রহস্যজনক দুই চিরকুট নিহতদের মধ্যেই খুনি!

আপডেট : ২৪ মে ২০১৯, ২১:৪৩

ধারণা করা হয়- মুহিব তার মা ও বোনকে কুপিয়ে এবং শ্বাসরোধ করে হত্যার পর আত্মহত্যা করেন

রাজধানীর উত্তরখানের মৈনারটেকের চা-পানেরটেকে মা, মেয়ে ও ছেলের হন্তারক নিহতদের মধ্যেই রয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা ক্রাইমসিন (অপরাধ সূত্র) পর্যালোচনা করে ঘটনা তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ‘আমরা ধারণা করছি যে মুহিব তার মা ও বোনকে বঁটি দিয়ে কুপিয়ে ও শ্বাসরোধ করে হত্যার পর নিজে গলায় বঁটি চালিয়ে আত্মহত্যা করেছেন।’

উত্তরখানের ওই বাড়ি থেকে তিনটি লাশ উদ্ধারের চারদিন আগে নিহত মুহিব হাসান রশ্মির ফেসবুক আইডি থেকে আত্মহত্যা করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ফেসবুক আইডিটি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট তদন্ত করে নিশ্চিত হয়েছে যে, মুহিবের নামে একাউন্ট থেকে ফেসবুক আইডিটি খোলা হয়। গত ৯ মে ভোরে উত্তরখান এলাকা থেকে মুহিব ফেসবুকে তার আইডিতে আত্মহত্যা করার ঘোষণা দেন। উত্তরখান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) খন্দকার নাসিরউদ্দিন বলেন, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা দুইটি চিরকুটের লেখা পরীক্ষার জন্য সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে। সন্দেহজনক মায়ের চিরকুটে লেখা ছিল: “আমাদের মৃত্যুর জন্য আমাদের ভাগ্য এবং আমাদের আত্মীয়-স্বজনের অবহেলা দায়ী। আমাদের মৃত্যুর পর আমাদের সম্পত্তি গরিব মানুষকে দান করা হোক। ইতি-জাহানারা বেগম মুক্তা।” আর মুহিবের নামে লেখা চিরকুটে ছিল: “এই সমাজে শিক্ষার দাম আছে, টাকা-পয়সার দাম আছে, ভালো মানুষের দাম নাই। বিদায় সমাজ, তোমার কাছে আর আসবো না।” চিরকুট দুইটির লেখা পরীক্ষার জন্য নিহত মুহিব ও তার মা জাহানারা বেগমের পূর্বের হাতের লেখার নমুনা পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে চাওয়া হয়েছে।

গত ১২ মে রাতে মৈনারটেকের চা-পানেরটেক এলাকার ৩৪/ডি, একতলা বাড়ি থেকে মা জাহানারা বেগম মুক্তা, ছেলে কাজী মুহিব হাসান রশ্মি ও প্রতিবন্ধী মেয়ে আফিয়া সুলতানা মীমের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহত জাহানারা বেগমের ভাই মনিরুল হক বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেন। ঘটনা তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে উত্তরখান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) খন্দকার নাসিরউদ্দিন জানান, বাড়ির দরজা-জানালা ভিতর থেকে বন্ধ ছিল। ওই বাড়ির ভিতর থেকে বের হওয়ার বিকল্প কোনো পথও ছিল না। বিছানায় মা ও মেয়ের লাশ পড়েছিল। মেঝেতে ছেলের লাশ পড়েছিল। তার এক হাতে রক্তমাখা একটি বঁটি ছিল। বঁটির রক্ত শুকিয়ে হাতের সঙ্গে লেগেছিল। বাসা তল্লাশি করে টেবিলের ওপর একটি সন্দেহজনক কৌটা পাওয়া গেছে। তবে তাতে কোনো তরল পদার্থ ছিল না। টেবিলে দুইটি চিরকুট পাওয়া গেছে। এছাড়া এক পাতা ঘুমের ওষুধ পাওয়া গেছে, যেখানে ১০টি ওষুধের মধ্যে ৮টি নেই। এসব আলামত পরীক্ষার জন্য সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে। আমরা ধারণা করছি যে, মুহিব তার মা ও বোনকে বঁটি দিয়ে কুপিয়ে ও শ্বাসরোধ করে হত্যার পর নিজে গলায় বঁটি চালিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তবে ময়নাতদন্ত ও ভিসেরা রিপোর্ট হাতে পেলে সেটি নিশ্চিত করে বলা সম্ভব হবে।’

সূত্র জানায়, জাহানারার বাড়ি কুমিল্লার তিতাস উপজেলার কান্দি গ্রামে। তার শ্বশুরবাড়ি কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামে। ছেলে মুহিব সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে চাকরির চেষ্টা করছিলেন। গত ৩ মে অনুষ্ঠিত বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশও নেন তিনি। জাহানারার স্বামী ইকবাল হোসেন মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলায় বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) ব্যবস্থাপক পদে কর্মরত অবস্থায় ২০১৬ সালে মারা যান। তার মৃত্যুর পরেই আর্থিক সংকটে পড়ে পরিবারটি।

সূত্র আরো জানায়, চলতি মাসের ৫ তারিখে ভৈরব থেকে ঢাকায় আসেন তারা। পৈতৃকসূত্রে উত্তরখানে জমি পেয়েছিলেন জাহানারা। বাবার নামে থাকা ওই সাড়ে ৪ কাঠা জমির অংশীদার তারা চার ভাই-বোন। ওই জমিতে বাড়ি নির্মাণ করে বসবাসের উদ্দেশ্যেই ঢাকায় এসেছিলেন জাহানারা। জমিটির পাশেই ময়নারটেকের ৩৪/ডি নম্বর বাসাটি তিনি ভাড়া নেন। যদিও জাহানারা তার নিজের অংশ বুঝে পাননি। অন্যদিকে পৈতৃক সম্পত্তি হলেও, জমি দখলে নিতে তার ভাইকে টাকা দিতে হয়েছিল।

এ বিষয়ে তার বড়ভাই মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি আমেরিকায় থাকা অবস্থায় ১৯৯৮ সালে আমার টাকা দিয়ে বাবা ওই জমিটি তার নিজের নামে কিনেছিলেন। যেহেতু জমিটা আমার টাকা দিয়ে কেনা হয়েছিল তাই পরবর্তীতে আমার অন্য দুই বোন ও এক ভাই আমাকে টাকা পরিশোধ করে। আমার এক বোন অস্ট্রেলিয়াতে আর ছোট ভাই আমেরিকায় থাকে। এজন্য জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। তবে জাহানারাকে বাড়ি করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। জাহানারাকে আমরা সবাই মিলে সহযোগিতা করতাম। চিরকুটে স্বজনদের অবহেলার অভিযোগের ব্যাপারে তিনি বলেন, কী কারণে লিখেছে তা আমার জানা নেই।