ক্যান্সার প্রতিরোধে প্রয়োজন সচেতনতা

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০১৪, ২০:২৫
প্রতি বছর ৪ ফেব্রুয়ারী বিশ্ব ক্যান্সার দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এই দিবস পালনের মূল বিষয় ছিল ক্যান্সার প্রতিরোধ। প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ লোক ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। এইডস, যক্ষ্মা ও ম্যালেরিয়া এই তিনটি মিলে যতলোকের মৃত্যু হয়, ক্যান্সারে মৃত্যু হয় এর চেয়েও বেশি। তবে সুখের কথা এই, পাঁচটির মধ্যে দু’জনের ক্যান্সার প্রতিরোধ যোগ্য। ক্যান্সার প্রতিরোধ তেমন কঠিন ব্যাপার নয়। চাই সদিচ্ছা ও উদ্যোগ। ধূমপান বর্জন করে, মদ্যপান বন্ধ করে, কড়ারোদে বেশিক্ষণ না থেকে, শরীরের জন্য আদর্শ ওজন বজায় রেখে ক্যান্সার জনক সংক্রমণ থেকে শরীরকে রক্ষা করে আমরা এটি অর্জন করতে পারি। তবে পৃথিবীর যেসব দেশে চিকিত্সা ব্যবস্থা ভালোভাবে গড়ে উঠেনি সে সব দেশে চিকিত্সার চেয়ে প্রতিরোধ বেশি প্রয়োজন। আফ্রিকার মত দেশ যেখানে প্রতি বছর ৫ লক্ষ নতুন ক্যান্সার রোগী চিহ্নিত হচ্ছে। অনুমান করা যায় এভাবে চলতে থাকলে ৩০-৪০ বছরে সে অঞ্চলে ক্যান্সার হবে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ। সে সব অঞ্চলে চিকিত্সা দেয়া হবে কঠিন কাজ এবং প্রতিরোধ হবে অনেক বেশি শ্রেয়। বিশ্বজুড়ে সব ক্যান্সারের পাঁচ ভাগের একভাগের কারণ হলো ক্রনিক সংক্রমণ। যেমন হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচ.পি.ভি.)। এই ভাইরাসের জন্য জরায়ু গ্রীবায় পরবর্তীতে হতে পারে ক্যান্সার। হেপাটাইটিস বি ভাইরাস সংরক্ষণ থেকে পরবর্তীতে হতে পারে যকৃতের ক্যান্সার, হেলিকোব্যাকটার পাইলোরি থেকে হতে পারে পাকস্থলীর ক্যান্সার। জরায়ুগ্রীবার ক্যান্সার নিয়ে গবেষণা করছিলেন জার্মান ভাইরাস বিশেষজ্ঞ প্রফেসর হেরাল্ড জুর হাউসেন। যিনি আবিষ্কার করেন এই ক্যান্সার ঘটানোর ব্যাপারে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের ভূমিকার কথা। আর এজন্যই তিনি নোবেল পুরষ্কার পান ২০০৮ সালে। এইচপিভি কেবল জরায়ুগ্রীবার ক্যান্সারই নয় অন্ননালী, টনসিল ও মলাশয়ের ক্যান্সারের সঙ্গেও এটি জড়িত। সংক্রামক নয় এমন সব রোগের মধ্যে প্রধান হলো ক্যান্সার। লক্ষ লক্ষ মানুষ এতে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ মেয়াদী রোগে ভূগে থাকে। কেবল ক্যান্সারই নয় অসংক্রামক সব রোগের প্রতিরোধের জন্য বিশ্বব্যাপী যে অভিযান শুরু করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা। এর রয়েছে তিনটি অগ্রাধিকার: প্রথম হলো স্তন ক্যান্সারসহ অন্যান্য ক্যান্সার ও অন্যান্য সংক্রামক রোগ। অসংক্রামক রোগ যেমন-হূদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘ স্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের