দুই বছর পর পুনরায় সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। ২০১২ সালের ৩ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে সিইটিপি ও ডাম্পিং ইয়ার্ডের কাজ শুরু হলেও অর্থ সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে যায় নির্মাণ কাজ। সাভার ও কেরানীগঞ্জ উপজেলার প্রায় ২০০ একর জমির উপর এই চামড়া শিল্পনগরী গড়ে উঠছে। যার ১৭ একর জমিতে সিইটিপি নির্মাণ করা হচ্ছে। এ নির্মাণ কাজ শেষ হলে প্রতিদিন ২৫ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য শোধন করা যাবে। আগামী ১৫ মাসের মধ্যে এর নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে সিইটিপির নির্মাণ কাজ পুনরায় শুরু হয়েছে জানিয়ে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু ইত্তেফাককে বলেন, সিইটিপির নির্মাণকাজ দ্রুত গতিতে শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্টদের তাগিদ দেয়া হয়েছে। শুধু পরিবেশের স্বার্থে নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি অব্যাহত রাখতে নির্দিষ্ট সময়ে এই প্রকল্পের কাজ শেষ করতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রাজধানীর হাজারীবাগের চামড়া শিল্পের দূষণ রোধ ও বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চারপাশের নদী রক্ষায় সরকার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্প গ্রহণ করেছে। বর্তমানে প্রতিদিন হাজারীবাগের দেড় শতাধিক কারখানার ২১ হাজার ৬০০ ঘনমিটার বর্জ্য বুড়িগঙ্গায় পড়ছে। বিষাক্ত হচ্ছে নদীর পানি। অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী কাঁচামাল নির্ভর রপ্তানিমুখী চামড়া শিল্প কার্যক্রম প্রায় ৬২ বছর যাবত্ ঢাকাস্থ হাজারীবাগে পরিচালিত হয়ে আসছে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে তার কার্যালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সার্বক্ষণিক সিইটিপি নির্মাণ কাজের তদারকি করছেন। তিনি প্রতি সপ্তাহে অগ্রগতি রিপোর্ট প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দিচ্ছেন। পাশাপাশি শিল্প ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও এই কাজের তদারকি করছেন। সর্বশেষ গত ৩১ মার্চ শিল্প মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় শোধনাগার প্রকল্পের বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি নিয়ে পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। শিল্পমন্ত্রী প্রকল্পের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য সংশ্লিষ্টদের তাগিদ দেন।
যেভাবে পুনরায় কার্যক্রম শুরু
সাভার ও কেরানীগঞ্জ উপজেলায় গড়ে উঠা চামড়া শিল্পনগরীর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বুয়েটের তদারকিতে একটি চীনা কোম্পানি সিইটিপি নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে হাজারীবাগ থেকে চামড়া শিল্প সাভারে সরিয়ে নেয়া প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। গত মাসে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর নির্দেশে ফের চামড়া শিল্পনগরী সাভারে স্থানান্তর ও সিইটিপি নির্মাণের কাজ শুরু হয়। আগামী ২০১৬ সালের মধ্যে পুরো প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হবার চুক্তি থাকলেও নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের আগেই এই নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করার আশ্বাস দিয়েছে।
ট্যানারি শিল্পনগরীর অগ্রগতি সম্পর্কে প্রকল্পের পরামর্শক ও বুয়েটের কারিগরি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, ইতিমধ্যে জমি অধিগ্রহণ, জমি ভরাট ও লেভেলিংসহ প্লট তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে কিছু স্থাপনাও। একটি বিদ্যুত্ উপ কেন্দ্র নির্মিত হয়েছে। আরেকটি নির্মাণের কাজ চলছে। প্রকল্পে গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়েছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় পানি সরবরাহ ব্যবস্থার কাজ চলছে। এটি সম্পন্ন হলে প্রতিদিন ২২ দশমিক ৮০ মিলিয়ন লিটার পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। সর্বশেষ গত মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে পুরোদমে চামড়া শিল্পের কেন্দ্রীয় শোধনাগার নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। সাথে মনুষ্য বর্জ্য পরিশোধন প্ল্যান্ট (এসটিপি), ট্যানারী বর্জ্য ব্যবহার করে বিদ্যুত্ উত্পাদন প্ল্যান্ট (এসপিজিএস), ট্যানারি কঠিন বর্জ্য মজুদ প্ল্যান্ট (এসডব্লিউএমএস) ও বর্জ্য পরিশোধন কেন্দ্র (ইটিপি) নির্মাণ কাজ চলছে। সিইটিপিসহ এসব নির্মাণে ব্যয় হবে ৬৩৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা। আর পুরো প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৭৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা। কয়েক দফা সময় পরিবর্তন শেষে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে তা স্থানান্তরের চূড়ান্ত সিদ্বান্ত গৃহীত হয়। সিইটিপি নির্মাণের জন্য ৪ দফায় আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করা হয়। সর্বশেষ ২০১২ সালের ৩ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে সিইটিপি ও ডাম্পিং ইয়ার্ডের কাজ শুরু হয়। অর্থ সংকটের কারণে নির্মাণ কাজ দফায় দফায় মুখ থুবড়ে পড়ে। হাজারীবাগ চামড়া শিল্পনগরী প্রথম স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়া হয় ২০০৩ সালের ১৬ আগস্ট। সরকারের পক্ষ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে স্থানান্তরের সব কার্যক্রম শেষ হবে বলে দাবি করা হয়েছে।
