানে চট্টগ্রাম শহরখানি যেখানে অবস্থিত সেখানে পুরো এলাকা জুড়ে বনজঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। বর্তমানে চট্টগ্রাম শহরে পাহাড় জঙ্গঁলের অস্তিত্ব বিরাজমান। এসব পাহাড় পর্বত, বনজঙ্গলে হিংস্র জীব-জন্তু, জ্বীন-পরী, দেওদানব এ পরিপূর্ন ছিল। হযরত বদর শাহ (রহ.) চট্টগ্রাম এসে এসব জ্বীন-পরী দেও-দানব প্রভৃতির কাছ থেকে একচাটি (মাটির প্রদীপ) পরিমাণ জায়গা চেয়ে নেন। তারপর তিনি চাটি জ্বালানোর সাথে সাথে এসব জ্বীন-পরী, দেও-দানব ক্রমেই দূরে সরে গেল। এভাবে তিনি জ্বীন-জন্তুর কবল থেকে এই স্থানটিকে মুক্ত করে আবাদযোগ্য করে তোলেন। তিনি সর্ব প্রথম যে স্থানটিতে চাটি জ্বালিয়ে ছিলেন সে স্থানটি আজো বর্তমান আছে। চট্টগ্রাম শহরের জামাল খাঁন এলাকায় এই স্থানটি অবস্থিত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এই স্থানটিকে মর্যাদার সাথে সংরক্ষণ করেছেন। এখানে প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থী আসেন। চাটি জ্বালিয়ে চট্টগ্রাম শহরকে আবাদ করায় চট্টগ্রামের আদি নাম ছিল চাটিগাঁ। হযরত বদর শাহ (রহ.) এর বংশ পরিচয় সম্পর্কে জানা যায়, হযরত ইমাম শেহাবুদ্দীন মক্কী তাঁর পিতামহ ছিলেন। তাদের আদি নিবাস আরবে। হযরত শেহাবুদ্দীন (রহ.) এর ছেলে হযরত ফখরুদ্দীন (রহ.) কে তিনি গায়েবী এলেম প্রদান করে ভারতে আসার নির্দেশ দেন। হযরত ফখরুদ্দীন (রহ.) ভারতের মিরাঠে এসে অবস্থান করেন। তখন মিরাঠ ছিল বনে জঙ্গঁলে পরিপূর্ণ। তিনি সেখানে অবস্থান করে আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন হয়ে যান। মিরাঠে তাঁর আগমনের পর পুরো এলাকা আবাদ হয়ে যায় এবং বসতি স্থাপনা গড়ে উঠে। মিরাঠে তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তির পরিচয় পাওয়ার পর ক্রমে লোকজন তাঁর কাছে এসে শিষ্যত্ব গ্রহন করতে শুরু করেন। তাঁর নাম চারিদিকে প্রচারিত হতে থাকে। হযরত ফখরুদ্দীন (রহ.) এর ছেলে হযরত শেহাবুদ্দীন (রহ.) তখনকার মিরাঠের শাসন কর্তার হাতে শহীদ হন। হযরত শেহাবুদ্দীন (রহ.) এর পাঁচ সন্তান ছিল। এই পাঁচ সন্তানের মধ্যে বদর শাহ (রহ.) সর্ব কনিষ্ঠ ছিলেন। ছোট বেলা থেকেই তিনি তাঁর বাবার কাছ থেকেই জাহেরী বাতেনী শিক্ষা লাভ করেন। তিনি তার শিক্ষা জীবন সমাপ্ত করে ধর্ম প্রচার করতে করতে চট্টগ্রামে এসে হাজির হন। তিনি চট্টগ্রামে এসে প্রথমে সমুদ্র তীরে আস্তানা গড়ে তুলতে চাইলে স্থানীয় জনসাধারণ তাঁকে এখানে আস্তানা গড়ে তুলতে নিষেধ করেন। কারণ এখানে সমুদ্রের জোয়ার এসে পুরো এলাকা প্লাবিত করে ফেলে। কিন্তু তিনি স্থানীয় জনসাধারণের কথায় কর্নপাত না করে সেখানেই আস্তানা গড়ে তোলেন এবং আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন হলেন। এমনি সময় সমুদ্রে ঝড় তুফান শুরু হল। সমুদ্র গর্জন করে পানি দ্রুত বেগে তাঁর আস্তানার দিকে আসতে লাগল এই অবস্থা দেখে স্থানীয় জনসাধারণ উত্কণ্ঠার মধ্যে পড়ে গেল। কিন্তু হযরত বদর শাত (রহ.) অবিচলভাবে সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে থাকলেন এবং জোয়ারের পানিকে আঙ্গুঁলের দ্বারা ইশারা করলেন অন্যদিকে চলে যাওয়ার জন্য। আল্লাহর মেহেরবানীতে জোয়ারের পানি অন্যত্র সরে গেল। তারপর থেকে সমুদ্রের জোয়ারের পানি প্রবল বেগে এদিকে আর আসেনি। পরবর্তীতে এখানেই মূল চট্টগ্রাম শহর গড়ে উঠে। প্রবাদে আছে সমুদ্রে ঝড় তুফান উঠলে এবং সমুদ্রে জাহাজ বা নৌকা ছাড়ার পূর্বে জাহাজ বা নৌকায় চালকরা বদর শাহ (রহ.) এর উসিলায় আল্লাহর সাহায্য কামনা করে থাকেন। তিনি চট্টগ্রামে শহরের যে স্থানে আস্তানা স্থাপন করে আল্লাহর ধ্যান এবং ধর্ম প্রচার করতেন সে স্থানটি শহরের বক্সির হাট এলাকায় অবস্থিত। এখানে এখনো তাঁর চিল্লা শরীফ বর্তমান আছে। এখানে প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থীর আগমন ঘঠে। হযরত বদর শাহ (রহ.) চট্টগ্রামে আগমনের তাঁর সাথে তাঁর ছেলে হযরত শাহাবু্দ্দীন কেতাল (রহ.) এবং এক কন্যা হযরত আবদান বিবি (রহ.) সাথে ছিলেন। হযরত বদর শাহ (রহ.) চট্টগ্রাম তথা সারা বাত্লাদেশে ইসলাম ধর্ম প্রচার এবং মানব কল্যান করে ভারতের বিহারে চলে যান। তিনি একজন উচু স্তরের অলী ছিলেন। তিনি ইসলাম ধর্মের কল্যানে নিজেকে উত্সর্গ করে পরিণত বয়সে ৮৪৪ হিজরী অর্থাত্ ১৪৪০ খৃষ্ঠাব্দে ইন্তেকাল করেন।