কিছুদিন ধরে ধর্ম সংক্রান্ত একটি বই পড়ার চেষ্টা করছি। বইটির নাম- ‘ইসলাম অনুভব ও অনুধ্যান’। লিখেছেন প্রফেসর মোহাম্মদ আবদুল হালিম। তিনি বাংলাদেশের একজন প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও চিন্তাশীল লেখক। সিলেট এমসি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও দর্শন শাস্ত্রের অধ্যাপক। বাংলা একাডেমী থেকে গ্রিক ও মুসলিম দর্শন সম্পর্কে তার একাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে। এই বইগুলি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যও বটে। দর্শনের ছাত্র ও শিক্ষক হলেও ধর্মও তার গভীর আগ্রহ ও আরাধ্যের বিষয়। ধর্ম ও দর্শনের মধ্যে এক ধরণের যে ঐক্যতান আছে তা প্রফেসর আবদুল হালিমের চিন্তাকাঠামোর মাধ্যমে প্রতীয়মান হয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে ‘গভীরতর অনুভবে আল-কোরআন’ (অনুবাদ) নামে প্রফেসর আবদুল হালিমের আরেকটি বই প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত হয়েছে ইমাম আল গাযযালির অমর সৃষ্টি ‘মিশকাতুল আনওয়ার’-এর অনুবাদকর্ম ‘আলোর উত্স’ শিরোনামে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালে প্রকাশিত হয়েছে আলোচ্য গ্রন্থটি। মোট ৩৮৪ পৃষ্ঠার এই বইটি মূলত বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত ইসলামী প্রবন্ধ ও রচনার সংকলন। এখানে বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তভাবে অনেক বিষয় সন্নিবেশিত হলেও বইটি পড়ে ইসলামের সামগ্রিক বিষয় সম্পর্কে একটি সম্যক ধারণা লাভ করা যায়। বইটি অনুভব ও অনুধ্যান নামে দুভাগে বা পর্বে বিভক্ত। প্রথম পর্বে ইসলাম সম্পর্কে জানা-অজানা নানা বিষয় স্থান পেয়েছে। বিভিন্ন নবী-রাসূল, সাহাবী ও সুফি সাধকদের প্রাণবন্ত জীবনী এবং সূরা আল-ফাতিহা, এখলাস, আসর, আর-রহমানসহ কোরআন শরীফের কতিপয় সূরা ও আয়াতের তাত্পর্যপূর্ণ বিশ্লেষণ আছে। প্রচলিত ইসলামী আচার-অনুষ্ঠান তথা শবে বরাত, শবে কদর, দুই ঈদ, নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত, ঈমান-আমল এবং পরিচ্ছন্নতা ও শিষ্টাচারের আলোচনা রয়েছে। দ্বিতীয় পর্বে লেখকের কিছু মৌলিক চিন্তাধারা ও বক্তব্যের সমাহার দেখতে পাওয়া যায়। এখানে সুফিবাদ, মুতাযিলা ও আ‘শারীয় সমপ্রদায় এবং মনোযোগ, স্বপ্ন, কল্পনা, নৈতিকতা ও ধর্ম, নীতি ও আদর্শ, ভাব ও ভাষা, আবেগ ও স্বভাব, দেহ ও মন ইত্যাদি বিষয়ে দার্শনিক ব্যাখ্যার সম্মিলন ঘটেছে।
প্রথম পর্বের আলোচনা শুরু করা হয়েছে হযরত ইব্রাহীম (আ.)কে দিয়ে। তিনি মুসলিম মিল্লাতের জনক হিসেবে পরিচিত। বাইবেলে হযরত ইব্রাহীমের (আ.) দ্বিতীয় স্ত্রী বিবি হাজেরাকে প্রথম স্ত্রী বিবি সারার ‘মিসরীয় দাসী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে (জেনেসিস, ১৬:১)। বিবি হাজেরার পবিত্র গর্ভে জন্ম নেন হযরত ইসমাইল (আ.)। আর যেহেতু আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) হযরত ইসমাইলের (আ.) বংশধর এবং বিবি সারার পবিত্র গর্ভে জন্ম নেয়া হযরত ইসহাকের (আ.) বংশধর হযরত মুসা ও ঈসা (আ.), তাই ইহুদি ও খ্রিস্টানদের মধ্যে একশ্রেণীর লোক মুসলমানদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন। অথচ ঐতিহাসিকদের মতে, প্রকৃতপক্ষে বিবি হাজেরা ছিলেন মিসরের রাজকন্যা। আলোচ্য গ্রন্থকার এই বিষয়টিও পরিষ্কার করেছেন। এছাড়া পবিত্র কোরআনের আলোকে কতিপয় জীবজন্তুর নাম ও তাদের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করা হয়েছে যা কৌতুহল উদ্দীপক। এসব জীব-জন্তুর মধ্যে যেমন আছে গরু, দুম্বা, ছাগল, উট, ঘোড়া, হাতী ও বাঘ, তেমনি আছে অজগর, মৌমাছি, ময়ূর, কাক, ব্যাঙ, পিপীলিকা ও উকুন। তবে এই গ্রন্থে ‘কালিক ভাবনা’ নামে যে অধ্যায়ের অবতারণা করা হয়েছে তা চিন্তাশীল পাঠকদের আরও উত্সাহিত ও অনুপ্রাণিত করবে। দর্শন শাস্ত্রের বিভিন্ন পরিভাষার আধুনিক বিশ্লেষণসহ আত্মা, মৃত্যু ইত্যাদি প্রসঙ্গে লেখকের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। এই প্রবন্ধগুলির বেশিরভাগই প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক ইত্তেফাকে। এখানে কিছু কিছু বিষয়ে ইসলামী দৃষ্টিকোণ প্রকাশিত হলেও অনেকক্ষেত্রে তার অনুপস্থিতি বা খাপছাড়া ভাব বিদ্যমান। এই অধ্যায়টি অত্যন্ত কৌতুহল নিয়ে পড়ার কারণে বলতে পারি, এটি একটি পৃথক গ্রন্থের দাবি রাখে। প্রচলিত দর্শন শাস্ত্রের পরিভাষার সাথে ইসলামি চিন্তাধারা সংযুক্ত হলে ইসলামি দর্শন শাস্ত্রের পঠন-পাঠনে তা ব্যাপক কাজে লাগবে। যা হোক, লেখকের মূল বক্তব্য হল সৃষ্টিকর্তার প্রতি সমর্পন। তার মতে, ‘ধর্মীয় নিয়ামাবলীর আন্তরিক অনুসরণের মধ্য দিয়ে শান্তির অভীষ্ট লক্ষ্যে পীেঁছানো সহজতর’(শান্তির নীড়)। ‘ইসলাম অনুভব ও অনুধ্যান’ বইটি উত্সর্গ করা হয়েছে স্নেহের কন্যা তোনামি এবং আদরের নাতনি রাদিয়া, তাহিয়া ও সামারার নামে। ২/৩ প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার থেকে প্রকাশিত বইটির প্রকাশক নভেল পাবলিশিং হাউস। মূল্য ৩০০ টাকা।