সরকারের দাবি নিয়ে সন্দিহান মালিক-শ্রমিকরা
সরকারের এমন দাবি কতটুকু যুক্তিযুক্ত তা ট্যানারির সঙ্গে জড়িত মালিক-শ্রমিকরা সন্দিহান। মালিকপক্ষ মনে করছে, নির্ধারিত স্থানে স্থানান্তর হওয়ার আগে যেসব কার্যক্রম রয়েছে তা এখনও বাস্তবে কিছুই হয়নি। ট্যানারি স্থানান্তরের বিষয়ে বাংলাদেশ ফিনিশ্ড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) চেয়ারম্যান হাজী মো. বেলাল হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, স্থানান্তরের বিষয়ে আমরা ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছি। তা বাস্তবায়ন হলে আশা করি চামড়া শিল্পনগরী স্থানান্তর সহজ হবে। তবে এ খাতের যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জড়িত তাদের বিষয়ে নতুন চুক্তিতে দিক-নির্দেশনা নেই। তিনি বলেন, চামড়া শিল্পে যে শ্রমিক রয়েছে তারা অত্যন্ত দক্ষ ও পরিশ্রমী। দীর্ঘদিন থেকে তারা এ এলাকায় তাদের পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন। কিন্তু নতুন নগরীতে এসব শ্রমিকের থাকা ও শিক্ষা চিকিত্সার বিষয়ে তেমন কিছু বলা নেই।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) মহাসচিব মো. আব্দুল হাই বলেন, বহু পুরনো এ শিল্প স্থানান্তর করতে হলে এর সবগুলো দিক বিবেচনা করে স্থানান্তর করতে হবে। এর সঙ্গে যাদের রুটি রুজির ব্যবস্থা রয়েছে তাদেরও একটা ব্যবস্থা করতে হবে।
ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে
ক্ষতিগ্রস্ত ট্যানারি শিল্প মালিকদের সহায়তার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ২৫ কোটি টাকাও বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও চামড়া শিল্পনগরীর প্রকল্প পরিচালক মো. সিরাজুল হায়দার ইত্তেফাককে বলেন, ট্যানারি মালিকদের সমন্বয়ে একটি আন্তঃ মন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি প্রকল্পের কাজ পর্যবেক্ষণ ও ক্ষতিগ্রস্ত ট্যানারি শিল্প মালিকদের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করছে। তারা ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য একটি নীতিমালাও প্রণয়ন করবেন। এতে করে ট্যানারি শিল্প মালিকরা সাভারে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
জানা গেছে, ইতিমধ্যে ১৫৫টি ট্যানারির মধ্যে ১২৭টি প্রতিষ্ঠান লে-আউট প্ল্যান বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থায় (বিসিক) জমা দিয়েছে। বিসিক ৮৬টির অনুমোদন দিয়েছে। বাকিগুলোও অনুমোদনের জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সাভারের হরিণধরায় বিসিক ২০০৬ সালে ছোট-বড় মোট ২০৫টি প্লট বরাদ্দ করে। যার মধ্যে ১৫৫টি শিল্প ইউনিট। ট্যানারি শিল্প মালিকরা ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি সরিয়ে নিতে বিসিকের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন।
পরিবেশ অধিদপ্তরসূত্রে জানা গেছে, হাজারীবাগে অবস্থিত চামড়া শিল্পগুলো থেকে বুড়িগঙ্গা নদীতে প্রতিদিন প্রায় ২১ হাজার ৬০০ ঘনমিটার পরিবেশ দূষণকারী তরল বর্জ্য পদার্থ নির্গত হয়। যার মধ্যে ক্ষতিকর ক্রোমিয়াম, সালফার, অ্যামোনিয়া, অ্যান্টিবায়োটিক, লবণ ও অন্যান্যসহ ৬২ প্রকার কেমিক্যাল রয়েছে। এসব দূষণকারী বর্জ্যের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত ঢাকা শহর ও রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোর পরিবেশ ভয়াবহভাবে দূষিত হচ্ছে। পরিবেশগত ভারসাম্য বিনষ্ট হওয়ায় হাজারীবাগ এলাকার জনজীবন দারুণভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, যা প্রতিবেশগত তীব্র সংকট তৈরি করছে। হাজারীবাগস্থ ট্যানারী শিল্প ইউনিটগুলো স্থানান্তরের বিষয়ে এলাকার অধিবাসী, বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশবাদী সংগঠন বিভিন্ন সময়ে দাবি জানিয়ে আসছে। এছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তর, ঢাকা ওয়াসাসহ সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ও ট্যানারি শিল্প ইউনিটগুলো যত দ্রুত সম্ভব হাজারীবাগ থেকে অন্যত্র স্থানান্তরের উপর গুরুত্ব দিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন সময়ে সরকার ট্যানারী স্থাপনা হাজারীবাগ থেকে স্থানান্তরের উদ্যোগ নিতে দেখা গেছে।
১৯৫১ সালের ৩ অক্টোবর ঘোষিত এক গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে তত্কালীন সরকার ভূমি অধিগ্রহণপূর্বক পরিকল্পিতভাবে এ শিল্পকে নারায়ণগঞ্জ থেকে স্থানান্তর করে হাজারীবাগে স্থাপন করে। হাজারীবাগে বর্তমানে ছোট-বড় সব মিলে প্রায় ১৮৫টি চামড়া শিল্প কারখানা রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী প্রতিবছর কারখানাগুলোতে ১ কোটি ৮০ লাখ বর্গমিটার চামড়া উত্পাদন হয়।
সাভার চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি)’র নির্মাণ কাজ দ্রুতগতিতে শেষ করার উপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে জানিয়ে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু ইত্তেফাককে আরো বলেন, বেহুদা খরচ নয়, কাজের গুণগতমান বজায় রেখেই দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। সাফল্যের সাথে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান।