রোগ সম্বন্ধে ধারণা নেয়া এবং এর তদারকি ও নজরদারি করা। দ্বিতীয় হলো-ঝুঁকি যাতে কমে এর ব্যবস্থা করা যেমন-তামাক, অস্বাস্থ্যকর খাদ্য, শরীর চর্চা না করা ও মদ্যপান। তৃতীয় হলো, অসংক্রামক রোগের মোকাবেলা করার জন্য স্বাস্থ্যজনবল গড়ে তোলা এবং জোরালো স্বাস্থ্য পরিচর্যা নিশ্চিত করা। দেহকোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি ও বিস্তার ঘটলে পরিনামে হয় ক্যান্সার। শরীরের যে কোনও অংশেই হতে পারে ক্যান্সার। টিউমার অনেক সময় পার্শ্ববর্তী টিস্যু ভেদ করে ছড়িয়ে পড়ে এবং উপনিবেশ স্থাপন করে দূরবর্তী টিস্যুতে। অনেক ক্যান্সারই প্রতিরোধ করা যায়, ঝুঁকিগুলো এড়াতে পারলে। যেমন ধূমপান বর্জন করলে, তামাক সেবন বন্ধ করলে ফুসফুস ও মুখগহ্বরের ক্যান্সার এড়ানো যায়। এছাড়া অনেক ক্যান্সার নিরাময় হয় চিকিত্সায়। রয়েছে সার্জারি, কেমোথেরাপি, বিশেষ করে আগে ভাগে চিহ্নিত হলে নিরাময় সহজ হয়। আরো কিছু তথ্য হলো- * বিশ্বজুড়ে মানুষের মৃত্যুর একটি প্রধান কারণ হলো ক্যান্সার। ২০০৪ সালে ক্যান্সারে মৃত্যু হয়েছিলো ২৪ লক্ষ লোকের। (মোট মৃত্যুর ১৩%) * প্রতিবছর ফুসফুস, পাকস্থলী, যকৃত্, মলান্দ্র ও স্তন ক্যান্সা েবেশিরভাগ মৃত্যু ঘটে। ক্যান্সারে যত লোকের মৃত্যু হয় এর ৩০% এর বেশি প্রতিরোধ যোগ্য। * তামাক ব্যবহার হলো ক্যান্সারের একক সবচেয়ে বড় কারণ। * দেহের একটি কোষে পরিবর্তন থেকে সুচিত হয় ক্যান্সার। পরিবর্তন ঘটতে পারে বহিরাগত এজেন্টের মাধ্যমে এবং জীনগত সূত্র থেকে। * বিশ্বজুড়ে ক্যান্সারে মৃত্যু ক্রমেই বাড়ছে। ২০৩০ সালে আনুমানিক মৃত্যু ঘটতে পারে ১২ মিলিয়ন লোকের। বাংলাদেশে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে যত লোক মারা যায় তার ষষ্ঠতম কারণ হলো ক্যান্সার। ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া ও মৃত্যু প্রতিবছর বাড়ছে। ঝুঁকির তুলনায়, সেবার সুযোগ অনেক সীমিত। সারা দেশে চিকিত্সক মাত্র ১০৫ জন। সচেতনতা বাড়ানোর জন্য সরকার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দু’টোকেই সমানভাবে কাজ করতে হবে। ২০১০ সালের দিবস পালনের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘ক্যান্সার প্রতিরোধযোগ্যও বটে’-এর বাস্তবায়ন করতে হলে চাই সমন্বিত উদ্যোগ। বর্তমান ধারা চলতে থাকলে ২০১৫ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে সাড়ে আট কোটি মানুষ এরাগে মারা যেতে পারে। ধূমপান ও তামাক ব্যবহার বন্ধ করা, স্বাস্থ্য সম্মত খাদ্য, শরীর চর্চা, মদ্যপান বর্জন, যেসব সংক্রমণ ক্যান্সার ঘটায় এদের প্রতিরোধ করতে পারলেই ক্যান্সার সহ অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ করা সহজ হবে। লেখক: পরিচালক, ল্যাবরেটরী সার্ভিসেস বারডেম, ঢাকা