পুলিশকে পুরি খাইয়ে ছাড়া পেলেন পথচারি সাইফুল

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০১৪, ২৩:৩১
পথচারী সাইফুল। বিশ বছরের যুবক। বিকাল ৫টার দিকে যাত্রাবাড়ীর ভাংগা প্রেস এলাকার বাসা থেকে বের হন কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য (সাইফুল একটি বেসরকারি সংস্থার রাতের কর্মকর্তা/ কর্মচারীদের বহনকারী গাড়ির তদারককারী)। লেগুনা থেকে নামেন যাত্রাবাড়ী মোড়ে। এরপর বাসে ওঠার জন্য রাস্তা পার হচ্ছিলেন। এ সময় যাত্রাবাড়ী থানার এক কনস্টেবল তাকে ডেকে নেয় তার কর্মকর্তার কাছে (পুলিশের টহল গাড়িতে থাকা সাব-ইন্সপেক্টর)। অভিযোগ সাইফুল মাদক ব্যবসায়ীর সহযোগী। এর কিছু আগে পুলিশ আরও এক যুবককে আটক করে। সাইফুল ঐ পুলিশ কর্মকর্তাকে বোঝাবার চেষ্টা করে সে নির্দোষ। কিন্তু কে শোনে কার কথা। চড় থাপ্পর দিয়ে তোলা হয় পুলিশের গাড়িতে। এরপর তাদের থানায় না নিয়ে, নেয়া হয় যাত্রাবাড়ী মোড় থেকে খানিকটা দূরে অবস্থিত হোটেল আল নুরে। আন্ডার গ্রাউন্ডে অবস্থিত এ হোটেলে নিয়ে সাইফুলের পকেটে থাকা ১৩৫৫ টাকা ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেয় পুলিশ। এরপর ঐ যুবকসহ সাইফুলকে তিন ঘন্টা বসিয়ে রাখে হোটেলে। এদিকে বহু খোঁজাখুঁজির পর সাইফুলের মালিক (যার অধিনে কাজ করে) বিষয়টি জানতে পেরে একাধিক ব্যক্তির মাধ্যমে যাত্রাবাড়ী থানার ওসিকে অবহিত করেন। এরপর ওসির নির্দেশে ঐ হোটেল থেকে সাইফুলকে রাত ৮টার দিকে নেয়া হয় যাত্রাবাড়ী থানায়। ঢুকিয়ে দেয়া হয় হাজতে। কিন্তু ওসি বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব দেননি। এ অবস্থায় বিষয়টি জানানো হয় যাত্রাবাড়ী জোনের সহকারী পুলিশ সুপারকে। তার নির্দেশে রাত ১০টার দিকে সাইফুলকে হাজত থেকে বের করা হয়। এবার তাকে এনে বসিয়ে রাখা হয় ডিউটি অফিসারের রুমে। তবে অবস্থা আঁচ করতে পেরে সাইফুলের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া টাকা থেকে এক হাজার টাকা ফেরত দেয়া হয়। ফেরত দেয়া হয় মোবাইল ফোনটিও। আর বাকী টাকা থেকে (২৫০ টাকা) স্থানীয় হোটেল থেকে কিনে আনা হয় পুরি। এরপর পুরি খেয়ে ডিউটি অফিসার সাইফুলকে ছেড়ে দেন রাত ১১টায়। ঘটনাটি গত বৃহস্পতিবারের। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছে, সাইফুলের মত প্রায় প্রতিদিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অনেকেই থানার সিভিল টিমের হাতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। আর এ হয়রানি করা হয় শুধু টাকার জন্য। আর এ কাজের জন্য পুলিশের সিভিল টিম সহায়তা নেয় সোর্সের। সাইফুলের মত একই ধরনের ঘটনা ঘটে পল্লবী এলাকায়। ঐ দিন সন্ধ্যায় পল্লবী থানার সিভিল টিম রাস্তা থেকে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রকে (সোর্সের দেখানো মতে) আটক করে। বেশ কিছুক্ষণ পুলিশের টহল গাড়িতে ঘোরানোর পর নিয়ে যাওয়া হয় থানা হাজতে। খবর পেয়ে আটককৃতদের মধ্যে একজনের স্বজন থানায় যোগাযোগ করেন। এ সময় বলা হয় আটককৃতরা নাকি প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত। পরে আটকের প্রায় ৮ ঘন্টা পর রাত ১১টার দিকে ১৭ হাজার টাকার বিনিময়ে একজনকে ছেড়ে দেয় পুলিশ (টাকা নেয় সিভিল টিমের দারোগা)। আর আটককৃত অপরজনের কাছে দাবি করে এক লাখ টাকা। কিন্তু তার পক্ষে টাকা দেয়ার মত কেউ ছিল না। ফলে পরের দিন দুপুরের পর ছেড়ে দেয়। সম্প্রতি রমনা থানার সিভিল টিম আদম ব্যবসায়ী অভিযোগ তুলে মৌচাক এলাকার এক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর অফিসে হানা দেয়। ঘটনার সময় ঐ ব্যবসায়ী অফিসে ছিলেন না। পুলিশ সদস্যরা তার অফিস স্টাফদের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করে। এ অবস্থায় ঐ ব্যবসায়ী বিষয়টি জানতে পেরে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আর ডিবির ঐ কর্মকর্তার ফোন পেয়ে সিভিল টিমের দারোগা সরি বলে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। অপরদিকে গত ১৫ দিন আগে রামপুরা থানায় স্বর্ণের বার আত্মসাত্ করার ঘটনায় গ্রেফতারকৃত পুলিশ সদস্যরা ছিলেন থানার সিভিল টিমের। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেছেন, রাজধানীর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় ভাল। আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে এখন আর নগরবাসীর কাছ থেকে তেমন কোন অভিযোগ শোনা যায় না। কিন্তু ইদানিং বিভিন্ন থানার সিভিল টিমের সদস্যরা সোর্সের দেয়া তথ্য মতে বিভিন্ন লোককে আটক করে উেকাচ গ্রহণ করছে এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে ডিএমপি সদর দফতর মনিটরিং করছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যাবে, কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের লালবাগ জোনের ডিসি হারুন উর রশীদ বলেন, সিভিল টিমের হয়রানি নিয়ে তিনি বেশ কিছু অভিযোগ পেয়েছেন। এ কারণে তিনি তার এলাকায় (বিভিন্ন থানায়) সিভিল টিম তুলে দিয়েছেন। তার এলাকায় (থানার দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্য) সবাই ইউনিফর্মে দায়িত্ব পালন করে থাকে। কোন নিরীহ ব্যক্তি যাতে অযথা হয়রানির শিকার না হন সে ব্যাপারে তিনি প্রয়োজনীয় নির্দেশনা সবাইকে জানিয়ে দিয়েছেন।