পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পবর্ত হলো মাউন্ট এভারেস্ট। এই পর্বত নিয়ে কত গল্প, কত রসহ্য ছড়িয়ে আছে চারপাশে। পর্বতটি সম্পর্কে জানাচ্ছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ
মাউন্ট এভারেস্ট হিমালয় পর্বতমালায় অবস্থিত সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে শীর্ষবিন্দুর উচ্চতার হিসেবে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে এর উচ্চতা ২৯,০২৯ ফুট। এটি হিমালয় পর্বতমালার একটি অংশ, এশিয়ার নেপাল এবং চীনের সীমানার মধ্যে এর অবস্থান। ১৮৫৬ সালে ভারতের বৃহত্ ত্রিকোণমিতিক জরিপ প্রকল্প সর্বপ্রথম এভারেস্টের উচ্চতা পরিমাপ করে ২৯,০০২ ফুট, যদিও এ সময় এভারেস্ট পরিচিত ছিল পিক এক্সভি নামে। এভারেস্ট পর্বতচূড়ার আনুষ্ঠানিক নামকরণ করা রয়েল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি কর্তৃক ভারতে তত্কালীন ব্রিটিশ জরিপ পরিচালক এন্ড্রু ওয়াহ সুপারিশক্রমে। ওয়াহ কোনো প্রচলিত আঞ্চলিক নাম প্রস্তাব করতে পারেননি, কারণ সে সময় নেপাল ও তিব্বত বিদেশিদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল, যদিও তিব্বতীরা একে বহু শত বছর ধরে চোমোলুংমা বলে আসছিল।
পৃথিবীর এই উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ সব ধরনের পর্বতারোহীদের আকর্ষণ করে—একেবারেই নতুন পর্বতারোহী থেকে শুরু করে বহু অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পোড়-খাওয়া পর্বত-অভিযাত্রীরাও এতে সফল আরোহণের জন্য পেশাদার পর্বত পথ প্রদর্শকদের পেছনে দেদার টাকা খরচ করতে দ্বিধাবোধ করেন না। যদিও এভারেস্টে আরোহণ পর্বতারোহণের কারিগরি দিক দিয়ে অতটা কঠিন না হলেও উচ্চতা-পীড়া, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং বাতাস ইত্যাদি কারণে এ চূড়ায় আরোহণ বেশ বিপজ্জনক। ২০০৮ সাল পর্যন্ত ২,৭০০ জন পর্বতারোহী সর্বমোট ৪,১০২ বার এভারেস্টশৃঙ্গ জয় করেছেন। আজ থেকে প্রায় ৬ কোটি বছর আগে জন্ম নেয় এভারেস্ট। আসলে আমরা জানি যেকোনো পর্বতমালা সৃষ্টি হয়েছে পৃথিবীর ভূ-গর্ভের সৃষ্ট আন্দোলনের ফলে। আমাদের পৃথিবীর ভূ-গর্ভে মাটির স্তরগুলো প্লেট আকারে থাকে। এগুলো আবার বিভিন্ন উপমহাদেশীয় এরিয়া নিয়ে গঠিত। এমনি ২টি প্লেটের সংঘর্ষে সৃষ্টি হয় এভারেস্টের। ভারতীয় উপমহাদেশের প্লট ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ান প্লটের সংঘর্ষে এভারেস্ট তৈরি।
এভারেস্ট আবিষ্কৃত হলো যেভাবে
১৮০৮ সাল, তত্কালীন ভারতে ব্রিটিশরা শুরু করল পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতসমূহের অবস্থান বের করার অভিযান। এর জন্য তারা ‘বৃহত্ ত্রিকোণমিতিক জরিপ’ শুরু করেন। এই প্রক্রিয়া নিখুঁতভাবে চালানোর জন্য তারা ব্যবহার করল ১১০০ পাউন্ড ওজনের থিয়োডোলাইট। জরিপ কাজ আরম্ভ হলো দক্ষিণ ভারত থেকে। জরিপকারী দল ক্রমাগত উত্তরদিকে সরতে থাকে এবং ১৮৩০ সালে তারা হিমালয়ের পাদদেশে পৌঁছায়। তারা আস্তে আস্তে নেপালের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। কিন্তু তখন নেপাল ও তিব্বতে বিদেশিদের প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ। এভাবে অননেক বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে ১৮৪৭ সালের শেষের দিকে এভারেস্টের ১৪০ মাইল (২৩০ কিমি) পূর্বে কাঞ্চনজঙ্ঘার কাছে চলে আসেন। সে সময় বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতচূড়া হিসেবে বিবেচিত হতো কাঞ্চনজঙ্ঘা। সে সময় জরিপ চালান ব্রিটিশ প্রধান জরিপকারক এন্ডু ওয়াহ। তিনি কাঞ্চনজঙ্ঘা থেকে পূর্ব দিকে একটি নতুন পর্বত দেখতে পান। তিনি এক পলকেই দেখে বুঝতে পারেন এটা কাঞ্চনজঙ্ঘার চেয়েও অনেক বড়। কিন্তু এর জন্য তো প্রমাণ চাই। তিনি জেমস নিকলসন নামে এক কর্মচারী পাঠান জরিপের জন্য। সে অনেক হিসাব-নিকাশ করে এসে ফলাফল দেয় যে এর উচ্চতা ৩০,২০০ ফুট (৯,২০০ মিটার)। কিন্তু তার হিসাবে ভুল হওয়ার কারণ ছিল আলোর প্রতিসরণ। ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে নিকলসন চলে যান তার দেশে। এদিকে কর্নেল ওয়াহ তার এক ক্লার্ক মাইকেল হেনেসিকে দিয়ে সবগুলো পবর্তকে রোমান সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত করতে বললেন। সে হিসেবে এভারেস্টের নাম হলো পিক এক্স। সেবার ও ওয়াহ পারলেন না। অবশেষে তিনি শরণাপন্ন হন বাঙালি গণিতবিদ ও জরিপকারক রাধানাথ শিকদারের। তিনি ছিলেন স্যার এভারেস্টের অনেক প্রিয় পাত্র। ১৮১৩ সালে তার জন্ম জোড়াসাঁকোতে। তিনি তখন এই জরিপে হাত দেন। ৮৯টি নামহীন পর্বতের হিসাব করতে হবে তাকে। একদিন তিনি এর হিসাব কষে বের করলেন ২৯০০২ ফুট! সাথে সাথে তিনি চলে গেলেন ‘রয়েল জিওগ্রাফিক সোসাইটি’তে তার স্যার কর্নেল এন্ড্রু ওয়াহর কাছে। তিনি তার সকল বিষয়গুলো আবারও পরীক্ষা করে দেখলেন সব ঠিকই আছে। তিনি যা ভেবেছিলেন ঠিক তাই। এই চূড়া-১৫-ই তাহলে কাঞ্চনজঙ্ঘার চেয়ে উঁচু। আর তার মানেই হলো চূড়া-১৫ হলো পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু স্থান। রাতারাতি সব দিকে খবর পৌঁছে গেল। এভাবেই একজন বাঙালি গণিতবিদ ও জরিপকারক রাধানাথ শিকদারের হাত ধরেই আবিষ্কার হলো বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট। সেই রাধানাথ শিকদার ১৮৭০ সালে মারা যান। কিন্তু রেখে যান এক অনাবদ্য সৃষ্টি।
